Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ২০১২
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: ইমদাদুল হক
মোট লেখা:৫৮
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৩ - জানুয়ারী
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
কারিগরী দিক
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ২০১২

কালের গর্ভে হারিয়ে গেল ঘটনাবহুল আরও একটি বছর। প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং নেটওয়ার্ক ইউটিউব বন্ধের মধ্য দিয়েই ২০১৩ সালে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিদায়ী বছরে দেশের ৪ হাজার ৫৩৮ ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। আখ চাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ই-পুর্জি, দেশের ডাকঘরগুলোতে ইলেকট্রনিক ও মোবাইল মানি অর্ডার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক ও জুনিয়র শিক্ষা সমাপনী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ফল ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস তথা বিসিএস পরীক্ষার এনরোলমেন্টও হচ্ছে অনলাইনে। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলার তথ্য বাতায়ন (ওয়েবসাইট), দেশের ১ হাজার ১০০ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি, প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ই-বুক, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে (এম-হেলথ) স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি চালু, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ই-টেন্ডারিং চালু, সফটওয়্যার রফতানিতে প্রবৃদ্ধি এবং অনলাইনে কৃষিতথ্য সেবাদানে সক্ষমতা অর্জন করেছে দেশ।

অপরদিকে অনেক ডামাডোলের পরও নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ার অপূর্ণতা থাকলেও টানেলের শেষ প্রান্তের আলোর প্রত্যাশায় বুক বেঁধে চলছে আমাদের পথচলা। কেননা, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হলেও অবশেষে সীমিত আকারে তৃতীয় প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবার সাক্ষাৎ পেয়েছি আমরা। তবে গেল বছরের মার্চে চালুর সুযোগ এলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি বাংলা ডোমেইন।

এমন নানা অর্জন-বিসর্জনের মধ্য দিয়েই নতুন বছরের ৬ জানুয়ারি পূর্ণ হয় সরকারের চার বছর। স্বাভাবিকভাবেই দিন বদলের সেস্নাগানে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রত্যয় বাস্তবায়নে আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টি এখন মুখে মুখে। বছরজুড়ে প্রত্যাশা ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে সরকার তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে।

সেই লক্ষক্ষ্য বাজেটে আইসিটি খাতে পৃথক বরাদ্দ, প্রযুক্তিপণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক হ্রাস, আইসিটি নীতিমালা চূড়ান্তকরণ, হাইটেক পার্ক, ই-গভর্ন্যান্স, সর্বস্তরে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক চালু, শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা চালুর বিষয়গুলোতে পদক্ষিপ ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু এই খাতগুলোতে দীর্ঘ চার বছরেও অগ্রগতি ছিল শ্লথ।

তবে ব্যক্তি উদ্যোগের সফলতা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশের ভাবমর্যাদা প্রচারে এই সময় সবচেয়ে বেশি সরব দেখা গেছে। বছর শেষে এ নিয়ে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামে তিন দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হয়েছে।

বছরজুড়ে নানা সংস্থার আয়োজনে দেশময় এমন প্রযুক্তি মেলার অভাব ছিল না ঠিকই। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর শুরু হয় মেলা দিয়ে। আবার মেলার মধ্য দিয়েই বিদায় নেয় ২০১২। তবে এসব মেলায় নতুন পণ্য প্রদর্শনের ঘাটতি যেমন চোখে পড়েছে, একইভাবে এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিরাজমান মন্দাবস্থা এবং এই খাতের ব্যবসায়ীদের হতাশার কথা খোলামেলা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গতি আনতে চলতি বছরের গোড়ার দিকে মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাস করা হলেও শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি বছরের বিভিন্ন সময় আলোচিত ভ্যাস তথা ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস নীতিমালা। অবশ্য বিগত দুই বছরের মতো বিদায়ী বছরেও সরকারের ওয়েব পোর্টাল তৈরির নানা উদ্যোগ চোখে পড়েছে। কিন্তু খোদ ডিজিটাল বাংলাদেশ নামের ওয়েবসাইটের স্থানে ওয়েবসাইটের হোম পেজ ফরম্যাটের একটি ইমেজ আপলোড করে রাখার ঘটনায় এ খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। সরকারের চার বছরের মেয়াদে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের বৈঠক হয়েছে মাত্র একটি। আর মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাসের পর বছর গড়িয়ে গেলেও একটি বৈঠকও হয়নি। বলতে গেলে তিন দফা মন্ত্রী বদল ও দীর্ঘ শূন্যতায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা তাই আশানুরূপ এগোতে পারেনি।

তথ্যপ্রযুক্তিতে সবচেয়ে সফল ফ্রিল্যান্সিং

সদ্য বিদায় নেয়া ২০১২ সালে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতটা না চোখে পড়েছে, তারচেয়ে ঢের বেশি নজরে এসেছে ব্যক্তি উদ্যোগে সফল আউটসোর্সিংয়ের বিষয়। বিসিএস ওয়ার্ল্ড, ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ছাড়াও বছরজুড়ে প্রায় হাফ ডজন সম্মেলন এবং এক ডজন সেমিনার হয়েছে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে। এসব সেমিনার ও সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন বিশ্ব প্রযুক্তির অনেক বরেণ্য ব্যক্তি।

গত বছর বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে অনলাইন মার্কেটপ্লেস হিসেবে পরিচিত ইল্যান্স। বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং সাইটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর ঘটনা এটাই প্রথম। বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয় ইল্যান্স। ফ্রিল্যান্সিং কাজের ক্ষেত্রে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইল্যান্সে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ইল্যান্সের তথ্যানুযায়ী, সাইটটিতে ২৮ হাজারের বেশি বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সার কাজ করেন। ৪ ডিসেম্বর বেসিস অডিটরিয়ামে বাংলাদেশে ইল্যান্সের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানটির ইউরোপীয় শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেটলি জে ওলসেন। ইল্যান্স ছাড়াও বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফ্রিল্যান্সার ডট কম বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধার্থে তাদের ওয়েবসাইটটির একটি বাংলাদেশী সংস্করণ চালু করে।

প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের তরুণদের আগ্রহ দেখে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বছরের শেষ মাসে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্মেলনে যোগ দেয়া জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ওডেস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট কুপার, ফ্রিল্যান্সারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড হ্যারিসন, ইল্যান্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেটলি ওলসেন এবং ৯৯ ডিজাইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেসন সেউ। তারা বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হন এবং আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।

অবশ্য এর আগেই নিজেদের প্রচেষ্টায় অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিশ্বে আউটসোর্সিংয়ে তৃতীয় অবস্থানে জায়গা করে নেন দেশের তরুণ ফ্রিল্যান্সারেরা। বিশ্বে অনলাইনে কাজের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। সে হিসাবে দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য চলতি বছরটিকে সোনালি বছর হিসেবে অভিহিত করলে অত্যুক্তি হবে না।

গেল বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ছিল বেসিস আয়োজিত সফটওয়্যার মেলা। এই মেলায় ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে ছিল বিশেষ আয়োজন। মার্চের শুরুতেই ফ্রিল্যান্সারদের সুখকর বার্তা নিয়ে আসে অনলাইনে অর্থ লেনদেন প্রতিষ্ঠান অ্যালার্টপে। তবে বছরজুড়ে বাংলাদেশে পেপ্যাল কার্যক্রম শুরুর গুজব থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। ফ্রিল্যান্সারের লোগো এক্সপোজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১০ হাজার ডলার জিতে নেন রাজশাহীর শাওন। গত মে মাসে ‘কন্ট্রাক্টর অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে’ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ওডেস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসেন। তবে বছরজুড়ে আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণার ঘটনাও কম ছিল না। ডুল্যান্সার, ক্লিক-ক্লিক, ইউনিপেটুইউসহ শতাধিক কোম্পানি প্রতারণা করে তরুণদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

এসব প্রতারণার ফাঁদে পা না দিয়ে ফেলে আসা বছরের জুলাই মাসে ফ্রিল্যান্সার আয়োজিত ‘কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ প্রতিযোগিতায় সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে তরুণদের ইন্টারনেট মার্কেটিং সার্ভিস দিতে গঠিত ডেভসটিম। আল আমিন কবিরের নেতৃত্বে গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় আউটসোর্সিংয়ে প্রসিদ্ধ এমন অনেক দেশের ফ্রিল্যান্সারদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন এই প্রতিষ্ঠানের পাঁচ তরুণ। বছরের শেষ প্রান্তে এসে গত ১১ নভেম্বর প্রযুক্তি নিয়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া এমন ১১ জনকে বিশেষ সম্মাননা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রেও বছরটিকে সফল বলা যায়। সমসাময়িক নানা ইস্যুতে বস্নগে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা ছিল চোখে পড়ার মতো। গত মে মাসে জনপ্রিয় ১০টি ভাষার বস্নগারদের হারিয়ে ডয়েচে ভেলে আয়োজিত ‘ইইএম-২০১২’ শীর্ষক জুরি অ্যাওয়ার্ড জেতেন অচলায়তনের বলয় ভাঙার প্রত্যয়ে ব্লগে লেখালেখি শুরু করা সংবাদকর্মী আবু সুফিয়ান।

তবে বিশ্বের শীর্ষ সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু কামনা করায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের দ- দেয়ার ঘটনাটিও ছিল আলোচিত। আউটসোর্সিং এবং বস্নগিংয়ের বাইরে মেধাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন তরুণেরা। সেপ্টেম্বরে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জ জেতে বাংলাদেশ। ধনঞ্জয় বিশ্বাস ও বৃষ্টি শিকদার যৌথভাবে এই সাফল্য অর্জন করেন। এর আগে গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্য জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন ধনঞ্জয়।

ইউটিউব বিচ্ছিন্ন থেকেই নতুন বছর শুরু

চলতি বছর তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত ছিল গুগলের ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব বন্ধের ঘটনা। ইউটিউব থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদকে (সা:) কটাক্ষ করে নির্মিত মার্কিন চলচ্চিত্র না সরানোয় গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন তথা বিটিআরসি দেশে গুগলের ভিডিও সেবা ইউটিউব বন্ধ করে দেয়। অবশ্য এর আগে প্রথমে সংশ্লিষ্ট লিঙ্ক বস্নক করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। সরকারের নির্দেশে বিটিআরসি প্রথমে চিঠি দিয়ে চলচ্চিত্রটি সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানায়। এতে কাজ না হওয়ায় ইউটিউব এখনও দেশে বন্ধ রয়েছে। গুগলের অসহযোগিতার কারণেই এমন কঠিন পথে হাঁটতে হচ্ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস। ভারতে বিদ্রূপাত্মক ওই ছবিটি সরিয়ে ফেলা হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন বিমাতাসুলভ আচরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।

দেশে গুগলের কার্যক্রম শুরু

বিটিআরসির আবেদন আমলে না নিলেও গত নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে ইউটিউব বিষয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গুগল। চূড়ান্ত করেছে গুগল স্ট্রিট ভিউ প্রকল্প। এর মাধ্যমেই ভারতের পর দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সরাসরি কার্যক্রম শুরু করে সার্চ ইঞ্জিনখ্যাত গুগল। গুগলে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছেন গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশন অফিসার কাজী মনিরুল কবির। গত ৫ নভেম্বর বাংলাদেশের কান্ট্রি কনসালট্যান্ট পদে গুগলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন তিনি।

তবে বিদায়ী বছরে ঢাকায় অফিস স্থাপন করেনি গুগল। আপাতত গুগলের সিঙ্গাপুর অফিস থেকেই বাংলাদেশের সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে দ্রম্নতগতিতে বাড়তে থাকা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিয়ে গুগল খুবই আশাবাদী বলে জানা গেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৪৯টি দেশে গুগল তার কার্যালয় পরিচালনা করছে। এসব দেশে গুগল বিভিন্ন বাণিজ্যিক সেবা দেয়ার পাশাপাশি নিজস্ব মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম (অ্যান্ড্রয়িড), স্মার্টফোন-সম্পর্কিত বিভিন্ন সেবা সরাসরি দিয়ে থাকে।

টেলিটকে থ্রিজি চালু

বিশ্ব যখন চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক নিয়ে সরব তখনও বাংলাদেশে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক চালু নিয়ে ২০১২ ছিল নাটকীয়তায় ভরা। নানা জল্পনার পর গত ১৪ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মুঠোফোন অপারেটর টেলিটকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় থ্রিজি। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতি জিলস্নুর রহমানের সাথে ভিডিও কল করে থ্রিজি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক বাণিজ্যিক সেবার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। থ্রিজি সিমের মূল্য ৯শ’ টাকা নির্ধারণ কর হয়। থ্রিজি চালুর মাধ্যমে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে উন্মোচিত হয়েছে নতুন দিকের, জেগেছে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু টেলিটকের সীমিত নেটওয়ার্কের কারণে বাণিজ্যিকভাবে সফলতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি অপারেটরদের দিকে তাকিয়ে আছে তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু জুনে গ্রামীণফোনের থ্রিজি আবেদন নাকচ করে দেয় বিটিআরসি।

গ্রামীণফোন চার ও রবি দুই কোটির মাইলফলকে

জুলাই মাসে গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যা চার কোটি পেরিয়ে যায়। আর ২ সেপ্টেম্বর তৃতীয় গ্রাহকসেরা অপারেটর রবি পেরিয়েছে দুই কোটি গ্রাহকের মাইলফলক। এর আগে বাংলালিংকও একই ল্যান্ডমার্ক টপকে যায়। তবে পরের তিনটি অপারেটর এতটাই পেছনে রয়েছে যে তাদের কারই সহসা দুই কোটির ল্যান্ডমার্ক টপকানোর সম্ভাবনা কম। বছরের মার্চে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা নয় কোটি পেরিয়ে যায়।

বছরের শেষে কমেছে মোবাইল সিম বিক্রি

সেপ্টেম্বরে এক মাসেই দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী বেড়েছে ২৯ লাখ ৩৮ হাজার। ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে সংরক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে একবার ২০ লাখ ২৪ হাজার গ্রাহক বেড়েছিল। এদিকে অক্টোবর থেকে প্রি-অ্যাক্টিভ সিম বিক্রি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণায় সেপ্টেম্বরে অনেক বেশি সিম বিক্রি হয়। আবার একই কারণে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে গ্রাহক সংখ্যা কমতে থাকে। এই দুই মাসে ১০ লাখের বেশি গ্রাহক মোট সংখ্যা থেকে কমে যায়।

১৮শ’ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম পুনর্বিন্যাস

গত বছরে টেলিটক ও সিটিসেল ছাড়া বাকি চার মোবাইল ফোন অপারেটরের ১৮শ’ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম পুনর্বিন্যাস করেছে বিটিআরসি। এর আগে অপারেটরগুলোর স্পেকট্রাম ছিল বিক্ষিপ্ত। গুছিয়ে আনায় বিটিআরসি উল্টো আরো ১৫ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম পেয়ে যায়। বাজার মূল্যে যা দুই হাজার কোটি টাকার সমান। একই কারণে অপারেটরগুলোর খরচও কমে আসে। ৩ মে রাতে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি করে বিটিআরসি। বছরের ফেব্রম্নয়ারি মাসে সাবমেরিন ক্যাবলের পাশাপাশি ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবলে (আইটিসি) সংযুক্ত হওয়ার লাইসেন্স বা অনুমতি দেয় বিটিআরসি।

ভূরি ভূরি গেটওয়ে লাইসেন্স

আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ), আমত্মঃসংযোগ এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) এবং ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) মিলে বিদায়ী বছরে ৮২টি নতুন লাইসেন্স দিয়েছে বিটিআরসি। আবেদন মূল্যায়ন, লাইসেন্সের সংখ্যা নির্ধারণ নিয়ে বিটিআরসির সাথে মন্ত্রণালয় এবং সংসদীয় কমিটির মধ্যে টানাপড়েন ছিল চোখে পড়ার মতো। বছরের শুরুতে একসাথে দেয়া হয় ছয়টি আইটিসি লাইসেন্স। ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল সার্ভিস উন্মুক্ত করার জন্যও লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেখানে আবেদন জমা পড়ে ১,৫০৬টি।

দায়বদ্ধতা তহবিল

শুধু টেলিযোগাযোগ কেনো, যেকোনো খাতে দেশে এই প্রথমবারের মতো ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠিত হয়েছে। টুজি লাইসেন্স নবায়নের নীতিমালায় বিষয়টি যুক্ত করে বিটিআরসি। প্রত্যেক অপারেটর তাদের মোট আয়ের এক শতাংশ এই তহবিলে জমা করে। তবে তহবিল খরচের বিধিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। জানা গেছে, তহবিল খরচ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে পড়াদের জন্য প্রশিক্ষণসহ টেলিযোগাযোগে গবেষণা করা হবে। মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা পড়েছে ১১৭ কোটি টাকা।

১০ সেকেন্ড পালস

দফায় দফায় চিঠি চালাচালি ও কারণ দর্শানো নোটিসের পর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে টেলিকম অপারেটরগুলোকে ১০ সেকেন্ড পালস বাস্তবায়নে বাধ্য করে বিটিআরসি। তবে বেঁধে দেয়া ১৫ আগস্টের সময়সীমায় প্রথমে ১০ সেকেন্ড পালস সুবিধা চালু করে টেলিটক। অপরদিকে নির্দিষ্ট সময় এটি বাস্তবায়ন করতে না পারায় পরে গ্রাহকদের বাড়তি পয়সা ফেরত দেয় গ্রামীণফোন। ১০ সেকেন্ড পালস বাস্তবায়ন বিষয়ে টেকনিক্যাল অডিট করার ঘোষণাও দেয় বিটিআরসি।

রিম থেকে সিমে সিটিসেল

দেশের সবচেয়ে পুরনো মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেল জিএসএম (গ্লেবাল সিস্টেম ফর মোবাইল) প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। বর্তমানে এরা কোড ডিভিশন মাল্টিপল অ্যাকসেস (সিডিএমএ) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আগস্টেই তাদের বিষয়ে এক কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। তবে এক্ষেত্রে বকেয়া পরিশোধের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে সিটিসেলের গ্রাহকেরাও ইচ্ছামাফিক হ্যান্ডসেট বদল করতে পারবেন চলতি বছরে।

মৃত্যুর পরও বকেয়া বিল মাফ নয়!

বছরের পর বছর সরকারের কাছ থেকে টেলিফোন বিল ঠিকই নিয়েছেন। কিন্তু এমপি থাকাকালে নিজের টেলিফোনের বিল পরিশোধ করেননি। একেকজন দশ-বারো লাখ টাকার টেলিবিলও বাকি ফেলেছেন। এক পর্যায়ে বকেয়া রেখে মারা যাওয়া এমপিদের টেলিফোন বিল মাফ করেও দিচ্ছিল সরকার। কিন্তু এখন সেই অবস্থান থেকে সরে আসছে। মারা গেলেও আর মাফ করা হবে না। বর্তমানে একজন এমপি টেলিফোন বিল হিসেবে মাসে ৭ হাজার ৮০০ টাকা পান। এর আগে অষ্টম সংসদে পেয়েছেন ৬ হাজার টাকা। তার আগে সপ্তম সংসদে পেতেন সাড়ে ৪ হাজার টাকা।

বিক্ষক্ষাভ : রিচার্জ ধর্মঘট

প্রথমবারের মতো মোবাইল ফোনের রিচার্জেও ধর্মঘট দেখেছে দেশ। কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ১৮ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিন ধর্মঘট করে এরা। প্রতি রিচার্জে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিশন বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখে এরা।

রবির অফিস ঘেরাও

প্রথমবারের মতো কোনো মোবাইল ফোনের অফিস ঘেরাও করার ঘটনা দেখেছে দেশ। এক কর্মকর্তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ৬ অক্টোবর গুলশানে রবির প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে মোবাইল ফোন রিচার্জ অ্যাসোসিয়েশন।

গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে মামলা

কর্মী ছাঁটাই, একজনের নিবন্ধিত সিম আরেকজনকে দিয়ে দেয়াসহ কয়েকটি বিষয়ে গেল বছরে একাধিক মামলায় জড়িয়েছে গ্রামীণফোন। কর্মী ছাঁটাইয়ে আগস্ট মাসে গ্রামীণফোনেরই দুই কর্মী তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে আদালত সমনও জারি করেন। আগাম জামিন নেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী টরে ইয়েনসেন। অন্যদিকে বছরের শুরুতে একজনের নিবন্ধিত সিম অন্যজনকে দেয়ার অভিযোগে গ্রামীণফোন বোর্ডের চেয়ারম্যান সেগিভ ব্রেকিসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নতুনপাড়া আশুলিয়ার ব্যবসায়ী ঋত্বিক পান্না।

কথার ওপর ট্যাক্স ‘না’

ফেলে আসা বছরে বাজেটে প্রস্তাব এসেছিল মোবাইল ফোনের ব্যবহারের ওপর দুই শতাংশ উৎসে কর প্রবর্তনের। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এই খাত থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকারের ছয়শ’ কোটি টাকা আয়ের হিসাবও করা হয়। কিন্তু পরে মোবাইল অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট মহলের চাপে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার।

ভোক্তা পর্যায়ে কমেনি ব্যান্ডউইডথের দাম

আট বছর আগে ২০০৪ সালে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়। পি১ প্যাকেজের মাধ্যমে গ্রামীণফোন সেবাটি শুরু করে। তখন সেকেন্ডে প্রতি মেগাবাইট (এমবিপিএস) ব্যান্ডউইডথের দাম ছিল ৭২ হাজার টাকা। ২০১২ সালে এসে তা কমে হয়েছে মাত্র ৮ হাজার টাকা। এ হিসেবে আট বছরের ব্যবধানে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের দাম কমেছে প্রায় ৮৯ শতাংশ। তবে কমেনি মোবাইল ইন্টারনেট সেবার চার্জ। এখনো প্রায় আগের দামে সেবাটি নিতে হচ্ছে সেলফোন গ্রাহকদের। গ্রাহক পর্যায়ে দেশের সেলফোনে ইন্টারনেট সেবা প্রথম চালু হয় ২০০৪ সালে। তখন পি১ প্যাকেজে একজন গ্রাহক যে পরিমাণ ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করেন, তাকে সে পরিমাণ বিল পরিশোধ করতে হতো। অর্থাৎ এটি গ্রাহকের ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। ২০০৪ সালে পি১ প্যাকেজের আওতায় প্রতি কিলোবাইট ইন্টারনেট ব্যবহারে গ্রাহককে ব্যয় করতে হতো দুই পয়সা। ২০০৭ সালে ব্যান্ডউইডথের দাম কমিয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হয়। এরপর দাম আরও কমিয়ে ২০০৮ সালে ১৮ হাজার, ২০০৯ সালে ১২ হাজার, ২০১১ সালে ১০ হাজার এবং সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত আট বছরে পাঁচ দফায় ব্যান্ডউইডথের দাম ৬৪ হাজার টাকা কমানো হলেও পি১ প্যাকেজে গ্রাহককে এখনো কিলোবাইটপ্রতি সেই দুই পয়সা করে দিতে হচ্ছে। এদিকে পি৬ প্যাকেজে এক গিগাবাইট ডাটা ব্যবহারের জন্য গ্রাহককে যেখানে ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে, সেখানে একই পরিমাণ ডাটা ব্যবহারে পি১-এর গ্রাহককে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে এক দিন থেকে এক মাস সময়ের বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে অপারেটরদের। তবে এ ক্ষেত্রে অব্যবহৃত ডাটা পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহকেরা।

দেশে নতুন প্রযুক্তিপণ্য

এ বছর দেশের বাজারে নতুন নতুন অনেক প্রযুক্তিপণ্যের প্রাচুর্য দেখা গেছে। এ বছর দেশের তরুণদের আগ্রহ ছিল স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট কমপিউটারে। এ বছর বাজারে এসেছে স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি সিরিজের নতুন স্মার্টফোন। পণ্য সারিতে যুক্ত হয়েছে ফুজিৎসু, ডেল, তোশিবা, প্রোলিংক, এইচপি ও লেনোভোর নতুন মডেলের ল্যাপটপ। ট্যাবলেটের বাজারেও অ্যান্ড্রয়িডনির্ভর অনেক ট্যাবলেটের প্রতি ঝুঁকেছেন প্রযুক্তিপ্রেমীরা। তবে মুঠোফোনের বাজারে সবচেয়ে এগিয়ে গেছে সিম্ফনি ব্র্যান্ড। বাজারে অবস্থান তৈরিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে ম্যাক্সিমাস। রিমের পাশাপাশি সিম সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে সিটিসেল। প্রসূতি ও মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মোবাইল ফোনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ‘আপনজন’ চালু হয়েছে।

ল্যাপটপ বিক্রি বেড়েছে

বছরজুড়ে বাজার মন্দা থাকলেও বিদায়ী বছরে ডেস্কটপ পিসি বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ। অপরদিকে ল্যাপটপ বিক্রি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ। ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল ডেস্কটপ পিসি প্রায় তিন লাখ এবং ল্যাপটপ প্রায় এক লাখ। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী বিদায়ী বছরে ডেস্কটপ পিসির চেয়ে ল্যাপটপের কাটতি ছিল বেশি। একইভাবে ভোক্তা পর্যায়ে বেড়েছে প্রিন্টার ও স্ক্যানারের ব্যবহার। এদের মধ্যে বিদায়ী বছরে লেজার প্রিন্টার বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার এবং ইঙ্কজেট প্রিন্টার প্রায় ৬৫ হাজার। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল লেজার প্রায় ৪৫ হাজার এবং ইঙ্কজেট প্রায় ৮০ হাজার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিদায়ী বছরে বিক্রি কমেছে ইঙ্কজেড প্রিন্টারের। অপরদিকে ২০১২ সালে প্রায় ৪০ হাজার স্ক্যানার বিক্রি হয়েছে। ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ হাজার।

সম্ভাবনাময় ই-কমার্স

বছরের ২৭ ডিসেম্বর ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করায় ই-কমার্স ক্ষেত্রে খুলে গেছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বছরের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে শুরু করে অনলাইনে কেনাকাটা। একের পর এক তৈরি হতে থাকে অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় সেবাভিত্তিক ওয়েবসাইট। এগুলোর মধ্যে এখনই ডটকম, রকমারি, আমার দেশ আমার গ্রাম বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। বস্ত্তত বাংলাদেশে এ বছর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে ই-কমার্সভিত্তিক ওয়েবসাইট। এ বছরে সুইডেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বিক্রয় ডট কম এবং সামগ্রী ছাড়াও বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য বেচাকেনার ডজনখানেক নতুন প্লাটফর্ম চালু হয়। আর এসব প্লাটফর্মকে একটি প্লাটফর্মে এনে সমন্বিত উন্নয়ন ঘটাতে ২০১৩ সালের ৭ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় ‘ই-বাণিজ্য’ মেলার ঘোষণা দেয় কমপিউটার জগৎ।

সাইবারযুদ্ধে বাংলাদেশ

বছরজুড়েই মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সাইবারযুদ্ধ চালিয়ে গেছে বাংলাদেশের হ্যাকারেরা। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা এবং মিয়ানমারে মুসলিম হত্যার প্রতিবাদে উভয় দেশের সাথে হ্যাকিংযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় বাংলাদেশের হ্যাকারেরা।

বাংলাদেশের কয়েকটি সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট ভারতীয় হ্যাকারদের আক্রমণের পর ভারতীয় ওয়েবসাইটে পাল্টা হ্যাকিং এবং বছরের শেষ ভাগে মিয়ানমারের হ্যাকারদের আক্রমণে বছরজুড়েই উত্তাল ছিল দেশের ভার্চুয়াল জগৎ। পাশাপাশি বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন তথা আইটিইউ ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের খবর ছড়িয়ে দিলে ইন্টারনেটবিশ্ব নাগরিক হিসেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশের নেটিজেনরা। তবে সব জল্পনা-কল্পনা মুছে দিয়ে ইন্টারনেট পরিচালনায় আগামী ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রচলিত পদ্ধতি অব্যাহত থাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা।

দেশ থেকে সাইবারযুদ্ধের এই দামামায় নেতৃত্ব দিয়েছে ‘বাংলাদেশ বস্ন্যাক হ্যাট হ্যাকারস’ নামে একটি হ্যাকার গ্রম্নপ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের এ সাইবারযুদ্ধের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দিয়েই প্রচার করা শুরু করেছিল। ৯ ফেব্রম্নয়ারি থেকে পরবর্তী ১০ দিনে ঘটে যাওয়া পাল্টাপাল্টি এ যুদ্ধ বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ভারতের ‘ইন্ডিশেল’ নামের একটি হ্যাকার গ্রম্নপ বাংলাদেশের সরকারি সংস্থার কয়েকটি ওয়েবসাইট হ্যাক করার পর শুরু হয়েছিল এ সাইবারযুদ্ধের। এরপর মাঠে নামে ‘বস্ন্যাক হ্যাট হ্যাকারস’। তাদের সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘থ্রিএক্সপায়ারথ্রি সাইবার আর্মি’ ও ‘বাংলাদেশ সাইবার আর্মি’ নামে আরও দুটি দল। তবে এ সময় দেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা ত্রম্নটি ছিল হাস্যকর পর্যায়ের। র‌্যাব, পুলিশ, বিসিএস এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটসহ ডজনখানেক সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হয়েছে বিভিন্ন সময়।

ব্যক্তিগত অর্জন

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণও বিগত বছরের তুলনায় গত বছর বেড়েছে। এর মধ্যে তথ্য অধিকার নিয়ে সরব বিশ্ব প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি সার্ভিসেস অ্যালায়েন্সের (উইটসা) পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন এসএম ইকবাল। কানাডার মন্ট্রিলে গত ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত উইটসার নির্বাচনে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। তবে এরচেয়েও বড় সুখবর বয়ে আনেন দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনের পরিচিত মুখ আবদুল্লাহ এইচ কাফী। এশিয়া-ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন অ্যাসোসিওর ২০১৩-১৪ মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এই তালিকায় যোগ হয়েছে বেসিসের সাবেক সহসভাপতি টিআইএম নুরুল কবীরের নামটিও। তিনি ডোমেইন নিবন্ধন অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান ডট অর্গ (.org)-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণকারী এই প্রভাবশালী সংস্থার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এবারই প্রথম ঢাকা চেম্বারের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ী সবুর খান।

বিসিসির ১৩ কোটি ইউএস ডলারের প্রকল্প ন্যাশনাল আইসিটি ইনফ্রা নেটওয়ার্ক দ্বিতীয় পর্বের প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষরিত


গত বছর বাংলাদেশ সরকারের জন্য দ্বিতীয় পর্বের জাতীয় আইসিটি ইনফ্রা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিল এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক যুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। উল্লেখ্য দেশের সব মন্ত্রণালয়, দফতর ও অধিদফতরকে আইসিটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করার জন্য ইতোপূর্ব এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ কাজের জন্য ২০ কোটি ডলারের মতো খরচ হবে ধারণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার এই প্রকল্প অর্থায়নের জন্য দাতা সংস্থাদের কাছ থেকে অর্থায়নের জন্য অনুরোধ করে। এতে দক্ষিণ কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ৩ কোটি ডলার দিতে রাজি হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে স্বল্প পরিসরে এই প্রকল্পের প্রথম পর্বে কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে। পরে ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ ক্রয় কমিটি প্রথম পর্বের দরপ্রস্তাব অনুমোদন দেয়। আশা করা যায়, উভয় প্রকল্প ডিসেম্বর ২০১৩-এর মধ্যে বাস্তবায়িত হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে একটি বড় সাফল্য অর্জিত হবে।

সম্পূর্ণ কাজ করার জন্য আবার দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তা চাওয়া হয়। এতে চীন সরকার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং প্রাথমিক জরিপে ১৩ কোটি ইউএস ডলার সমপরিমাণ সহায়তার প্রতিশ্রম্নতি পাওয়া যায়।

এই প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত নেটওয়ার্ক সব উপজেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। বাংলাদেশ সরকার রূপকল্প ২০২১ : ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সব সরকারি দফতর নেটওয়ার্কের আওতায় এনে ই-গভর্ন্যান্স চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিল তথা বিসিসি চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় ‘Development of National ICT-Infra Network for Bangladesh Government Phase II. (Infosarker)’ শীর্ষক প্রকল্পটি জি২জি প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য চীন সরকার থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রম্নতি পাওয়া গেছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বিটিসিএলের বিদ্যমান টেলিকমিউনিকেশন অবকাঠামো ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে। দেশের সব জেলা থেকে আওতাধীন উপজেলা পর্যন্ত এবং বিভাগীয় শহরে বিদ্যমান সব সরকারি দফতরে প্রতিটি সংযোগের ক্ষেত্রে বিটিসিএলের সার্ভিস ব্যবহার করা হবে।

স্থলপথে ইন্টারনেট

বিদায়ী বছরে স্থলপথে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশে। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের। এর আগে টেলিযোগাযোগ সেবা শুধু আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমেই বিশ্বের সাথে সংযুক্ত ছিল। ফলে সিমিউই ৪-এ কোনো সমস্যা দেখা দিলেই সমস্যায় পড়ত দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল তথা আইটিসির সাথে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে গত বছরের আগস্ট থেকে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে দ্বিতীয় ইন্টারনেট ব্যাকআপ সংযোগ। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে চালু হয়েছে এ ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা। আইটিসি প্রতিষ্ঠান ওয়ান এশিয়া কমিউনিকেশন ও অ্যালায়েন্স হোল্ডিংস লিমিটেড বাংলাদেশে যৌথভাবে এ সংযোগ চালু করে। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতের প্রতিষ্ঠান টাটার সাথে ক্যাবল সংযোগের কাজ শেষ হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে এসটিএম-৬৪ পয়েন্ট। ফলে অচিরেই আইটিসির মাধ্যমে নির্বিঘ্নভাবে ভয়েস, ভিডিও এবং তথ্যসেবা পাওয়া যাবে। আইটিসির মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ১০ গিগাবাইট তথ্য স্থানান্তর করার মতো গতি পাওয়া যাবে।

প্রসঙ্গত, বছরের ফেব্রম্নয়ারি মাসে সাবমেরিন ক্যাবলের পাশাপাশি ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবলে (আইটিসি) সংযুক্ত হওয়ার লাইসেন্স বা অনুমতি দেয় বিটিআরসি। আর দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সংযোগ পেতে সিমিউই ৫-এর সাথে জানুয়ারি মাসেই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে রাষ্ট্রায়ত্ত সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড তথা বিএসসিসিএল। এ বিষয়ে ১৫টি কোম্পানি সিমিউই ৫-এর সাথে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। ২০১৪ সালে সিমিউই ৫-এর মাধ্যমে ১৭শ’ গিগাবাইট ব্যান্ডউইডথ পাওয়া যাবে। এই কনসোর্টিয়ামে চায়না মোবাইল, চায়না টেলিকম, চায়না ইউনিকম, তাইওয়ানের জুংহোয়া টেলিকম, ফাস্ট টেলিকম, নেটওয়ার্ক আই টু ওয়াই (ভারতী), সিংটেল, সৌদি টেলিকম, অস্ট্রেলিয়ার টেলেক্সা, এমিরেটস ইন্টিগ্রেডেট টেলিকমিউনিকেশন্স, ইন্টিগ্রেটেড লি., পাকিস্তান টেলিকম লি., ইন্দোনেশিয়ার পিটিটিটি এবং থাইল্যান্ডের টিওটি কোম্পানি রয়েছে। এই সংযোগ পেতে খরচ হচ্ছে ২৮৮ কোটি টাকা।

....................................................................................................................................................................................................................................

সাক্ষাৎকার

প্রফেসর মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শিক্ষাবিদ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ

বিদায়ী বছরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রফেসর মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেছেন, ২০১২ সালে আমাদের তরুণ প্রজন্ম মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দেশের বড় বড় সঙ্কট সমাধানের যে আইডিয়াগুলো তৈরি করেছে, এটা আমাদের প্রকৃত অর্জন। আমাদের নতুন প্রজন্ম নতুন নতুন অ্যাপিস্নকেশন তৈরির ক্ষেত্রে খুব উৎসাহী ও উদ্যম নিয়ে কাজ করছে। ই-এশিয়ার নামে সরকার যে ব্যাপক অর্থের অপচয় করেছে, তাতে আমাদের আউটপুট তেমন নেই। বরং সরকার ই-এডুকেশন, ই-হেলথ বিষয়ে কাজ করলে আমরা আরও বেশি উপকৃত হতাম। ছাত্রদের মধ্যে আরও অনেক আইডিয়া কমপিটিশন হতে পারত। আরও একটি ইভেন্ট হয়েছে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড। এর মাধ্যমে আমাদের উপকার সামান্যই। কেননা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড করার কাজ করতে পারে চীন, জাপানের মতো প্রযুক্তি নির্মাতা দেশগুলো। এটা টাকার অপচয়। আমাদের সফটওয়্যার বিশ্বে বিক্রি বেড়েছে। কমপিউটার দিয়ে ম্যানপাওয়ারের ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করাটা ঠিক হচ্ছে না।

দেশে মানবসম্পদের কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বছরজুড়ে প্রদর্শনী আর মেলার নামে অর্থ অপচয় না করে মেধাসম্পদ উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তা না হলে মেধাবী তরুণেরা হতাশ হবে, বিশৃঙ্খলা বাড়বে। প্রজন্ম অলস হয়ে পড়বে।

নতুন বছরে সরকারের প্রতি পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দরকার ডিজিটালাইজেশনের নামে সিস্টেম ডেভেলপ করা। আমাদের সামান্য রিসোর্স। শোনা যায় ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে থাকে। সিস্টেম ডেভেলপ করে এই সীমিত সম্পদের দেশে সম্পদের অধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় কিভাবে সেজন্য ডিজিটালাইজেশনে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। যাতে দেশের কোথাও অলস সম্পদ পড়ে না থাকে। আর এজন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ছাত্রদের মধ্যে আইডিয়া কমপিটিশন বাড়াতে হবে।

....................................................................................................................

মো: সবুর খান
সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স

২০১২ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক সফলতা এসেছে। শহর থেকে শহরতলিতেও প্রযুক্তির বিস্তার লাভ করেছে। হার্ডওয়্যার শিল্পে আশাপ্রদ উন্নতি না হলেও সফটওয়্যার শিল্প এগিয়েছে। তবে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে বছরটি খুব একটা সুখকর ছিল না। বাজারের প্রসার হলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রযুক্তি ব্যবসায় বন্দি হয়ে পড়েছে গুটিকয়েক ফটকা ব্যবসায়ীর হাতে। ফলে বছরজুড়ে অস্থির সময় কাটিয়েছেন পুরনো ব্যবসায়ীরা। একই সাথে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যও সময়টা ছিল নির্বান্ধব।

সবুর খান মনে করেন, অগ্রিম আয়কর কাটার মতো বিধানের মারপ্যাঁচে প্রযুক্তিপণ্য বিপণনে বছরজুড়েই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে সময় পার করতে হয়েছে। ফটকা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে দিনের পর দিন হোয়াইট মার্কেট স্ফীত হয়েছে। এর ফলে অসমতল আর কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতার বাজার। লেভেল গ্রাউন্ড না থাকায় সফটওয়্যার শিল্পে বিকাশ ঘটলেও হার্ডওয়্যার শিল্প ব্যবসায় বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি। আসলে এখন ব্যবসায়ের ক্ষেত্রটা সমান্তরাল নয়। সরকারের বিদ্যমান আইন-কানুন ও সুযোগ-সুবিধা সমান্তরালভাবে প্রয়োগ করা দরকার। বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা হলে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা আসবে। কমবে হোয়াইট মার্কেটের দৌরাত্ম্য। তখন সমন্বিতভাবে উন্নয়ন সহজ হবে।

....................................................................................................................

ফাহিম মাশরুর
সভাপতি, বেসিস

সফটওয়্যার শিল্প বিকাশে ২০১২ সালের অর্জন নিয়ে সুখানুভূতি ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি ফাহিম মাশরুর। তিনি জানান, এ বছর আমাদের রফতানির প্রবৃদ্ধি হার বেড়েছে ৫৬ শতাংশ, একই সাথে দেশীয় রফতানির প্রথম ১৫টি পণ্য তালিকায় তথ্যপ্রযুক্তি স্থান করে নিয়েছে। এদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উল্লে¬খযোগ্য হারে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক পড়াশোনায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি হচ্ছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে আউটসোর্সিংয়ে সাফল্য অর্জন করায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক পড়াশোনার আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আমার দৃষ্টিকোণে বিকল্প সাবমেরিন ক্যাবল সমস্যার সমাধান ২০১২ সালের বড় ধরনের প্রাপ্তি। এতদিন সাবমেরিন ক্যাবলের যে সমস্যা ছিল, এ বছরই ভারতের সাথে একটা ব্যাকআপ লাইন চালু হয়েছে, এটা একটা বড় সাফল্য।

এ বছরই ফ্রিল্যান্সিংয়ে আমাদের আউটসোর্সারেরা অনেক ভালো করেছেন। ৪০-৫০ হাজার মানুষ এই খাতে কাজ করছেন। তারা প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা আয় করেছেন। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক হচ্ছে আইটি বিষয়ে আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র পেত না, কিন্তু এ বছর এ ক্ষেত্রে তরুণেরা পড়তে অনেক আগ্রহী হয়েছে।

....................................................................................................................

ফয়জুল্ল্যাহ খান
সভাপতি, বিসিএস

বর্ষ মূল্যায়ন নিয়ে বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি তথা বিসিএস সভাপতি ফয়জুল্যাহ খান বলেন, ২০১২ সাল বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতির সাফল্যের মাইলস্টোন। এ বছরেই উইটসার পরিচালক, অ্যাসোসিওর চেয়ারম্যান, ঢাকা চেম্বারের প্রেসিডেন্ট, অ্যামচেমের প্রেসিডেন্ট ও ডট ওআরজির অ্যাডভাইজার হয়েছে বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতির সাবেক প্রেসিডেন্টরা। আবার আইসিটিতে অবদান রাখার জন্য বর্তমান সরকারের বিশেষ সম্মান অর্জন করেছেন সাবেক সভাপতি মোস্তাফা জববার। এফবিসিসিআইয়ের ডাইরেক্টরশিপও পেয়েছেন সাফকাত হায়দার। এছাড়া এবারই আমরা প্রথম কাস্টম ডিউটি ও ভ্যাট ২২ ইঞ্চি মনিটর, প্রজেক্টর ও সার্ভার র‌্যাকের ওপর থেকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পেরেছি। এছাড়া এ বছর বিসিএস ঢাকার বাইরে ৮টি কমপিউটার মেলার আয়োজন করেছে, যাতে লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিল। তবে এ বছরেই আমরা বাজার মন্দার বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি।

তার ভাষায়, বছরের শেষ ছয় মাস বাজারের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। এখনও সেই অবস্থা কাটেনি। তাই সামনে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজার মন্দা কাটিয়ে ওঠা। একই সাথে ক্রমান্বয়ে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক কমপিউটার শিক্ষা চালু করতে সরকারকে সহায়তা করাও আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

....................................................................................................................

মোস্তাফা জববার
সাবেক সভাপতি, বিসিএস

সময় কিন্তু কম গড়ায়নি। তারপরও ডিজিটাল গভর্নমেন্টের হিসাবে পরিবর্তন হয়নি তেমন। বিশেষ করে ভূমি, পুলিশ বিভাগ ও বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশন হলে জনগণ সরাসরি ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা পেত অনেক বেশি। কিন্তু জনগণ সে দিকটা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ বছর থ্রিজি শুরু হলেও বছরের শেষ দিন পর্যন্ত নিলাম হয়নি। এ ছাড়া ২০১২ সালের মধ্যে ২০০৯ সালের আইসিটি পলিসি রিভিউ করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ২০১২ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের দারুণ অভাব দেখা গেছে। এই ব্যর্থতাগুলো শোধরাতে পারলে নতুন বছরে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপে যেতে পারব।

দেশব্যাপী ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষামূলক দেশীয় কনটেন্ট ও ই-বুক রিডারের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গবেষণার দিকেও সরকারের খেয়াল রাখা উচিত।

....................................................................................................................

আক্তারুজ্জামান মঞ্জু
সভাপতি, আইএসপিএবি

২০১২ সালের অর্জন নিয়ে কথা হয় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এসোসিয়েশন বাংলাদেশ তথা আইএসপিএবি সভাপতি আক্তারুজ্জামান মঞ্জুর সাথে। তার মতে, ২০১২ সালে দেশীয় ইন্টারনেট সেবার মান বেড়েছে। ব্যান্ডউইডথের দাম কমার সাথে সাথে ইন্টারনেটের স্পিড বাড়ানো হয়েছে। আর এ কারণে আগের চেয়ে বর্তমানে স্বাচ্ছন্দ্যমতো স্কাইপি, ইয়াহু মেসেঞ্জার, গুগল টক, ইউটিউব ব্যবহার সম্ভব। পাশাপাশি বিদেশি বায়ারদের বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সার ও এদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিশ্বাস বেড়েছে। বরাবরের মতো ২০১২ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল। তারপরও খুব বেশি ভালো যায়নি ২০১২ সাল। সরকার মাত্রাতিরিক্ত (আইআইজি) ইন্টারনেট গেটওয়ে লাইসেন্স দিয়ে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, এতে আগামীতে সরাসরি হোলসেলারেরা রিটেইলে নেমে যাবে। বাজার অস্থির হয়ে পড়বে। অবৈধ ভিওআইপি বাড়বে। সরকার রাজস্ব হারাবে। সব মিলিয়ে ইন্টারনেট সার্ভিসের বাজারে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন বছরে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন আমাদের ৬০ লাখ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ইউজার আছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে দিতে পারলে টেরিস্ট্রিয়াল সুবিধা ইতিবাচক হবে। ইতোমধ্যেই রাজধানীতে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যাকবোর্ন চালু হয়েছে। কিন্তু ব্যয়টা অনেক বেশি হচ্ছে। সরকার যদি কমপক্ষে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে আনে তাহলে সরাসরি ভোক্তাশ্রেণী এই সুবিধা পাবেন।

....................................................................................................................

অনন্য রায়হান
সিইও, নিবার্হী পরিচালক

বিদায়ী বছরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমাদের বেশ কিছু সফলতা রয়েছে। বছরটিকে ডিজিটাল যুগে পদার্পণের প্রস্ত্ততি পর্ব বছরটি ভালোই গেছে। বিদায়ী বছরের ২৭ ডিসেম্বর ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে চালু হয়েছে। ফলে ২০১৩ সালে ই-কমার্স ক্ষেত্রে আমাদের সামনে খুলে গেল অবারিত দুয়ার। অনলাইনে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংস্কার করতে হবে আইনগত কাঠামো। এটুআইয়ের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে বিজ্ঞান ও অঙ্ক শিক্ষা বিস্তারের প্রতি।

....................................................................................................................

লুনা শামসুদ্দোহা
সভাপতি, বাংলাদেশ ওমেন ইন টেকনোলজি

বছর দশেক আগ পর্যন্ত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে মূলত বিচরণ ছিল পুরুষদের। সামাজিক অবস্থান ও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে এ থেকে দূরে থাকত নারীরা। আইডিবি মার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোডের কমপিউটারের দোকানগুলোতে দেখা যায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পুরুষ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনে নারী-কর্মী ও উদ্যোক্তার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। তবে ক্রমশ এ চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে এবং উল্লে¬খযোগ্য হারে নারীর আগমন ঘটেছে এ বছর। বিশেষ করে আউটসোর্সিংয়ে।

শেষ কথা

গেল বছর ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অনেকদূর এগিয়েছে দেশ। কিন্তু কোরান শরীফের অসাধারণ একটি সাইট তৈরি ছাড়া সেই তালে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি সরকার। চার বছর কেটে গেলেও ডিজিটাল সরকার তৈরির কাজ শুরুই হয়নি। ভূমির ডিজিটাল জরিপ কাজের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য নয়। শুধু রেকর্ড রুম অটোমেটেড করা হয়েছে। ডিজিটাল ক্লাসরুম চালু হলেও এখনো ভালো কনটেন্ট প্রস্ত্তত হয়নি। বিপুল পরিমাণে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ অব্যবহৃত থাকলেও ইন্টারনেট এখনো দেশের সব জায়গায় পৌঁছেনি, দামও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ওয়েবসাইট (www.digitalbangladesh.gov.bd) ঠিকানায় বছরের পর বছর ধরে ঝুলছে হোম পেজের জেপিজি ছবি। হালনাগাদ করা হচ্ছে না সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইট। জাতীয় ওয়েব পোর্টালও (www.bangladesh.gov.bd) তথৈবচ। ই-পার্লামেন্টের কাজ সীমিত পরিসরে শুরু হলেও ডিজিটাল স্বাক্ষর এখনো প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে আবদ্ধ।

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইটেক পার্ক নির্মাণ এবং সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক তৈরির কথা থাকলেও এখনো কোনো পার্ক নির্মিত হয়নি। আইসিটি ইনকিউবেটর স্থাপনে অগ্রগতি থাকলেও কমপিউটার ভিলেজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।

কজ
ফিডব্যাক : netdut@gmail.com
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস