Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > কমপিউটার জগৎ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের উদ্বেগ - ‘কবে মিটবে আইসিটি জনবলের অভাব’
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: এস.এম. গোলাম রাব্বি
মোট লেখা:৭২
লেখকের নাম: মোহাম্মদ তানভীর রেজা
মোট লেখা:১
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১০ - সেপ্টেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
গোল টেবিল বৈঠক
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
কমপিউটার জগৎ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের উদ্বেগ - ‘কবে মিটবে আইসিটি জনবলের অভাব’
মাসিক কমপিউটার জগৎ এর প্রকাশনার শুরু থেকেই বিভিন্ন সময়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে এর বাস্তব চিত্র দেশের সব মহলের মানুষকে অবহিত করা এবং সংশি¬ষ্ট অভিজ্ঞজনদের কাছ থেকে নানাধর্মী সমাধানের উপায় বের করে আনার লক্ষ্যে নানা বিষয়ে গোলটেবিল বৈঠক, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে আসছে। যখনই কমপিউটার জগৎ-এর পর্যবেক্ষণের দেখা গেছে, কোনো ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কিংবা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখনই কমপিউটার জগৎ বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে নানাধর্মী উদ্যোগ আয়োজনের মাধ্যমে।

সম্প্রতি কমপিউটার জগৎ-এর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে দেশে দক্ষ আইসিটি জনবলের একটা বড় ধরনের অভাব দেখা দিয়েছে। এর পরিণতিতে দেশের তথ্যপ্রযুক্তিগত উন্নয়ন অদূর ভবিষ্যতে থেমে যেতে পারে। জাতি মুখোমুখি হতে পারে অপূরণীয় ক্ষতির। কমপিউটার জগৎ তাগিদ অনুভব করে এ সমস্যার কার্যকর ও দ্রুত সমাধানের একটা উপায় উদ্ভাবন দরকার। সে তাগিদ থেকে কমপিউটার জগৎ গত ২১ আগস্ট এর সম্পাদকীয় কার্যালয়ে ‘আইসিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত আলোচকবর্গের আলোচনার মাধ্যমে যেমন এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার একটা চিত্র ফুটে ওঠে, তেমনি তাদের কণ্ঠ থেকে আসে উদ্বেগজনক তাগিদী প্রশ্ন : ‘দেশে কবে মিটবে দক্ষ আইসিটি জনবলের অভাব?’ তাদের এ প্রশ্নের অন্তর্নিহিত তাগিদ হচ্ছে অতি দ্রুত ও কার্যকর উপায়ে যে করেই হোক আমাদের দেশের বিদ্যমান দক্ষ ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি তথা আইসিটি জনবলের অভাব মেটাতেই হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো ভাবনা-চিন্তার কোনো অবকাশ নেই।

‘আইসিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান, ডেফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকতার হোসেন, জব পোর্টাল বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ.কে.এম ফাহিম মাশরুর, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস তথা বেসিসের মহাসচিব ফোরকান বিন কাশেম, স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসোর্টিয়ামের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তথা আইএসপিএবি-র মহাসচিব আমিনুল হাকিম। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন মাসিক কমপিউটার জগৎ-এর সম্পাদক গোলাপ মুনীর। আর এ আলোচনাধর্মী অনুষ্ঠানটির মূল সমন্বয়ক ছিলেন মাসিক কমপিউটার জগৎ-এর সহকারী সম্পাদক এম. এ. হক অনু।

গোলাপ মুনীর : মাসিক কমপিউটার জগৎ আয়োজিত ‘আইসিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত আলোচকবর্গসহ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। শুরুতেই জানিয়ে রাখছি, আমাদের এই অনুষ্ঠানটি কমজগৎডটকম সরাসরি ওয়েবকাস্ট করছে। আপনারা জানেন, মাসিক কমপিউটার জগৎ এর সূচনালগ্ন থেকেই মাঝেমধ্যে জাতীয় কোনো বিষয় নিয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে থাকে। আমরা মনে করি, আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে এ ধরনের তৎপরতার প্রয়োজন রয়েছে। আর আমরা এই তাগিদটুকু পেয়েছিলাম কমপিউটার জগৎ-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ অধ্যাপক মরহুম আবদুল কাদেরের কাছ থেকে। তাই আজকে আমরা আমাদের এই গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতেই তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

আমরা জানতে পেরেছি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিখ্যাত কোম্পানি স্যামসাং বাংলাদেশে অফিস খুলেছে। ইতোমধ্যেই এরা ১০০ জনবল নিয়োগ দিয়েছে। স্যামসাং এদেশে মোবাইল ফোন কনটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে কাজ করতে চায়। স্যামসাং ২০১২ সালের মধ্যে ২০০০ আইসিটি জনবল নিয়োগ দিতে চায়। কিন্তু ইতোমধ্যেই আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, তারা যে ১০০ আইসিটি পেশাজীবী নিয়োগ দিয়েছে, তা তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। এ থেকে আমরা এটুকু আন্দাজ করতে পারি, আমাদের দেশে দক্ষ আইসিটি জনবলের অভাব রয়েছে। এছাড়া আমরা বরাবর আমাদের প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে শুনে আসছি, তারা যখনই কোনো উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কোনো শিল্পকারখানা গড়তে যাচ্ছেন, তখনই তারা দক্ষ জনশক্তি পাওয়ার বিষয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। চাহিদামতো এরা দক্ষ আইসিটি জনবল পাচ্ছেন না। এ নিয়ে অতীতে আমাদের অনেক আলোচনা হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তারা এ ব্যাপারে তাদের নিজ নিজ বক্তব্য তুলে ধরছেন। বিভিন্ন মহল থেকে তাগিদ এসেছে, এ দুই খাতের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটা সেতুবন্ধন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে এ অভাব মোচনের। আজকের বাস্তবতা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে চাইলে আমাদের দরকার তিনটি জিনিস : হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং ম্যানওয়্যার। ম্যানওয়্যার বলতে বোঝাতে চাই ম্যানপাওয়ার তথা জনবল। আপনারা অবশ্যই স্বীকার করবেন, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের চেয়ে ম্যানওয়্যার অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এ জায়গাতেই আমরা মনে হয় সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। আশা করছি, আপনাদের অভিজ্ঞতাসিঞ্চিত আলোচনা থেকে আমরা আমাদের এই দক্ষ জনশক্তি কিভাবে গড়ে তুলতে পারি, তার একটা দিকনির্দেশনা পাব। আমি প্রথমেই এ বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য আহবান জানাচ্ছি ডেফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকতার হোসেনকে।

ড. সৈয়দ আকতার হোসেন : ধন্যবাদ আজকের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক গোলাপ মুনীরকে। ধন্যবাদ আয়োজক প্রতিষ্ঠান কমপিউটার জগৎ-কে, একটি সময়োপযোগী বিষয় নিয়ে এ ধরনের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য।

আইসিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব বিষয়ে আমি কিছু সাধারণ গবেষণা করেছি। আমরা বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে আসলেই দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে। এই ঘাটতিটা মনে হয় ক্রমেই বাড়ছে। একই সময়ে এ খাতে আরেকটি নতুন বিষয় যোগ হয়েছে। সেটা হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। ফ্রিল্যান্স ডেভেলপার যারা আছেন, তারা আমাদের বিশেষ খাতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে আসতে পারে কি না, তারা আসছেন না কেনো, সেটাও একটা প্রশ্ন। মনে হয়, আইসিটিতে জনবলের ঘাটতির একটা বড় কারণ এই ফ্রিল্যান্সিং। ফ্রিল্যান্সারেরা ঘরে বসেই আয় করছেন। হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে এরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের চাকুরেদের চেয়েও বেশি আয় করছেন। আমাদের আইসিটি খাতে যে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে এর পেছনে রয়েছে দু’টি কারণ। প্রথমত, অ্যাকাডেমিক দিক বিবেচনায়, আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থেই জ্যেষ্ঠ যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জরিপ চালালে দেখব, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সংখ্যা খুবই কম। দ্বিতীয়ত, আমাদের বেসরকারি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমানুপাতিকভাবে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। তারপরও যে সমস্যাটা রয়ে গেছে, সেটা হচ্ছে আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক রয়েছেন, যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেন। কিন্তু তাদের মনোযোগ এবং সময়ের অভাব আছে।

এবার ইন্ডাস্ট্রির প্রেক্ষাপট থেকে আমরা অ্যাকাডেমিকে দেখলে দেখব, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলোরও ছাত্রদের ইন্টার্নশিপ দেয়ার ব্যাপারে একটা ইতিবাচক মনোভাব দরকার। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি পরিপক্ব জনবল বা Finished Product বানানো সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গ্র্যাজুয়েট তৈরি করবে। আর তাকে সার্বিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের জন্য চূড়ান্তভাবে তৈরি করবে ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে আমরা গ্র্যাজুয়েটদের ভেন্ডর সার্টিফিকেশন কোর্সগুলো দিয়ে উৎসাহিত করতে পারি।

আরেকটি বিষয় নিয়েও আমি গবেষণা করেছি। সেটি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণগত মানের শিক্ষা। শিক্ষাজীবনের শেষবর্ষে ছাত্ররা যেসব প্রকল্প করে, সে প্রকল্পগুলো আসলে ইন্ডাস্ট্রির আলোকে হয় না। প্রকল্পগুলোর উদাহরণ হিসেবে উল্লে¬খ করা যায় হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ইত্যাদির কথা। সত্যিকার অর্থে এ প্রকল্পগুলোর ১০ শতাংশ সফল হয়, আর বাকি ৯০ শতাংশ সফল হয় না। কারণ, যে শিক্ষক প্রকল্প পরিচালনা করছেন এবং যে ছাত্র প্রকল্পটি সম্পাদন করছে, তাদের পক্ষে এটা শেষ করা সম্ভব নয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শেষ বর্ষের প্রকল্পগুলো নিয়ে একটা সমস্যা আছে : এই প্রকল্পগুলো হয় পুরোপুরি তাত্ত্বিক, অথবা পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী। এই প্রকল্পগুলো দিয়ে আমরা আসলে ছাত্রদেরকে তৈরি করতে পারি না। এ প্রকল্পগুলো নিয়ে কোনো ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে কাউকে সন্তুষ্ট করে চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়।

আরো দুয়েকটা বিষয়ে কথা বলতে চাই। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের কিছু কিছু বিষয় নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। একটা দেশের আইসিটি দক্ষতার অনেকাংশই নির্ভর করে সে দেশে যে খাতগুলো আছে সেগুলোর আইসিটি চাহিদা কেমন, তার ওপর। আবার যেসব আইসিটি খাত আছে এবং তাদের যে দক্ষ জনবলের চাহিদা আছে, সেটাও অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের কী কী সার্ভিস আছে, কী কী পণ্য আছে এবং ব্যবহারকারী যারা আছেন, তাদের ওপর। এ বিষয়ে আমাদের একটা গবেষণা দরকার। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মী যারা আছেন, তাদের অনুরোধ করব, আমাদের দেশে আইসিটিতে দক্ষ জনবল তৈরিতে আমাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো কী কী এ বিষয়ে কোনো জরিপ বা গবেষণা থেকে গবেষণা প্রবন্ধ বের করার জন্য। প্রয়োজনীয় এসব দক্ষতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয় সম্পর্কেও তাদের জানাতে হবে। এটা বের করতে পারলে আমাদের শিক্ষকদের একটা দিক-নির্দেশনা তৈরি হবে। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পগুলোতে সত্যিকার অর্থে ১০ শতাংশ কাজও হয় না। অনেক শিক্ষক আছেন, যারা ইন্ডাস্ট্রির কোনো বিষয় বুঝে না এবং সত্যিকার অর্থে তারা ক্লাসে যান, বইতে যেটা আছে সেটা পড়ান।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটা গ্রেডিং প্রতিযোগিতা আছে। সেখানে কোনো রকম একটা গ্রেড পেয়ে পাস করাই ছাত্রদের লক্ষ্য। আমাদের ছাত্ররা শেষ বর্ষে উঠেও জানে না তারা কোথায় চাকরি করবে। অথচ আমি ইউরোপে দেখলাম, একটা ছেলে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেই যথারীতি একটা চাকরির প্লাটফর্ম ঠিক করে ফেলে, সে কোন প্লাটফর্মে চাকরি করবে। আমরা আমাদের ছাত্রদের মনোভাব কিভাবে পরিবর্তন করতে পারি, আমার ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীদের কাছে এই প্রশ্ন রইল। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আমাদের ছাত্ররা প্রথম বর্ষেই যদি ওদের একটা নির্দেশনা ঠিক করে নিতে পারে, তাহলে কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে অনেকখানি এগিয়ে যাবে। কিন্তু এরপরও ওরা অনেক উদ্যমী। আমরা যদি ওদেরকে এ নির্দেশনাগুলো দিতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় আমরা যে দক্ষ জনশক্তির অভাব আজকে দেখছি, তা অনেকাংশে কমে যাবে।

আমাদের ছাত্রদের শেষ বর্ষের প্রকল্পগুলোকে যদি আমরা পুনর্গঠন করতে পারি, তাহলে একটা গ্র্যাজুয়েটকে অনেকাংশে বাজারমুখী করতে পারব। আমাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়ার জন্য হাজারো ধন্যবাদ।

গোলাপ মুনীর : ধন্যবাদ ড. সৈয়দ আকতার হোসেন। আপনি শিক্ষক মানুষ। আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আপনি এই যে দক্ষ আইসিটি জনবল গড়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে যে কিছু দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি নিজে শিক্ষক হয়েও শিক্ষকদের দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছেন, সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। দ্বিতীয় কথা, আপনার বক্তব্য থেকে আমরা পেয়েছি, এই জনশক্তির অভাব পূরণে প্রয়োজন শিল্পখাত ও শিক্ষাখাতের একটা যৌথ প্রয়াস। তাদের আন্তরিক সহযোগিতা আমাদের একটা পথ দেখাতে পারে। আপনাকে ধন্যবাদ।

এবার বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ করছি বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ. কে. এম ফাহিম মাশরুরকে। তিনি চাকরির বাজার নিয়ে কাজ করছেন। চাকরির বাজার সম্পর্কে তার বক্তব্যে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে এবং তিনি অন্যান্য খাতেও তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরবেন বলে আশা করছি।

এ. কে. এম ফাহিম মাশরুর : আমাকে বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিডিজবস তো সব খাতের জবের ব্যাপারে কাজ করে। কিন্তু আইসিটি সম্পর্কে আমার আগ্রহ বা অভিজ্ঞতা অন্যরকম। কারণ, আমি বেসিসের সাথেও জড়িত। আমি বেসিসের বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি। বেসিসের মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক যে কার্যক্রমগুলো হয়, সেগুলোর সমন্বয়ক আমি। সে অর্থে গত কয়েক বছর ধরেই আমাদের ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে বেশ কিছু সমস্যা বা সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছি এবং সেগুলোকে শনাক্ত করতে পেরেছি। সে দিকগুলো নিয়েই আজকে আমি আমার বক্তব্য দেবো।

একটি পরিসংখ্যান দিয়েই শুরু করছি। আমাদের হিসেব মতে, বিভিন্ন আইটি ডিসিপ্লি¬ন থেকে প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ হাজারের মতো আইটি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। আমি যদি আশপাশের অন্যান্য দেশ বা আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে তুলনা করি, তাহলে দেখি, শুধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গেই এ সংখ্যাটা ১৫ হাজার। আর পুরো ভারতে তো রয়েছে কয়েক লাখ আইটি গ্র্যাজুয়েট। পোল্যান্ডের মতো খুব ছোট একটা দেশ, যাদের মোট জনসংখ্যা হয়তো আমাদের মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগের ১ ভাগও নয়, সেই দেশেও প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার কমপিউটার গ্র্যাজুয়েট বের হয়। পোল্যান্ডের কথা বলার কারণ, আজকাল পোল্যান্ডের মতো দেশসহ পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশই আমাদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। আমাদেরও ওদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে, যদি আমরা বিশ্ববাজারে কাজ করতে চাই। এই পরিসংখ্যানটা দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের মোট আইটি জনবলের যে অভাব আছে তা বুঝানো।

প্রতিবছর আমাদের যে ৪ হাজারের মতো আইটি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, সে সংখ্যাটা একেবারেই কম। আমাদের হিসাব মতে, এই সংখ্যাটা ১০ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে হওয়া উচিত। যদি আমরা বাংলাদেশকে মোটামুটি মাঝারি সারির একটা ‘আইটি অফশোর’ বলি বা সার্বিকভাবে বাংলাদেশে যদি প্রচুর অভ্যন্তরীণ কাজ তৈরি হয়, সেক্ষেত্রেও এই সংখ্যাটা অন্তত ১০ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে হতে হবে। আইটি ক্যারিয়ারটা শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি গ্লোবাল প্রফেশন। একটা উদাহরণ দিই। একটা ছেলে যদি ডাক্তারি পড়ে, পুরকৌশল নিয়ে পড়ে কিংবা স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়ে, আর যদি সে বাইরে যেমন আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া গিয়ে চাকরি করতে চায়, তাহলে তাকে ওই দেশে গিয়ে একটা ডিগ্রি নিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যদি কোনো ছেলে আইটি বিষয়ে পড়ে এবং তার যদি কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে সে বিশ্বের যেকোনো জায়গায় নতুন কোনো ডিগ্রি না নিয়েই চাকরি পাবে। এই সুবিধাটা কিন্তু খুব কম পেশাতেই আছে। আইটি এমনই একটা গ্লোবাল ক্যারিয়ার, যেখানে বাংলাদেশে বসেও কেউ বিভিন্ন গ্লোবাল ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করতে পারে। সেটা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে হোক বা অন্য যেকোনো মাধ্যমেই হোক। এই বিষয়টাকে যদি আমরা তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, তাহলে ছাত্রছাত্রীদের বাজে ধারণাগুলো দূর হয়ে যাবে।

আর সরকারি পর্যায়ে বা বিভিন্ন পর্যায়ে থেকে বেশ বড় একটা ভূমিকা নিতে হবে। আইটি মূলত তারাই পড়বে, যারা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আসে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০০ সালে এসএসসিতে ৩০ শতাংশ ছাত্র ছিল বিজ্ঞান বিভাগের। এই অঙ্কটা কমতে কমতে ২০১০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ২১ শতাংশে। একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাণিজ্য বিভাগে। এটা শুধু আমাদের আইটি’র জন্যই ভয়ঙ্কর ব্যাপার নয়। আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ বিজ্ঞানবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব শুধু আমাদের আইটি ইন্ডাস্ট্রিতেই পড়ছে, তা নয়। কিছুদিন পর অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব পড়বে। সারাবছর আমাদের সর্বমোট গ্র্যাজুয়েট বের হয় মাত্র ২ লাখ। আমি হিসেব করে দেখেছি, এর মাত্র ২০ শতাংশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আসছে। অর্থাৎ ১৫ কোটি বা ১৬ কোটি মানুষের একটা দেশে যেখানে এত বড় বড় কর্মযজ্ঞ চলছে, সেখানে যদি মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী বের হয়, তাহলে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার আর কী হতে পারে।

সুতরাং আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যাতে বিজ্ঞানমুখী হয় সে ব্যাপারে এখন থেকেই চেষ্টা করতে হবে।

আমাদের গ্রেডিং সিস্টেমটাও কিন্তু বিজ্ঞান পড়ার অনুকূলে নয়। সেই ক্ষেত্রেও মনে হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়, একটা ভালো গ্রেড পেতে পারে এবং ভালো শিক্ষক, ভালো ল্যাবরেটরি ইত্যাদি সুবিধা পেতে পারে, সে ব্যাপারেও নজর দিতে হবে। এখানে বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিলের সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক আছেন। এরা একটা বড় কাজ করছেন। কয়েক হাজার স্কুল-কলেজে কমপিউটার বিতরণ করেছেন। ওই কমপিউটার ল্যাবগুলোতে ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে হোক, বা যেকোনো মাধ্যমেই হোক ছাত্রছাত্রীদের কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হবে। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করলেই চলবে না। ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষাদান করতে পারলে এ বিষয়ে ছাত্রছাত্রী আরো বাড়বে। আরো বেশ কিছু পরোক্ষ কাজ আমাদের করা দরকার। যেমন- আইসিটি পলিসি ২০০৯-এর ৩০৬টি অ্যাকশন আইটেমের মধ্যে কিছু আইটেম আছে যেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। এই আইটেমগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আমরা ভালো অবস্থায় যেতে পারব। একটা আইটেম ছিল, প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপিউটার সায়েন্সের সিটসংখ্যা দ্বিগুণ করা। আমি মনে করি, এটি খুব দ্রুত বাস্তবায়িত হওয়া উচিত। আরেকটা আইটেম ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮০০-র মতো কলেজ। স্নাতক পর্যায়ে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি কলেজে কমপিউটার সায়েন্স প্রোগ্রাম রয়েছে। ২০০৯-এর পলিসিতে আমরা প্রস্তাব করেছিলাম, প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে কলেজে কমপিউটার সায়েন্স খোলার জন্য। সে বিষয়ে আসলে ভালো কোনো কাজ হয়নি। আরেকটি বিষয় ছিল প্রশিক্ষণসংক্রান্ত। ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের প্রশিক্ষণের শতকরা ৮০ ভাগ খরচ সরকারের বহন করার কথা উল্লে¬খ ছিল ওই পলিসিতে। ভারতের ইনফোসিস নিজেরাই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মতো করে ফেলেছে। এরা অনেক ছাত্র নেয়। প্রতিটি ছাত্রকে এরা ৬ থেকে ৯ মাসের প্রশিক্ষণ দেয়। ইনফোসিস প্রতিবছর ২০ থেকে ৩০ হাজার লোক নেয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলো এখনো ওই পর্যায়ে আসেনি।

গোলাপ মুনীর : ধন্যবাদ ফাহিম মাশরুর। আপনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিসংখ্যান দিয়ে আমাদের আইসিটি জনবলের যে বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছেন তা অত্যন্ত মনোগ্রাহী। দ্বিতীয়ত, আপনি অনেক সুদূরপ্রসারী একটি পরামর্শ রেখেছেন। তা হলো আমাদেরকে বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার কথা ভাবতে হবে। এই বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে একটা বিরাট অদক্ষ জনবল জাতির ঘাড়ে চেপে বসবে। আর সে জনবল দিয়ে আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ বলি, কিংবা আইসিটিসমৃদ্ধ বাংলাদেশই বলি, কোনোটাই গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। আপনার অভিজ্ঞতাপ্রসূত এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের বক্তব্য অত্যন্ত মূল্যবান বলে আমি মনে করি। এবার আলোচনা করবেন তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রামের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান।

মুশফিকুর রহমান : ধন্যবাদ। আমি একটা কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে এখানে এসেছি। গত ১৫ বছর ধরে এ ইন্ডাস্ট্রিতে আছি। সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছি, কী কী সুযোগ দেখছি এবং কিভাবে আমরা বিষয়গুলো মোকাবেলা করবো সেসব ব্যাপারে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু বলার চেষ্টা করবো।

কিছুক্ষণ আগে গোলাপ মুনীর বলেছেন, স্যামসাং বাংলাদেশে আসছে। যদিও গত সপ্তাহ পর্যন্ত কিছু আইনগত সমস্যার কারণে ব্যাপারটি স্থগিত ছিল। কিন্তু স্যামসাং চালু হয়ে যাবে এ দেশে। তারা মোবাইল অ্যাপ্লি¬কেশন এবং এমবেডেড অ্যাপ্লি¬কেশনের ওপর রিসোর্স খুঁজছে। তাদের পরিকল্পনা ২০০০ সিটের একটি জনবল তৈরি করা। এটা যদি মোবাইল অ্যাপ্লি¬কেশনের বা এমবেডেড অ্যাপ্লিকেশনের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে আমার ধারণা এ মুহূর্তে ১০০ জনের মতো ইঞ্জিনিয়ারও আমাদের নেই। আমি জানি ওরা যখন প্রথম এসেছিল তখন খুব কমসংখ্যক অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ জন মেধাবী ছেলেকে পাঠিয়েছিল।

এখন স্যামসাংয়ের মতো যেসব কোম্পানি আসছে তাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ আসছে। আমাদের আইটির জন্য এটা একটা চ্যালেঞ্জ। নববই দশকের দিকে আমাদের আইটির যে স্রোত শুরু হয়েছিল, সেই স্রোতের সময়ে আমাদের কোনো অবকাঠামো ছিল না, সাবমেরিন ক্যাবল ছিল না। এখন কিন্তু একটা ভিন্ন ধারা আসছে।

ধরুন, স্যামসাং আমাদের দেশে আসছে। ভারতে আইটি ব্যবসায় অনেক ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। তাই এরা একটা ভিন্ন গন্তব্য খুঁজছে। একটা ভিন্ন উপায়ে এরা এখানে আসছে। আমরা যদি এই সুযোগটুকু কাজে লাগাতে চাই, তাহলে অন্তত ১০ হাজার আইটি পেশাজীবী দরকার হবে। তাহলে আমরা এটা কিভাবে তৈরি করবো। অর্থাৎ সমস্যাটা রয়েই গেছে। এ সমস্যা হতে উত্তরণের উপায় কী? ইন্ডাস্ট্রিগুলো এর উত্তরণ ঘটাতে পারবে না। কারণ, ইন্ডাস্ট্রিগুলোর নির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য বা চিন্তা থাকে। স্যামসাংয়ের মতো বড় কোম্পানিগুলো আসলে ওরা তো আমাদের মতো কোম্পানিগুলোর সব লোক নিয়ে যাবে। সুতরাং আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপে যেতে হবে। ঢাকার বাইরে মফস্বল এলাকায় হাজার হাজার মেধাবী ছেলেমেয়ে আছে। তাদের মধ্য থেকে খুব দ্রুত যোগ্য মানবসম্পদ বের করে আনা সম্ভব। একেবারে মফস্বল অঞ্চলের ছেলেমেয়েকে আমাদের টার্গেট করতে হবে। আমাদের সর্বোত্তম মানবসম্পদ বুয়েট থেকে আসবে না, কোনো পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসবে না। ভারত বা চীনে দেখা যায় পদার্থবিদ্যা বা রসায়নবিদ্যায় পিএইচডি ডিগ্রিধারী লোকজনও আইটিতে এসে কাজ করছে। ওদের সাথে আরো উচ্চমানের ছেলেমেয়ে কাজ করছে, যারা ওদের সাথে প্রতিযোগিতা করে পারছে না। আমাদেরকে এ জাতীয় ছেলেমেয়ে খুঁজে আনতে হবে। আগে বাংলাদেশে এনআইআইটি ছিল, অ্যাপটেক ছিল। কিন্তু এখন দেশে এ জাতীয় কোনো কিছু নেই। এদেরকে ধরে রাখার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া খুব জরুরি ছিল। আমি কয়েকটি ইন্ডাস্ট্রিতে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, দেশে ফিনিশিং স্কুল গড়া খুব জরুরি হয়ে গেছে। একই সাথে মাইক্রোসফট কিংবা ওরাকলের এডুকেশন সিস্টেমগুলো শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও নিয়ে যেতে হবে। আমাদের কোম্পানিগুলোকে এ উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা যত চেষ্টাই করি না কেনো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পুরোপুরি রেডি প্রকল্প কখনো পাওয়া যাবে না। আমাদের নিজেদের মতো করে তাদেরকে তৈরি করে নিতে হবে। এ মানসিকতাটুকু আমাদের মাঝে থাকতে হবে। এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি। ধন্যবাদ।

গোলাপ মুনীর : ধন্যবাদ মুশফিকুর রহমানকে। আপনি আপনার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদেরকে দক্ষ জনশক্তি পাওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সুন্দর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। আপনি ফিনিশিং স্কুলের কথা বললেন, যা অত্যন্ত সু-পরামর্শ। আপনাকে ধন্যবাদ।

এবার বক্তব্য নিয়ে আসছেন আইএসবিএবি’র মহাসচিব এবং ঢাকাকমের প্রধান নির্বাহী আমিনুল হাকিম।

আমিনুল হাকিম : কমপিউটার জগৎ-কে ধন্যবাদ, ‘আইসিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করার জন্য। ড. আকতার হোসেন একটা জায়গায় বললেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা কিংবা দক্ষ জনশক্তি বলতে আমরা কতটুকু বুঝি। ইন্ডাস্ট্রিতে যে জনশক্তি দরকার সে জনশক্তিটা আসলে পাবলিক কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসছে কি না। ফাহিম ভাইয়ের দেয়া হিসাব মতে, প্রতিবছর ৪ হাজারের মতো আইটি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। এই ৪ হাজার গ্র্যাজুয়েটকে আমরা আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে ধরছি কি না। সেটাও কিন্তু আমাদের করা হচ্ছে না। আমাদের পাবলিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যদি তুলনা করি তাহলে দেখব, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী গুরুত্ব দিচ্ছে তাদের সিজিপিএ’র ওপর। আমি একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আমরা যখন পড়ছিলাম তখন আমাদেরকে অ্যাকাডেমিক পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি রেফারেন্স বই পড়তে হতো। ব্যক্তিগত আগ্রহে ছাত্রছাত্রীদের রেফারেন্স বইগুলো পড়া উচিত। রেফারেন্স বইগুলো হতে পারে ভেন্ডর সার্টিফিশেন সংক্রান্ত কিংবা বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়সংক্রান্ত। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর অনেক গভীরে যাওয়া হয় না। ওদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৩ বা ৩.৫-এর ওপরে রাখা। এটা মূলত হয় আমাদের সচেতনতার অভাবের জন্য। সচেতনতা সৃষ্টিতে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খুব বেশি সময় দেয়া উচিত।

যখন কোনো কোম্পানিতে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়, তখন দেখা যায় দক্ষ পেশাজীবী খুব বেশি সময় কোম্পানিগুলোতে থাকতে চায় না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এরা হয়তো দেশের বাইরে চলে যেতে চায়। এজন্য দেখা যাচ্ছে, আমরা কোনো কোনো সময় খুব দক্ষ লোকজন নিতেও দ্বিধাবোধ করি।

আমাদের কমপিউটার সায়েন্সের সিলেবাসটা একটু পরিবর্তন করা দরকার। প্রাইভেট বলি, অথবা পাবলিক বলি, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই একই সিলেবাস ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে চালাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, প্রয়োজনীয় দক্ষতাটুকু বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সেট করে দেয়া উচিত। ইন্ডাস্ট্রি কী কী দক্ষতা চাচ্ছে সে অনুযায়ী জনশক্তি তৈরি করা উচিত। বিভিন্ন রেফারেন্স বই পড়ে ছাত্রছাত্রীদের জনশক্তি আরো বাড়ানোর ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা উচিত। এছাড়া ফাহিম মাশরুর যে বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার কথা বললেন, সেটাও আশা করি সরকারি পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে বাড়বে। মনে হয়, প্রতিবছর বের হওয়া এই ৪ হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েটকে নিয়েও যদি আমরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, সিলেবাস দিয়ে হোক, সচেতনতা দিয়ে হোক, তাহলে এই ৪ হাজারকেই দক্ষ জনশক্তিরূপে বের করে নিয়ে আসা সম্ভব।

ড. সৈয়দ আকতার হোসেন : ধন্যবাদ আমিনুল হাকিমকে। তিনি সিলেবাস সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান কথা বলেছেন। প্রথমে আমি বলতে চাই, মাস্টার্স প্রোগ্রামে সিলেবাস হয় বিশেষায়িত। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামকে কিন্তু কখনো আমরা কোনো বিষয়ে বিশেষায়িত করতে পারি না। কারণ, আমাদের উদ্দেশ্য থাকে একটা ছাত্রকে সব বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়া। বিশেষায়িত করতে গেলে হয়তো ক্রেডিট ১৪৭ বা ১৫০-এর মধ্যে রাখা সম্ভব হবে না। ১৯০ ক্রেডিটেও তাকে বিশেষায়িত করা যায় না। আর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম ১৯০ ক্রেডিট করলে সে প্রোগ্রাম অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে যাবে, যা আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বহন করতে পারবে না। সিলেবাসের ব্যাপারে আরেকটি কথা বলতে চাই। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ও অ্যাকাডেমির পক্ষে সিলেবাস রিভিউ করাটা একটা কঠিন ব্যাপার। ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারটা আমাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেই চিন্তা করতে হবে। যদি আমরা এরকম একটা কৌশলের কথা চিন্তা করি যে, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের সিলেবাসটা আমরা ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলোর ভিত্তিতে রিভিউ করব, তাহলে আমাদের ওই ৪ হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েটের সবাই দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বের হতো।

গোলাপ মুনীর : ধন্যবাদ আমিনুল হাকিমকে। আপনার আলোচনায় দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে। একটি হলো প্রবণতা এবং অপরটি সিলেবাস। প্রবণতার বিষয়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ধারণা হচ্ছে, আমাদের যারা আজকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, তাদের মানসিকতাটা এমন যে, তারা গ্রেডিংয়ের ব্যাপারটায় বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে পেশাগত শিক্ষার দিকে তাদের মনোযোগ কম। এর ফলে দক্ষতা বাড়ানোর ব্যাপারে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। দক্ষ আইসিটি গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছি না। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্বিতীয়টি সিলেবাসের ব্যাপার। এটা আপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। কারণ, আইসিটি সবচেয়ে শক্তিশালী একটি খাত। সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি খাত। অতএব, সেই পরিবর্তনের দিকটা মাথায় রেখে আমাদের সিলেবাসটা পরিবর্তনের ব্যাপারে অত্যন্ত মনোযোগ দিতে হবে। এই পরামর্শের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এবার বক্তব্য রাখার জন্য আমি অনুরোধ রাখছি বেসিসের মহাসচিব ফোরকান বিন কাশেমকে।

ফোরকান-বিন-কাশেম : ধন্যবাদ সবাইকে। বিশেষ করে কমপিউটার জগৎ-কে অনেক দিন পরে এ ধরনের একটি গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করার জন্য। কয়েকটা বিষয়ে বেশ কিছু বক্তব্য এখানে চলে এসেছে। আমরা গত ১০ বছর যাবৎ এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছি। একটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, উন্নয়ন কিন্তু হচ্ছে। যদিও স্টেকহোল্ডারদের আশানুরূপ নয় সেটা। স্টেকহোল্ডারদের কাজগুলোও অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে হচ্ছে না। আমার কাছে মনে হয়, সাংগঠনিক সক্ষমতা বা সাংগঠনিক স্থায়িত্বটা অনেক জরুরি। আমাদের যার যার কাজগুলো যদি একটা নির্দিষ্ট গঠনে না করি তাহলে সময়ের কাছ থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়বো।

সিলেবাস সম্পর্কে আমি বলবো, সিলেবাসে যা আছে তার বেশি কিছু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেয়ার মতো অবস্থা নেই। আমরা এখানে যারা কথা বলছি, তার শুধু কমপিউটার সায়েন্স নিয়ে কথা বলছি। এ বিষয়ে আমাদের একটা পরামর্শ এসেছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো আমাদের শনাক্ত করা দরকার। ডিসিপ্লিন অনুযায়ী আমাদেরকে প্রশিক্ষণ সুবিধা বা শিক্ষা সুবিধা দিতে হবে। আরেকটা বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরি। সেটা হচ্ছে, মধ্যম মানের কিংবা উচ্চ মানের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে বাংলাদেশের আইটি ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে না। এরা কিছু দিন দেশে থেকে কাজ করবে এবং তারপর বিদেশে চলে যাবে। আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে, আমরা কিভাবে বছরে ২০ হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করবো। ২০ হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েট মানেই ২০ হাজার কমপিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট নয়। আমাদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোকে এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করতে হবে। সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোর কথাও ভাবতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় টিচিং স্টাফ তৈরি করতে হবে। বুয়েট কিংবা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এদেশের আইটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

গত ২০ বছরে আইটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উল্লেখযোগ্য ধাপে পৌঁছে গেছে। প্রচুর পরিমাণে বিদেশী সফটওয়্যার ব্যবহার হচ্ছে। মাইক্রোসফট, ওরাকলের সফটওয়্যারগুলোর লাইসেন্স করা সংস্করণ-এ রকম আরো কিছু। এই অবস্থায় ওরাকল বা মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলোর সাথে আমাদের সমঝোতায় যাওয়া দরকার। তাদের লাইসেন্স করা সফটওয়্যারগুলো যাতে আমরা অল্প খরচে ব্যবহার করতে পারি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেখানে চীনে মাইক্রোসফট অফিসের একটি লাইসেন্স মাত্র ১ ডলারে পাওয়া যায়, সেখানে আমরা কেনো ২০ হাজার টাকা খরচ করব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, বর্তমান বিভিন্ন ভেন্ডর সার্টিফিকেশন যোগ্যতা যাচাইয়ের একটা মাপকাঠী হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজারো ধরনের সার্টিফিকেশন আছে। এক সিসকোর-ই আছে দশ ধরনের। সিসকো’র একটি সার্টিফিকেটের নাম সিসিআইই, যেটা পেলে পৃথিবীর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে চাকরি পাওয়া যাবে না। সেই সার্টিফিকেশনটি নিতে খরচ হয় ৭ লাখ টাকা। আমরা কি যেটাকে এক লাখ টাকায় নিয়ে আসতে পারি না? সুতরাং সব বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের সমঝোতা করতে হবে। আরেকটি ব্যাপার, বাংলাদেশে ক’জন আছে যারা আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে অবদান রাখছে? আমরা যারা এই সেক্টরের সাথে জড়িত তারা যদি মাইক্রোসফট, ওরাকল, সিসকো ইত্যাদি সকল বড় বড় কোম্পানিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারি তাহলে এসব দেখে তরুণ প্রজন্ম আইটি’র দিকে স্বাভাবিকভাবে ঝুকে পড়বে।

সম্প্রতি সরকারের প্রতি আমাদের একটা দাবি ছিল, আমাদেরকে প্রায় দশ লাখ বর্গফুটের একটা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক দিতে হবে। কালিয়াকৈরের হাইটেক পার্কে আমরা আর কিছু দিনের মধ্যে উঠে যেতে পারব। এরকম আরো ৫ থেকে ৬টি পার্ক ঢাকার ভেতরে বা ঢাকার আশেপাশে দরকার হবে। এ জিনিসগুলো দিতে সরকার ওয়াদাবদ্ধ। আমাকে দীর্ঘ বক্তৃতা দেয়ার সুযোগের জন্য ধন্যবাদ।

গোলাপ মুনীর : অনেক ধন্যবাদ। আপনার বক্তব্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ এসেছে। সেটা হচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের প্রশিক্ষণ সুবিধাগুলো বাড়ানো লাগবে। আরো পরামর্শ আছে যে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি যে বিভিন্ন সার্টিফিকেশন দেয় সেগুলোর খরচ কমিয়ে আনার জন্য একটা সমঝোতায় আসা দরকার। ধন্যবাদ আপনাকে এ সুপরামর্শের জন্য। এবার আমি বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ করছি বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব, এবং বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক মো: মাহফুজুর রহমানকে।

মো: মাহফুজুর রহমান : ধন্যবাদ সবাইকে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আজকে এই আলোচনার সূত্রপাত করা হয়েছে। আজকে সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একটি কথা আবারো ফিরে আসে, আইসিটি খাতে আমাদের গতি আছে, কিন্তু অগ্রগতি নেই। কারণ, আমাদের দক্ষ জনশক্তি বা জনবল নেই। গত জুলাই মাসে শিক্ষামন্ত্রীর আয়োজনে একটা বৈঠক হয়েছিল। সেখানে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের আলোচনার অনেক কিছুই এখানে ওঠে এসেছে। গত ৯৭ সাল থেকে বিগত ১৩ বছরে আমাদের দেশের স্কুলগুলোতে সিলেবাসের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই অবস্থা।

আমি যেখানেই সুযোগ পাই সেখানেই বলার চেষ্টা করি যে, অন্ততপক্ষে শিক্ষকমন্ডলীর কাছ থেকে আমরা পরিবর্তন চাই। সেই গন্ডি থেকে আমরা বের হয়ে আসতে চাই। আমাদের অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান কিন্তু আমরা নিজেরাও করতে পারি। প্রতি বছর আমরা ৪ হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েট বের করার চেষ্টা করছি। আমরা একটু কষ্ট করলে এই পরিমাণটা দ্বিগুণ বা তিনগুণও হতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সময় দিয়ে থাকেন, তার চেয়ে বেশি সময় দেন বাইরে। যদি ১টি ক্লাস সে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নেন, তাহলে ৩টি ক্লাস নেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা যদি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো কিছু বেশি সময় দেন, তাহলে হয়তো তারা ছেলেমেয়েদেরকে আরো কিছু বাস্তব জ্ঞান দিতে পারবেন। শিক্ষকমন্ডলীদের দুর্বলতাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং এই দুর্বলতাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই আমরা কিছুটা এগিয়ে যেতে পারব। একজন শিক্ষার্থীকে আমাদের এমনভাবে প্রস্ত্তত করতে হবে যাতে সে বিশ্ববাজারের উপযুক্ত হয়। যে দক্ষতা নিয়ে আজকে আলোচনা করা হচ্ছে, সেই দক্ষতার একটা মাত্রা থাকা উচিত যে কোন পর্যায়ের লোক আমরা বহন করব। সেজন্য একটা ব্যবস্থাপনা বা মতানৈক্য দরকার। ইন্ডাস্ট্রি এবং অ্যাকাডেমির মধ্যে একটা সমন্বয় দরকার। এক্ষেত্রে আমার মনে হয়, বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিল একটা উদ্যোগ নিতে পারে।

বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য, জনগণ সেবা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে আসবে না। বরং সরকার জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য তাদের দুয়ারে দুয়ারে যাবে। সেভাবেই কাজগুলো করা হচ্ছে। সরকারের অনেক উদ্যোগ এখনো একটা ছোট গন্ডির মধ্যে আছে। সেটার পরিধি আরো বাড়ানো দরকার। সম্প্রতি বাংলাদেশে ডিজিটাল উদ্বোধনী মেলা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করবো শিগগিরই বিভাগীয় পর্যায়ে এরকম আরো দুটি মেলার আয়োজন করা হবে। এ মেলার মাধ্যমে আমরা সবাইকে জানাতে পারব যে, সরকারের অনেক আরো বড় বড় উদ্যোগ দরকার। ইতোমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে ই-এশিয়া চালু হবে। সেই উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে আমরা কার্যক্রম শুরু করেছি। আরেকটি বিষয় আজকে এখানে উল্লেখ করা হলো, আমাদের চাহিদা তৈরি হচ্ছে দক্ষ জনবলের। কিন্তু সরবরাহ আসছে না সেভাবে। সম্প্রতি মাইক্রোসফটের সাথে আমাদের কথা হয়েছে যে, কীভাবে তারা তাদের সফটওয়্যারগুলো আমাদেরকে কম দামে দিতে পারে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই তাদের কাছ থেকে সাড়া পাব। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আইসিটি ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে যাদেরকে বেশি বেতন দিয়ে আমরা নিতে পারি না, তাদেরকে এ কোম্পানির মাধ্যমে নেয়া হবে। ইতোমধ্যে জনতা টাওয়ারকে সফটওয়্যার পার্ক হিসেবে গড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আর হাইটেক পার্কে একটি সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং ম্যানওয়্যারের সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে আমরা যতই স্থাপনা তৈরি করি না কেনো, কোনো কাজ হবে না। সবশেষে আমি বলব, কমপিউটার কাউন্সিল, অ্যাকাডেমি এবং ইন্ডাস্ট্রি এক সাথে কাজ করলে এর উপযুক্ত দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব হবে। সকলকে ধন্যবাদ।

গোলাপ মুনীর : ধন্যবাদ, বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালককে। আপনার বক্তব্যের শুরুতেই আমরা আপনার একটি গভীর অনুধাবনের কথা জানতে পেরেছি, গতি আছে, অগ্রগতি নেই। কারণ, দক্ষ জনশক্তি নেই। অত্যন্ত সময়োপযোগী এ অনুধাবন। এ অনুধাবনের ওপর ভিত্তি করে আপনি আমাদের জানিয়েছেন সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগের কথা। আমরা আশা করছি, এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে আমরা কিছু অগ্রগতি অর্জন করবো। ইতোমধ্যে আমাদের সম্মানিত আলোচকবৃন্দের বক্তব্য শেষ হয়েছে। এবার আমি আজকের আলোচনা থেকে উঠে আসা বিভিন্ন সুপারিশমালা এখানে তুলে ধরে আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের সমাপ্তি ঘোষণা করব।

সুপারিশমালা :

০১. ছাত্রছাত্রীদের অনার্স শেষ বর্ষের প্রকল্পগুলো বাস্তবমুখী করতে হবে।
০২. শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
০৩. অভিজ্ঞ জৈষ্ঠ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
০৪. আইটি গ্র্যাজুয়েট বছরে ১০ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
০৫. বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য ছেলেমেয়েদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে এ ব্যাপারে।
০৬. স্কুলে স্কুলে ই-লার্নিং টুলস, ইন্টারনেট ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে।
০৭. প্রতিটি কলেজে কমপিউটার বিজ্ঞান খুলতে হবে।
০৮. চাকরিতে ঢোকার পর একটা ছাত্রের প্রশিক্ষণ অবস্থার ৮০ শতাংশ খরচ সরকারকে বহন করতে হবে।
০৯. বিজ্ঞান সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সচেতন করতে হবে।
১০. মফস্বল থেকে আসা সাধারণ ছেলেদের, মেধাবী ছেলেদের কাজে লাগাতে হবে।
১১. ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে ভেন্ডরভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি তৈরি করতে হবে।
১২. ফিনিশিং স্কুলিং এডুকেশন সিস্টেম চালু করতে হবে।
১৩. কমিপউটার সায়েন্সের সিলেবাস হালনাগাদ করতে হবে।
১৪. ছাত্রছাত্রীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে থেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
১৫. ছাত্রছাত্রীদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।
১৬. প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো শনাক্ত করতে হবে।
১৭. বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আইটি ইনস্টিটিউট তৈরি করতে হবে।
১৮. একটা ছাত্রের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য ইনস্টিটিউট তৈরি করতে হবে।
১৯. শিক্ষকমন্ডলীকে দুর্বলতাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
২০. হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও ম্যানওয়্যারের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
২১. কমপিউটার কাউন্সিল, ইন্ডাস্ট্রি এবং অ্যাকাডেমিকে একত্রিত হয়ে একটি দিক নির্দেশনা তৈরি করতে হবে।

কজ ওয়েব

ফিডব্যাক : rabbi1982@yahoo.com ,
rezatheboss@yahoo.com
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস