Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > ডিজিটাল বাংলাদেশও টেলিসেন্টার
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: মানিক মাহমুদ
মোট লেখা:২৪
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০০৯ - জুন
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
ডিজিটাল বাংলাদেশটেলিসেন্টার, 
তথ্যসূত্র:
ডিজিটাল বাংলাদেশ
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
ডিজিটাল বাংলাদেশও টেলিসেন্টার

বর্তমান নিবন্ধে আলোচনার বিষয় চারটি। ডিজিটাল বাংলাদেশ, টেলিসেন্টার, এদের উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে টেলিসেন্টারের শক্তিশালী ভূমিকা। প্রথমেই ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।



ডিজিটাল বাংলাদেশ কী, এ বিষয়ে অনেকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। অনেকে সংজ্ঞায়িত করারও চেষ্টা করছেন। আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে দ্রুতই একটি স্বচ্ছ ধারণা দিতে সক্ষম হবেন। তবে সংজ্ঞায়িত না করেও গত কয়েক বছর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশে যে ডিজিটাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে এবং এর যে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা তা থেকে এটা সহজেই বলা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ হলো একটি দৃষ্টিভঙ্গি। দৃষ্টিভঙ্গি এই অর্থে যে, ডিজিটাল কর্মযজ্ঞের যে সামাজিক প্রভাব, তাকে শুধু গাণিতিক তথ্যচিত্র দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, যেমন দেশে কত বেশি মানুষ কমপিউটার, ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, সফটওয়্যার তৈরি ও রফতানি করে দেশে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং কত বৈদেশিক মুদ্রা জমা পড়েছে প্রভৃতি। বরং দেখা দরকার এর গুণগত পরিবর্তন ও সম্ভাবনার দিক। যেমন-তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমানাধিকার নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি সুশাসন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে যেভাবে ভূমিকা রাখছে এবং নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে সেদিক থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশকে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বললে অত্যুক্তি হয় না।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও টেলিসেন্টারের সম্পর্ক

ডিজিটাল বাংলাদেশের সাথে দেশে গড়ে ওঠা সহস্রাধিক টেলিসেন্টারের সম্পর্ক নিবিড়। বাংলাদেশ টেলিসেন্টার নেটওয়ার্কের (বিটিএন) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে টেলিসেন্টারের সংখ্যা দুই হাজারের অধিক। এসব টেলিসেন্টার প্রধানত বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে জেলা শহরে, উপজেলা শহরে, ইউনিয়নে, গ্রামে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভিত্তি করে।

সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে ইউএনডিপির একটি পাইলট প্রজেক্টভিত্তিক গবেষণা। গবেষণার বিষয় ছিল-ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক কমিউনিটি ই-সেন্টার (সিইসি)। ইউএনডিপি ২০০৭ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার মাধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদ এবং দিনাজপুর জেলার মুশিদহাট ইউনিয়ন পরিষদে এ গবেষণা শুরু করে-তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কী করে তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় তথ্য ও সরকারি সেবা সহজে ও সুলভে পৌঁছে দেয়া যায়, যা নিশ্চিত করে ইউনিয়ন পরিষদ। গবেষণার বিষয় ছিল-শুধু তথ্য ও সরকারি সেবা নিশ্চিত করাই নয়, টেলিসেন্টারটিকে ইউনিয়ন পরিষদ কী করে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক টেকসই প্রতিষ্ঠানে এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রাতিষ্ঠানিক অংশে পরিণত করতে পারে, যার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় ইউনিয়নবাসীর মালিকানা থাকবে প্রায় শতভাগ। লক্ষ্য ছিল-এভাবে টেলিসেন্টারটি ধাপে ধাপে বিকশিত হয়ে উঠবে একটি জ্ঞানকেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, যার নিবিড় পরিচর্যা করবে এলাকাবাসী। গবেষণার একটি অংশ ছিল বিদ্যমান টেলিসেন্টারের অবস্থা পর্যালোচনা করা। এতে বেরিয়ে আসে-একটি টেলিসেন্টারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার অনিবার্য ও প্রধান উপাদান হলো ইউনিয়নবাসীর পূর্ণ মালিকানাভিত্তিক অংশগ্রহণ। কিন্তু দেখা যায় বিদ্যমান টেলিসেন্টারগুলোয় অন্যান্য উপাদান থাকলেও এ উপাদানের উপস্থিতি ছিল যথেষ্টই দুর্বল। মানুষের মধ্যে তথ্যসচেতনতা, অধিকারবোধ গড়ে তোলা এবং প্রচলিত টেলিসেন্টার আন্দোলন শক্তিশালী করার প্রশ্নে এটা ছিল বিরাট এক মিসিং। ইউনিয়ন পরিষদের জন্য এই মিসিং অতিক্রম করা সত্যিকার অর্থেই ছিল একটি ‘চ্যালেঞ্জ’। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করতে ইউনিয়ন পরিষদকে উদ্বুদ্ধ করা হয়, যাতে ইউনিয়ন পরিষদ ইউনিয়নবাসীকে তথ্যসচেতন, তথ্যঅধিকারসচেতন, টেলিসেন্টার ব্যবস্থাপনায় তাদের সম্পৃক্ততা ও মালিকানা নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় অন্যান্য সহায়ক শক্তির সুসমন্ত ঘটাতে মূল সমন্তকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে সমন্তকর ভূমিকা পালন করতে থাকে। ইউনিয়ন পরিষদের এই স্বয়ংক্রিয়তার প্রধান কারণ একটাই, তা হলো তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সহায়ক পরিবেশ। স্থানীয় সরকার বিভাগের সাথে আলোচনা চলতে থাকে এই অভিজ্ঞতাকে কী করে অন্যান্য ইউনিয়নে কাজে লাগানো যায়। এই ভাবনাকে ত্বরান্বিত করে ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে ২০০৮ সালের মে-জুন মাসে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় একাধিক ‘ই-সরকারি সেবা’ কর্মশালা। এতে সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অংশ নেন। কর্মশালায় সচিবরা প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগ থেকে একটি করে মোট ৫৩টি ই-সেবা চিহ্নিত করেন, যা পরে কুইক উইন উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত পায়, যেমন-ইউআইসি, এআইসিসি, এফআইসিসি। এর ধারাবাহিকতায় সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয় টেলিসেন্টার গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নেয়। কুইক উইন উদ্যোগের আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগ ৩০টি ইউআইসি (ইউনিয়ন ইনফরমেশন সেন্টার), কৃষি মন্ত্রণালয় ১০টি এআইসিসি (কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র) এবং মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় ২১টি এফআইসিসি (মৎস্য তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র) স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

‘পাবলিক-প্রাইভেট-পিপলস-পার্টনারশিপ’ মডেল

সরকারি উদ্যোগে টেলিসেন্টার গড়ে উঠছে ৪পি মডেলে। এ মডেল অনুযায়ী ইউআইসি স্থাপিত হয় ইউনিয়ন পরিষদে এবং তা পরিচালনা করে দুইজন স্থানীয় উদ্যোক্তা। এআইসিসি স্থাপিত হয় কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন কৃষি ক্লাবে এবং তা পরিচালনাও করে ওইসব ক্লাব। এফআইসিসি স্থাপিত হয় গ্রাম/উপজেলাভিত্তিক এবং তা পরিচালিত হয় এক বা একাধিক অভিজ্ঞ মৎস্যচাষীর উদ্যোগে। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার আসে ইউএনডিপি থেকে। সমন্তকর ভূমিকা পালন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ।

প্রতিটি টেলিসেন্টারে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে ‘তথ্যকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি’ রয়েছে। এই কমিটির দায়িত্ব হলো টেলিসেন্টার যথাযথভাবে ইউনিয়নবাসীর চাহিদা অনুযায়ী তথ্য ও সরকারি সেবা দিতে পারছে কি-না, এ কাজে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি-না তার খোঁজখবর রাখা এবং সহায়তা করা। উদ্যোক্তার সাথে এই কমিটির নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি চুক্তি হয়। উদ্যোক্তা এই সময়ের মধ্যে মানুষকে তথ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেলিসেন্টারকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেয়।

এই মডেল তৈরি হয় একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। স্থানীয় সরকার বিভাগ দিয়ে শুরু। তারা ইউআইসি বিষয়ে বিভিন্ন টেলিসেন্টার প্র্যাকটিশনার, বাংলাদেশ টেলিসেন্টার নেটওয়ার্ক, এটুআই এবং একাধিক দাতা সংস্থার সাথে একাধিকবার আলোচনা করে। পরবর্তীতে ইউআইসির সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য মাঠ পর্যায়ে একাধিক টেলিসেন্টার পরিদর্শন করা হয়। এতে মাধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত সিইসি এবং বেসরকারি উদ্যোগে অন্যান্য একাধিক টেলিসেন্টারের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়। এই সব টেলিসেন্টারে খুঁজে দেখা হয় এর শক্তি, দুর্বলতা, ঝুঁকি, সম্ভাবনা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হবার বিষয়টি। এতে প্রতিটি এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা হয় ইউআইসি সম্পর্কে।

নতুন নতুন সম্ভাবনা

মাধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদে আমরা দেখেছি সিইসি সেখানে একটি পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি চ্যানেল হয়ে উঠেছিল। একই ধারাবাহিকতা সব টেলিসেন্টারের জন্যই জরুরি। শুধু সরকারি সেবা নিশ্চিত করা নয়, প্রতিটি টেলিসেন্টার হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতে একেকটি ওয়ান স্টপ শপ।

তৃণমূল এলাকায় নারীদের যে বঞ্চনা তথ্যপ্রযুক্তি তা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা যা আনতে নারীকে ঘরের বাইরে যাবার দরকার পড়ে, তথ্যপ্রযুক্তি তা যেকোনো নারীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে। নিজের গ্রামে, নিজের ইউনিয়নে তথ্যকেন্দ্র হলে আজ হোক কাল হোক, যত রক্ষণশীলতাই থাক, নারীর তথ্যপ্রযুক্তির কাছাকাছি যাবার পরিবেশ ঘটবেই। নারী ছাড়াও তৃণমূল পর্যায়ে বহুসংখ্যক ‘ভয়েসলেস’ মানুষ আছে, সচেতনতার অভাবে যাদের নিজের এলাকার বাইরের কোনো খবর জানার সুযোগ নেই, তাদের জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে।

মোবাইলের মাধ্যমে স্বল্প পরিমাণে টাকা পাঠানো বাংলাদেশে এবং একাধিক উন্নয়নশীল দেশে এখন বেশ পরিচিত। এটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, তার মূল কারণ সহজ প্রক্রিয়া এবং অর্থ-সাশ্রয়ী ব্যবস্থা। মোবাইল ব্যাংকিং অথবা এম-ব্যাংকিং ইতোমধ্যেই একাধিক দেশে আজ পরীক্ষিত। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা এই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে গতানুগতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে সুবিধা ও অধিকারবঞ্চিত মানুষ যাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা নেবার সুযোগ নেই বললেই চলে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে (টেলিসেন্টার ব্যবহার করে) তাদের জন্যও ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

নতুন নতুন সম্ভাবনা এবং বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা অর্জনের ফলে যে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে একে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘পৌরসভা তথ্যকেন্দ্র’ স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ম্যাট ২ প্রকল্পের আওতায় নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল পৌরসভায় এ তথ্যকেন্দ্র কাজ শুরু করেছে। একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম এতে ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। একই সাথে এগিয়ে চলছে উপজেলা তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যে একাধিক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য এ ব্যাপারে সব রকম সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জন করার একটি অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। এই ভিত্তির একটি প্রধান অংশ হলো আজকের মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ১০ থেকে ১৫ বছর। ২০২১ সালে এদের বয়স হবে ২২ থেকে ২৭ বছর-সত্যিকার অর্থে দেশ গড়ার কাজে সৈনিক হবার বয়স। তখন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা এবং এদের অনেকেই কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। আজকের এই কিশোর-কিশোরীদের মননে ও চিন্তায় দেশপ্রেমের পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার গুরুত্ব গেথে দেয়াটা জরুরি একটি কাজ। কারণ, এরা যদি এখন থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য তৈরি না হয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে মানসিক শক্তি ও উপলব্ধি দরকার, তা যদি এদের মধ্যে গড়ে না ওঠে, তবে এদের পক্ষে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে না। এ প্রক্রিয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেশি করে যুক্ত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটা ঘটলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে সৈনিক বাহিনী গড়ে উঠবে তাতে দেশের পঁচানববই ভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। টেলিসেন্টারগুলো স্কুল পর্যায়ের এই বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে তাদের আইসিটি অ্যাম্বাসেডর হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

এখানে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো আইসিটি টাস্কফোর্সের মতো একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। সম্প্রতি পাস হওয়া প্রস্তাবিত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতিমালায় ৩০৬টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জনে অত্যন্ত জরুরি। এ উভয় প্রক্রিয়ায় দেশবরেণ্য বিশেষজ্ঞরা সম্পৃক্ত রয়েছেন।

চ্যালেঞ্জ

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে তথ্যপ্রযুক্তির এ সুবিধা পুরোপুরি ঘরে তোলা যাবে না। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে তার ৮৫ ভাগই গ্যাসনির্ভর। মাত্র সাড়ে চারভাগ কয়লা দিয়ে এবং অবশিষ্ট বিদ্যুৎ তৈরি হয় ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও পানি বিদ্যুৎ প্লান্টের মাধ্যমে। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ তৈরির এ পরিকল্পনা যথাযথ হয়নি।

এখন যা দরকার

বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারসহ সব ক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা দৃঢ়ভাবে বলে আসছে। সঙ্গত কারণেই এটা ধরে নেয়া যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি সদিচ্ছা। এখন এই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দরকার সরকারের একটি মহাপরিকল্পনা, একটি রূপরেখা-যার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় থেকে এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব হয়।

সরকারি উদ্যোগে যে তিনটি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে টেলিসেন্টার বা তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, দ্রুতই উচিত এই কর্মপ্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা। মানুষের দোরগোড়ায় সত্যিকার অর্থে তথ্য ও সরকারি সেবা চাহিদা অনুযায়ী পৌঁছালো কি-না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরও। এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হলো কি-না তার জবাবদিহি করার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

টেলিসেন্টার নিয়ে যেসব মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে দরকার তাদের মধ্যে সুসমন্ত। এসব টেলিসেন্টারের জন্য যে ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি হতে যাচ্ছে, তা চাহিদা অনুযায়ী হচ্ছে কি-না এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য এ সমন্ত অতি জরুরি। শুধু টেলিসেন্টারসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নয়, সমন্ত দরকার আইসিটি ব্যবহার করে মানুষের দোরগোড়ায় তথ্যসেবা পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে যেসব মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে-যেমন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-তাদের সবার মধ্যে। দরকার এ বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা করে সবার জন্য নতুন কর্মপরিধি সৃষ্টি করা।

জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য ও সরকারি সেবা পৌঁছাতে হলে এখন যারা ই-গভর্নেন্স ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিষয়টি অবশ্যই তাদের কর্মপরিধিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সাথে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে জেলা প্রশাসকদের কর্মপরিধিও। সরকারি কর্মকর্তারা যাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠতে শুরু করেন, সেজন্য তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে এ বিষয়ে নম্বর যোগ করার ব্যবস্থাও করা দরকার।

কজ ওয়েব

ফিডব্যাক : manikswapna@yahoo.com
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস
অনুরূপ লেখা