Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: সুপর্ণা রায়
মোট লেখা:২
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০০৯ - ফেব্রুয়ারী
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
ডিজিটাল বাংলাদেশই-গভর্নেন্স, 
তথ্যসূত্র:
ই-গভর্নেন্স
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এমনই একটি উদ্যোগ অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কার কর্মসূচী (এফএমআরপি), যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ দ্রুততর এবং সহজতর করার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়া থেকে ব্যবস্থাগত দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপচয় কমাতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা বড় জরুরি। বলা হয়ে থাকে, একটি দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক অর্থ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পুরো প্রক্রিয়াকে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বাংলাদেশের সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার কর্মসূচীর উদ্যোগ নেয়া হয় অনেক আগে থেকেই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অর্থ ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অবস্থান খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার সরকারি আর্থিক হিসাব-নিকাশের জন্য একটি সুদক্ষ ডাটা তৈরির ব্যবস্থা করে। পরে ১৯৯১ সালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটিও গঠন করা হয় সুব্যবস্থাসম্পন্ন উন্নত সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য। এ প্রেক্ষিতে কমিটি অন রিফর্মস ইন বাজেটিং অ্যান্ড এক্সপেনডিচার কন্ট্রোল তথা ‘করবেক’ অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কার বাস্তবায়নের সমস্যা বিশ্লেষণ এবং সুপারিশমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। ম্যানুয়াল প্রসেস, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং ও পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো তাই মূলত সময়মতো, পর্যাপ্ত এবং সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত ডাটা দিতে ব্যর্থ হতো বলে এ কমিটি চিহ্নিত করল। এ কমিটির সুপারিশমালার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রক্রিয়াকে কমপিউটারায়ন, বাজেট ফরকাস্টিং এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও অ্যাকাউন্টস অফিসের মধ্যে বাজেটের যে ডাটা এবং পরিসংখ্যান পাঠানো হয়, তার মধ্যে একটি ইলেকট্রনিক যোগসূত্র স্থাপন করা হয়। এর ফলে বিভিন্ন কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের সদস্য, আইন প্রণেতা এবং ঋণদাতা রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য পেতে শুরু করলেন এবং এই তথ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

করবেক-এর পরে রিবেক ১ এবং রিবেক ২ বাস্তবায়ন শুরু হয় আরো বড় ধরনের সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে। এ কর্মসূচী দুটিও প্রতিটি খাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রক্রিয়া এবং নতুন প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করল।

রিবেক ২ একটি বড় প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও সরকারের কোনো মালিকানা না থাকায় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে রিবেক ২ বি এবং রিবেক ২০০০ বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং এটি পর্যায়ক্রমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অ্যাকাউন্টস ব্যবস্থাকে এর আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করতে থাকে।

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কারে রিবেক প্রকল্পের অবদান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লক্ষ করা গেল, সরকারের অর্থ ব্যয়ের যে তথ্য, তা সরকারের অর্থ আয়ের জন্য যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হচ্ছে তাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কার কর্মসূচীর ধারাবাহিকতায় রিবেক প্রকল্পের উদ্যোগের সম্প্রসারণ এবং এই প্রকল্পের যে দুর্বল দিক আছে তার সমাধানের প্রচেষ্টায় অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কার কর্মসূচী (এফএমআরপি) ২০০২ গৃহীত হয়। এটি ৫ বছরের একটি কর্মসূচী, যা মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এর অর্থায়ন করছে ইউকে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ডিএফআইডি এবং দি রয়্যাল নেদারল্যান্ডস অ্যাম্বেসি।

এই প্রকল্পের আওতায় একটি ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক ওয়ান গঠন করা হয়েছে, যা ৬৪টি জেলার অ্যাকাউন্টস অফিসের সাথে সংযুক্ত। এই ওয়ান মূলত প্রতিটি জেলার অ্যাকাউন্টসের ডাটা সংগ্রহের জন্য ব্যবহার হয়, যা একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা হয়। প্রত্যেকটি জেলা অ্যাকাউন্টস অফিসে অনলাইন কানেকশন রয়েছে। এ কারণে মাঠপর্যায়ের যেকোনো অফিসের ডাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড হতে থাকে। এর ফলে সে প্রতিষ্ঠানের সব ব্যয়ের হিসাব কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফিস থেকে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

কম্পোট্রলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফিস অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সরকারি অর্থ গ্রহণ এবং বিভিন্ন বিভাগে বিতরণ করে থাকে। এফএমআরপি’র ফলে যে রোবাস্ট এবং অটোমেটেড ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা ডাটার ভুলের পরিমাণ কমাচ্ছে, কাজের দ্বৈততা কমছে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ও সংস্থায় সরকার কী পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করেছে এবং সেসব সংস্থার ব্যয়ের হিসেব চটজলদি জানা যায়।

অর্থ ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াতে এফএমআরপি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। এফএমআরপিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দেয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এ ছাড়াও বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ, প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের ব্যয় সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে এটি মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক এমটিবিএফ-এর ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এমটিবিএফ কার্যকরী হওয়ার ফলে সঠিক ব্যয় এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের ব্যয় হতে পারে এবং কী পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, তা সহজেই নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এ ধরনের সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়ার ফলে বাজেট প্রণেতারা খুব সহজেই জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় কাজে লাগাতে পারছেন।

এফএমআরপি প্রকল্পটি সফল হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে যখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তা শুধু কাজের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহার হয়েছে। আলাদা কোনো পদ্ধতি হিসেবে নয়। এ কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কোনো সমস্যা তৈরি করেনি। প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যারা জড়িত তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অধিকন্তু, প্রযুক্তিগত বিষয়ের বাইরেও মালিকানা বোধ একটি বড় বিষয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে এতটা সাফল্যমন্ডিত করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অবদান ছিল। এছাড়াও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অগ্রগামী চিন্তার সংস্কৃতির প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।

এফএমআরপি অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি সফল উদাহরণ হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি প্রকল্পের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, এখানে কমপিউটার অপারেটর বলে কোনো পদ ছিল না। প্রকল্পের কর্মীরাই তাদের কমপিউটারের কাজ নিজেরাই করতে সক্ষম ছিলেন। এই টিমের প্রত্যেকেই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের পাশাপাশি একটি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা গঠন করার দিকে মনোযোগী ছিলেন।

সবশেষে বলা যায়, এফএমআরপি একটি দেশের অর্থ ব্যবস্থাপনাকে দক্ষ উপায়ে নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্বাবধান করতে একটি ভালো কৌশল হতে পারে। সুশাসন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা যে পদক্ষেপের কথা বলি, তার একটি বড় ধাপ হতে পারে সব সরকারি মন্ত্রণালয়ে এফএমআরপির বাসত্মবায়ন। আর আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি তার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একটি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক অর্থ ব্যবস্থাপনা, যা সুশাসনের পথকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে।
কজ ওয়েব

ফিডব্যাক : sumeroy@yahoo.com
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
২০০৯ - ফেব্রুয়ারী সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস