Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > ইউএনওদের নেতৃত্ব এবং জনগণের নাগালে সরকারি সেবা
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: মানিক মাহমুদ
মোট লেখা:২৪
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১০ - ফেব্রুয়ারী
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
সার্ভিস সেক্টর
তথ্যসূত্র:
দেশ ও প্রযুক্তি
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
ইউএনওদের নেতৃত্ব এবং জনগণের নাগালে সরকারি সেবা

ইউএনডিপির সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম’ দেশের ইউএনওদের জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে। দুই দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় দেশের সব উপজেলার নির্বাহী অফিসার অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রশিক্ষণের উদেবাধন করেন ৩১ অক্টোবর ২০০৯।

বর্তমান সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করেছে। এই রূপকল্পের মূল বক্তব্য হলো দেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। বলা হচ্ছে, এই রূপকল্পের সফল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ঘটানো হবে। তবে যে কথাটি এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার, ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে প্রযুক্তির রূপকল্প নয়, এটি একটি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রূপকল্প। এই আর্থ-সামাজিক রূপকল্পের সফল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মাঠ প্রশাসনের সম্পৃক্ততা জরুরি। জনগণের হাতের নাগালে সরকারি সেবা পৌঁছাতে হলে মাঠ প্রশাসনকে দায়িত্ব নিয়েই এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে।



মাঠ প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার প্রশ্নে এই প্রশিক্ষণটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এ প্রশিক্ষণ থেকে কমপক্ষে তিনটি উপলব্ধি বিবেচনায় নেয়া যায়, যা শুধু উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের জন্যই নয়, দেশের যেকোনো সচেতন নাগরিকের জন্যই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথম উপলব্ধি :

সেবা যাবে মানুষের কাছে। মানুষ সেবার কাছে যাবে না। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। প্রচলিত প্রক্রিয়ায় সেবা থাকে সরকারের বিভিন্ন দফতরে। সেখানে সেবা দেবার জন্য মানুষ থাকে, তবে তাদের কাছে সহজে সেবা পাওয়া যায় না। সেবা পাবার জন্য নানা ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সেসব ধাপ অতিক্রম করতে মানুষকে হয়রান হতে হয়, প্রতারিত হতে হয়, দুর্নীতির পাতানো ফাঁদে পা দিতে হয়। এসব ধকল সামলাতে না পেরে মানুষ সরকারি দফতরে আসাই ছেড়ে দেয়। যারা তা করতে পারে না, তারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয় দ্রুত সেবাটি নেবার জন্য। কিন্তু যারা ঘুষ দেবার সামর্থ্য রাখে না, তাদের কি হবে। এখানেই উপলব্ধিটির গুরুত্বব। প্রচলিত এই সেবাদান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ডিজিটাল বাংলাদেশ কোনোদিনই অর্জিত হবে না। দরকার এর পরিবর্তন। বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তথ্যপ্রযুক্তিই শুধু তা করতে পারে। যে তথ্য ও সেবা মুহূর্তের মধ্যে মোবাইলের মাধ্যমে ২ টাকা খরচ করে পাওয়া যায় তার জন্য মানুষ বেশি সময়, বেশি টাকা খরচ করবে কেনো। ইন্টারনেট থেকে একটি সরকারি ফরম যদি ১০/২০ টাকা ব্যয় করে ইউনিয়ন পরিষদ থেকেই সংগ্রহ করতে পারে, তবে এর চেয়ে বেশি ব্যয় মানুষ কেনো করবে। স্থানীয় হেল্প ডেস্ক থেকে ফোন করে যেকোনো মানুষ অল্প খরচে যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারে দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তের একজন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে। একজন মোবাইল লেডি মোবাইল নিয়ে গ্রামের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া একজন নারীর কাছে পৌঁছতে পারে সেই নারীর সবচেয়ে জরুরি সেবাটি নিয়ে, যা কোনোভাবেই প্রচলিত পদ্ধতিতে পাবার সুযোগ তার নেই। এভাবেই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবাকে মানুষের নাগালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয় উপলব্ধি :

ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্থ ঘরে ঘরে ডেস্কটপ কমপিউটার নয়। বাংলাদেশে এটা একটা পরিচিত আলোচনা সবার হাতে কমপিউটার না থাকলে, সবাই ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় না এলে ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে কিভাবে। যেনো সবার হাতে কমপিউটার থাকাটা ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি অন্যতম শর্ত। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। আমাদের সবাইকে কমপিউটার বক্সের বাইরে আসতে হবে। নইলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে কথা নয়, আমাদের সাধারণ যে অগ্রগতি, একুশ শতকের উপযোগী একজন মানুষ হিসেবে চলার জন্য যে দক্ষতা, যে অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তা থেকেও আমরা বহু দূরে থাকব। ঘরে ঘরে কমপিউটার থাকার ব্যাপারটি একটি মানসিকতার ব্যাপার। আসল প্রশ্নটি হলো সরকারি সেবা। এই সেবা যারা দেবে বা যে প্রক্রিয়ায় সেবাটি নিশ্চিত হবে সেখানে কমপিউটার আছে কি না, সেখানে কমপিউটার ইন্টারনেটের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না সেটাই আসল প্রশ্ন। যারা সেবা দেবে তাদের যদি সঠিক দক্ষতা না থাকে, তবে যারা সেবা নেবে তাদের হাতে কমপিউটার থেকে কি লাভ হবে। ফলে দেশের সবার তো কমপিউটার জানার দরকার নেই। ঘরে ঘরে কমপিউটার দরকার- এই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কিন্তু নীতিনির্ধারকরাও নন। তার প্রতিফলন আমরা দেখি সারাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের হৈচৈ করে কমপিউটার শেখানোর ‘কমপিউটার লিটারেসি প্রোগ্রাম’ আয়োজন দেখে। এটা একটা সনাতনী ধারণা।

তৃতীয় উপলব্ধি :

ই-নেতৃত্বের বিকাশ সবচেয়ে জরুরি। অনেক গবেষণা থেকেই বেরিয়ে এসেছে কোনো পরিবর্তনে প্রযুক্তির ভূমিকা মাত্র ২০ শতাংশ। আসল কথা হলো নেতৃত্ব। প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর বিষয়টিই আসল। প্রযুক্তি হাতে থাকলেও যে প্রক্রিয়ায় সেবা নিশ্চিত হবে, তা যদি কাজ না করে তবে কারো জন্যই কোনো ফল বয়ে আনবে না। যেমন- ইউএনও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঠিক সময়েই ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠালেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে তা যদি পড়ে থাকে ৬ মাস, তবে কার কী লাভ হবে। ফলে পরিবর্তন দরকার সর্বত্র। এখানেই নেতৃত্বের প্রশ্ন। প্রশিক্ষণে এটি ছিল একটি অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়।
ইউএনওদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি দেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। এ প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করে ইউএনওদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্থ ঘরে ঘরে কমপিউটার নয়, তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানুষের সার্বিক জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। এই উদ্যোগ সকল মানুষকে, বিশেষ করে গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সরকারি সেবার আওতায় নিয়ে আসার জন্য। তিনি আরো বলেন, আমরা উপলব্ধি করেছি, সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়তে হলে তথ্যপ্রযুক্তিকে সরকারি সেবাদানের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। আমি জানি, এই নতুনত্ব, এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া অনেকের জন্য কষ্টকর হতে পারে। কিন্তু তাদের প্রতি আমার আহবান, মনে রাখবেন, এ পরিবর্তন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধা বয়ে আনবে। তিনি বলেন, মানুষ যাতে করে এই পরিবর্তনের সাথে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা। আমি আপনাদের অসাধারণ নেতৃত্ব আশা করি।

প্রত্যেক ইউএনও এই প্রশিক্ষণে আসার আগেই এসাইনমেন্ট হিসেবে একটি করে সহজসাধ্য উদ্যোগ (কুইক উইন ইনিশিয়েটিভ) গ্রহণ করেন। সহজসাধ্য উদ্যোগ বা quick-win-এর একটি প্রধান দিক হলো, এটি এমন ধরনের উদ্যোগ এক বছর বা তারও কম সময়ে বাস্তবায়ন করা যায়। কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিপাদ্য যেমন- ‘জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে’ দেবার ধারণাটিকে বাস্তবসম্মতভাবে সব আগ্রহীপক্ষের সামনে উপস্থাপন করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য সেবা সংক্রান্ত হয় এবং সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ করে করা হয় যাতে উদ্যোগটি সফল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সহজসাধ্য উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য দুইটি। প্রথমত, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে জটিল কোনো সমস্যা সমাধানের আগে সহজে সমাধানযোগ্য সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস অর্জন ও আগ্রহ তৈরি করা। দিবতীয়ত, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন একটি মাধ্যম যেমন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা বাড়ানো ও এ সংক্রান্ত জটিলতা পরিহারের সঠিক অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

ইউএনওরা নিজেরাই আলোচনা করে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ সফল হওয়া জরুরি। এজন্য এ ধরনের উদ্যোগ বাছাই করতে মুন্সিয়ানা দেখাবার সুযোগ রয়েছে। পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ইউএনওরা এই সহজসাধ্য উদ্যোগ বাছাই করেন।

০১.
ইউএনওরা এমন একটি উদ্যোগ বেছে নেবার চেষ্টা করেন যেটি একটি সেবা সংক্রান্ত হয় এবং যা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ সদস্যই ব্যবহার করে। এতে করে জনগোষ্ঠীর মাঝে উদ্যোগটির জনপ্রিয়তা বেশি হবে এবং জনগণের অংশগ্রহণও বাড়বে।

০২.
উদ্যোগটি যেন সহজসাধ্য হয়, অর্থাৎ সেবাদানের বর্তমান ব্যবস্থার উন্নতি করতে যেন এমন একটি পদ্ধতি বাছাই করা হয়, যা স্থানীয় সম্পদ দিয়েই টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এমন একটি সেবাকে বাছাই করা ভালো যে সেবাটি পেতে বর্তমানে মানুষকে অনেক বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেক্ষেত্রে সামান্য প্রচেষ্টাতেই ও বর্তমান পদ্ধতির সামান্য পরিবর্তন করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজে পরিমাপযোগ্য উন্নতি আনয়ন ও জনগণের আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়।

০৩.
উদ্যোগটি প্রণয়নের সময় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখা হয়। সেবা বিতরণের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির কোন সরঞ্জাম (যেমন- কমপিউটার/ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি) ব্যবহার করবেন তা নির্ধারণ করার সময় জনগণের হাতে যে সরঞ্জামটি বেশি আছে বা যে সরঞ্জামটি জনগণ বেশি ব্যবহার করে সে ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়।

০৪.
যেহেতু এটি একটি সহজসাধ্য উদ্যোগ, প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় সীমিত রাখা হয়। এমন প্রচেষ্টা করা হয়, যাতে উপজেলায় বর্তমানে চালু কোনো প্রকল্পের সাহায্যে সহজসাধ্য উদ্যোগটি নেয়া যায়। এছাড়া বেসরকারি সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেয়াকেও উৎসাহিত করা হয়।

০৫.
যেহেতু এ ধরনের একটি উদ্যোগ সব পক্ষের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়ও বটে, এজন্য এ ধরনের উদ্যোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতির কারণ ও উদ্যোগটি কোনো সমস্যায় পড়লে তার সঠিক নিরূপণ করার চিন্তা বিবেচনায় নেয়া হয়।

এসব উদ্যোগ সম্পর্কে পর্যালোচনা করে ইউএনওরা নিজেরাই মন্তব্য করেন, আমাদের ভিন্ন উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে নিজেকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবার দক্ষতা হয়ত অর্জন করা সম্ভব, এটা অবশ্যই একটা বড় পরিবর্তন, তবে একুশ শতকের উপযোগী হয়ে ওঠার জন্য এই পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। কারণ, শুধু নিজে দক্ষ হয়ে যদি মানুষের কাছে সরকারি সেবা দ্রুত সহজে পৌঁছে দিতে না পারা যায়, তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা যদি তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেই দেয়া না গেল, তবে এই দক্ষতা অর্জন কোনো কাজের হলো না।

সংস্থাপন সচিব এ ব্যাপারে নির্মোহভাবে আসল সত্যটি বারবার উচ্চারণ করেন। ইউএনওদের তিনি বারবার স্পষ্ট করে যে বার্তাটি দেবার চেষ্টা করেন, তাহলো মানুষকে সরকারি সেবার আওতায় আনার কাজে অনেক সমস্যা আছে, অনেক ঝুঁকিও হয়ত আছে, কিন্তু এ কাজ অসম্ভব নয়। আমরা যেটি দেখতে চাই, একজন ইউএনও তথ্যপ্রযুক্তিকে সাথে নিয়ে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেবার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার কাজে নেমে পড়েছেন।

দিবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ইউএনওদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্থ পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের অর্থ রাতারাতি বিপ্লব নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে ছোট ছোট পরিবর্তন যা প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ, অসাধারণ মানুষ সবাই কমবেশি ঘটাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো একত্রিত করা দরকার, দরকার এসব পরিবর্তনের সুসমন্বয় ঘটানো- যার মধ্য দিয়েই বড় পরিবর্তনের পথ সুগম হবে। তথ্যপ্রযুক্তিকে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কাজে লাগাতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের কাছে একটি স্বপ্ন। আমরা এই স্বপ্ন নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করি ২০০৪ সালে। এই ভাবনার শুরু থেকেই আমাদের মধ্যেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তখন থেকেই আমরা ভাবতে শুরু করেছি, এই স্বপ্নের সাথে জনগণের অধিক সম্পৃক্ততা ঘটবে কিভাবে, ব্যাপকসংখ্যক মানুষ কিভাবে এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে যুক্ত করবে। আমরা ভেবেছি, এই স্বপ্ন তো শুধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় স্বপ্ন হলে হবে না, তা হতে হবে দেশের প্রতিটি মানুষের। এই স্বপ্ন হতে হবে আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মীর, যারা এই স্বপ্ন দেশের আনাচেকানাচে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পালন করবে। আমরা ২০০৪ সালেই অনুধাবন করেছি, তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে না লাগাতে পারলে এই স্বপ্ন অর্জনের জন্য যে প্রক্রিয়া দরকার তা কোনোভাবেই শুরু করা যাবে না।

প্রশিক্ষণের দিবতীয় ব্যাচের সমাপনীতে এসেছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি আর একটি গুরুত্ববপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, আমরা সবাই ডিজিটাল বাংলাদেশের মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের কাছে সহজে ও দ্রুত তথ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাচ্ছি। বিশেষ করে সরকারি সেবা। আমি নিশ্চিত, এর মাধ্যমে ব্যাপকসংখ্যক মানুষের মধ্যে ক্রমশই দৃষ্টিভঙ্গিতে, আচরণে পরিবর্তন হতে থাকবে, মানুষ সমৃদ্ধ হতে থাকবে এবং এভাবে সমৃদ্ধ হতে হতে একসময় অনেক বড় পরিবর্তনের জন্য তারা প্রস্তুত হবে। মানুষ যদি প্রস্তুত হয় তখনই আমরা দেখতে পাব সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ। কিন্তু এই যে মানুষ পরিবর্তন হবার সুযোগ পেল, এটুকুই যদি শেষ কথা হয়, তবে আসল লক্ষ্য অর্জিত হবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশ যত ভালো উদ্যোগই হোক না কেনো, সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ, যারা প্রধানত এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তারা যদি মালিকানাবোধ না করে, তবে তা শুধু প্রশাসনের আর রাজনৈতিক দলীয় কর্মীদের উদ্যোগে পরিণত হবে, যা কেবল অসারতাই প্রমাণ করবে। সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে পারলে, তাদেরকে যুক্ত করতে পারলে, তারাই ছোট ছোট পরিবর্তনের নায়ক হবার মধ্য দিয়ে বড় পরিবর্তনের জন্য কাজ করবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইউএনওদের আরো বলেন, আপনারা যে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার তো মনে হয়, এটাই হতে পারে সত্যিকারের সেই জায়গা, যার মাধ্যমে সারাদেশে একদল আইসিটি প্রশিক্ষিত মানুষ তৈরি হবে, যারা সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির জন্য অগ্রসর সৈনিক হিসেবে সামনে এসে দাঁড়াবে। এর মধ্য দিয়ে যে কত বড় পরিবর্তন আসবে তা হয়ত আমরা এখন কল্পনাই করতে পারছি না। আমি আপনাদের এই ভূমিকার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি নিশ্চিত, আপনাদের এ ভূমিকার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে।

মন্ত্রীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সচিব এই প্রশিক্ষণে আসেন। তারা সবাই গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রশাসনের দৈনন্দিন যে কাজ- আইসিটি ব্যবহার করে যদি সে কাজ করা যায়, তাহলে সরকারের সেবা দেবার যে ম্যাকানিজম তা সক্রিয় হবে, সেবা দেবার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে এবং এভাবেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা হয় প্রশিক্ষণে তাহলো পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সরকারি সেবা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেবার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এতে বেসরকারি খাতকে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে। বেসরকারি খাতকে বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হলে সরকারকে নিজেকে আগে ডিজিটাল হতে হবে। সরকার ডিজিটাল হলে বেসরকারি খাতকে অধিক সম্পৃক্ত করা সহজ হবে। সরকার এগিয়ে গেলে বেসরকারি খাত তখন আর উদ্যোগী না হয়ে পারবে না। ইতোমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সারাদেশে যেসব উদ্যোগ শুরু হয়েছে বিশেষ করে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা টেনে বলা হয়- কেবল পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব নয়, জনগণের অংশীদারিত্বও নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রক্রিয়াকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে জনগণের সম্পৃক্ততাই কেবল যথেষ্ট নয়, তাদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

মন্ত্রী, সচিবদের আলোচনা শুনে ইউএনওরাও তাদের মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ হলে শুধু যে মানুষকে সেবা দেয়া সহজ হবে, তাই নয়, বিভিন্ন দফতরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কাজটিও সহজ হবে। এটা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্যও ভালো হবে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো তৃণমূলের জনগণ যারা বেশিরভাগই বঞ্চিত হয় সরকারি সেবা পাবার ক্ষেত্রে তাদের জন্য প্রশ্ন করার এক বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কিছু কিছু জায়গায় তার ক্ষেত্র ইতোমধ্যে তৈরি হতে শুরু করেছে। এটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত। এখন সমন্বিতভাবে এগিয়ে যাবার সময়।

কজ ওয়েব

ফিডব্যাক : manikswapna@yahoo.com
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস