Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > এ সময়ের কমপিউটার অ্যাক্টিভিজম
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:১৯৬
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৩ - সেপ্টেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
কমপিউটারায়ন
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ২
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
এ সময়ের কমপিউটার অ্যাক্টিভিজম
ইংরেজিতে মৌল (mole) বলে একটা কথা আছে। অনেক সময় কোনো কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে সরকারি কোনো সংস্থায় কর্মরত কোনো ব্যক্তি গোপনে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে বা দেশে গোপন তথ্য সরবরাহ করেন। এ ধরনের ব্যক্তিকে মৌল বলা হয়। একুশ শতকের একজন মৌল তার এ গোপন তথ্য সরবরাহের জন্য কোনো অর্থ দাবি করেন না। তিনি বরং নিজেকে একজন আদর্শবাদী মানুষ হিসেবেই ভাবেন। তাকে ভাবেন ব্যক্তির সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করেন- প্রতিটি মানুষ হবে ক্ষমতার অন্যায় নির্মম ব্যবহার, নিপীড়নমূলক আচরণ, যাবতীয় জুলুম ও নির্যাতন থেকে মুক্ত। পৃথিবীতে থাকবে না স্বৈরশাসকের একচেটিয়া ক্ষমতার প্রয়োগের শাসন। ভিনদেশী কেউ তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে প্রলুব্ধ করে কিছু করিয়ে নেবে না। একজন মৌল মনে করেন, আজকের দিনের এ গোপন তথ্য সরবরাহের বিষয়টি হচ্ছে একটি অনলাইন পলিটিক্যাল ফিলোসফির বিট অ্যান্ড বাইট, যা আকর্ষণ করে তার ভাবনা-চিন্তাকে। একজন মৌল বা হ্যাকারের মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৮০-র দশকের মেসেজবোর্ডে, যা আরও শানানো হয় ৯০-এর দশকের চ্যাটরুমগুলোতে। আর অতি সম্প্রতি Reddit Avi 4Chan -এর মতো অনলাইন নেইবারহুডে তা লাভ করেছে পরিপক্বতা। একজন মৌল সর্বোপরি বিশ্বাস করেন : ইনফরমেশন ওয়ান্টস টু বি ফ্রি- তথ্য চায় মুক্তি। একই সাথে তিনি বিশ্বাস করেন, প্রাইভেসি ইজ স্যাক্রেড- একান্ত গোপনীয়তা পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়। এ দুই ধারণাকেই লালন করতে হবে, সুরক্ষা দিতে হবে।

এডওয়ার্ড যোসেফ সেণাডেন। যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছর বয়েসী এ তরম্নণ এক সময় ছিলেন সে দেশের এনএসএ তথা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির কন্ট্রাক্টর। এক সময় চাকরি করতেন সিআইএ তথা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিতে। তিনি সংবাদপত্রের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকারের সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারির বেশ কিছু অতি গোপনীয় মাস সার্ভিল্যান্স প্রোগ্রাম ফাঁস করে দিয়েছেন। সেণাডেন প্রাথমিকভাবে এ তথ্য ২০১৩ সালের বসমেত্ম প্রকাশ করেন লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার গেস্নন গ্রিনওয়াল্ডের কাছে। তখন সেণাডেন চাকরিতে ছিলেন এনএসএ কন্ট্রাক্টর বুজ অ্যালেন হেমিল্টনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যানালিস্ট হিসেবে। গত ৬ জুন স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতি গোপন দলিল তিনি চুরি করেছেন। তিনি বলেছেন, এখন জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এসব কর্মসূচি ও নীতি সঠিক না ভুল।

তিনি যে দলিল চুরি করে গণমাধ্যমে ফাঁস করে দিয়েছেন তাতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক গোপন কর্মসূচির কথা ফাঁস হয়ে যায়, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেলিফোন রেকর্ডের একটি ডাটাবেজ সঙ্কলন তৈরি করে তা ব্যবহার করা হবে সন্ত্রাসবিরোধী ও গোয়েন্দাবিষয়ক তদন্তের (ফর অ্যান্টিটেরোরিজম অ্যান্ড কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইনভেস্টিগেশনের) কাজে। তিনি ফাঁস করে দিয়েছেন আরও একটি কর্মসূচির কথা। এ কর্মসূচির নাম প্রিজম। এ কর্মসূচির আওতায় গুগল, ফেসবুক ও মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় অনলাইন প্রোভাইডারের রেকর্ডে প্রবেশ করে বিদেশি সন্দেহভাজনের বিষয়ে সার্চ করার আদালতী অনুমোদন পায় এনএসএ। এ গোপন কর্মসূচিটি সাত বছর ধরে চালু ছিল। সেণাডেন যে তথ্য ফাঁস করেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বড় ধরনের এক বিতর্ক। কেউ কেউ সেণাডেনকে অভিহিত করছেন একজন বীর ও হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা অভিধায়। অপরদিকে কেউ কেউ তাকে আখ্যায়িত করছেন একজন বিশ্বাসঘাতক-রাষ্ট্রদ্রোহী বলে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সেণাডেন ঘৃণ্য কাজ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছেন। তার এ তথ্য ফাঁসের ফলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। গত ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটর তার বিরম্নদ্ধে গোয়েন্দাগিরি ও সরকারি সম্পদ চুরির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন।

সেণাডেন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, তিনি এ তথ্য ফাঁস করে তার দেশের মানুষকে জানাতে চেয়েছেন জনগণের নাম ভাঙিয়ে সরকার কী করে যাচ্ছে। আর সরকার কার্যত কাজ করছে জনগণের বিরুদ্ধে, জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে। সেণাডেনের দাবি, ‘আমি অন্য কারও চেয়ে আলাদা কোনো ব্যক্তি নই। আমি ঠিক তাদেরই মতো একজন, যারা অফিসে প্রতিদিন বসে কাজ করেন।’ গার্ডিয়ান পত্রিকার কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন। উল্লেখ্য, তার ফাঁস করে দেয়া তথ্য গার্ডিয়ান ও ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সরকারি কন্ট্রাক্টর Booz Allen-এর হয়ে একজন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করায় সেণাডেন আর দশজনের মতো শুধু সাধারণ একজন নন। তিনি নতুন ও ভিন্ন একজন। ১৮ লাখেরও বেশি আমেরিকান এখন ধারণ করেন মিলিটারি টপ সিক্রেট সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স এবং শেডো ওয়ার্ল্ড ইন্টেলিজেন্স। এদের বেশিরভাগই আর যোগাযোগ করে না রিপোর্টার আর অ্যাক্টিভিস্টদের সাথে এনক্রিপটেড ই-মেইলের মাধ্যমে গোপন তথ্য প্রকাশের জন্য। অতএব সেণাডেন একজন আলাদা মানুষ। তার এ স্বাতন্ত্র্য সবকিছু পাল্টে দিচ্ছে।

সাহসী এক দুনিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল জাতিকে বিদেশি শত্রু ও তাদের গোয়েন্দাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। কেউ কেউ বলেছেন, সেণাডেনের মতো স্বদেশে বেড়ে ওঠা ২০ জন কমপিউটারিস্ট আগামী পৃথিবীটা কীভাবে চলবে সে ব্যাপারে একটি ইউরোপীয় ধারণা নিয়ে এ ধরনের কর্মকা- চালিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদেরকে তুলনা করা হচ্ছে ভিয়েতনাম যুগের সেসব যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদীর সাথে, যাদের যুক্তি ছিল- যুদ্ধ নয়, শান্তি হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা। তাদের মতো আজকের নবপ্রজন্মের র্যা ডিকেল টেকনোপলিরা বিশ্বাস করেন, ট্র্যান্সপারেন্সি অ্যান্ড পার্সোনাল প্রাইভেসি আর দ্য ফাউন্ডেশন অব অ্যা ফ্রি সোসাইটি, সিক্রেসি অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স, দেয়ারফোর, আর গেটওয়েজ অব টাইরেনি। আর টাইরেনি মোকাবেলায় বিদ্রোহই উত্তম বলে মনে করেন এসব তথ্য ফাঁসকারী।
কমপিউটার হ্যাকার ও Reddit -এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যারন সোয়ার্টজ ২০০৮ সালের এক মেনিফেস্টোতে প্রাইভেট ডকুমেন্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করার আহবান জানিয়ে লিখেন : দেয়ার ইজ নো জাস্টিস ইন ফলোয়িং আনজাস্ট লজ- সেখানে ন্যায় নেই, যেখানে অন্যায় আইন মেনে চলা হয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের তথ্য পাওয়া দরকার, তা যেখানেই মজুদ থাকুক। আমরা তথ্যকপি তৈরি করে তা গোটা বিশ্বের সাথে শেয়ার করতে চাই।

হংকংয়ের একটি হোটেল কক্ষ সেণাডেন এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কেনো তিনি এ কাজ করতে গেলেন। তিনি গর্বের সাথে উল্লেখ করেছেন, তিনি সঠিক কাজটিই করেছেন। এমনকি তিনি বর্ণনা করেছেন, তিনি যা করেছেন তার জন্য কীভাবে তিনি গোপনে খুনের শিকার হতে পারেন সিআইয়ের লোকদের হাতে, অথবা অপহরণ হতে পারেন চাইনিজ মাস্তান্দের দিয়ে। তিনি যে সার্ভিল্যান্স সিস্টেম উদঘাটন করে দিয়েছেন, তাকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন টার্নকি টাইরেনি নামে। এবং সেই সাথে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়ে দিয়েছেন, এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা গড়ে তুলতে না পারলে কী ঘটবে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এ পাবলিক ডিবেটের মাধ্যমে তথ্যের মুক্তি ঘটবে। তিনি যে ডকুমেন্ট চুরি করেছেন সে সম্পর্কে বলেন : দিস ইজ দ্য ট্রুথ। দিস ইজ হোয়াট ইজ হেপেনিং। ইউ শুড ডিসাইড হুয়েদার উই নিড টু বি ডুইং দিস।

তিন বছর আগে ইরাকে নিয়োজিত ছিলেন ব্র্যাডলি ম্যানিং নামে ২২ বছরের এক মার্কিন সেনা গোয়েন্দা বিশ্লেষক। তিনি একই ধরনের গোপন সামরিক ও কূটনৈতিক তথ্য ফাঁস করে দেয়ার ঘটনায় প্রায় একই ধরনের যুক্তি উচ্চারণ করেছিলেন আত্মপক্ষ সমর্থন করে। তিনি অবৈধভাবে শত শত হাজার গোপন দলিল উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে পাঠানোর পর ২০১০ সালে তার এক হ্যাকিং ফ্রেন্ডের কাছে লিখেছিলেন, আই ওয়ান্ট পিপল টু সি দ্য ট্রুথ, বিকজ উইদাউট ইনফরমেশন ইউ কেননট মেক ইনফরমড ডিসিশন অ্যাজ অ্যা পাবলিক।

সেণাডেনের মতো ম্যানিংও বলেছিলেন, তার সবচেয়ে মারাত্মক আশঙ্কা এই ছিল না যে- তার এই কাজের ফলে পৃথিবীটা বদলে যাবে, বরং তার আশঙ্কা ছিল এদের মধ্যে পরিবর্তন আসবে না। এ উভয় তরুণই বেড়ে উঠেছেন এমন এক নিরাপত্তা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে, যার ফলে নাইন-ইলেভেনের মতো হামলার ঘটনা ঘটতে পেরেছে। এরা বেড়ে উঠেছেন সেই অনলাইন যুগের চ্যাটরুমে ও ভার্চুয়াল কমিউনিটিতে, যেখানে এ অ্যান্টিঅথরিটি ফ্রি ডাটা আইডিওলজি শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। এরা অন্তত আংশিকভাবে হলেও তাদের চিহ্নিত করেছিলেন লিবারটারিয়ানস হিসেবে। ম্যানিং তার ও সেণাডেন সম্পর্কে এ শব্দটি ব্যবহার করে রন পলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানে অর্থ পাঠিয়েছিলেন। ম্যানিং বন্দী হওয়ার আগে লিখেছিলেন : ইনফরমেশন শুড বি ফ্রি। পড়ে তিনি আরও বলেন, তিনি জানেন না তিনি একজন হ্যাকার, ক্র্যাকার, লিকার না হ্যাকটিভিস্ট। এটি পাবলিক ডোমেইনের ব্যাপার।

উই আর লেজিয়ন
মেনিংয়ের বক্তব্য ছিল বিপ্লবী। কেননা, তা সরাসরি আইনের শাসনের প্রতি এক আঘাত। হতে পারে, এরা উভয়েই তা স্বীকার করেন। সেণাডেন তার কাজ সম্পর্কে বলেছেন, আপনি যখন সরকারকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালান, তখন তা হয়ে ওঠে মৌলিকভাবে গণতন্ত্রের জন্য একটি বিপদ। আর ওয়াশিংটনের সরকারি মহলের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য হচ্ছে, এর তাৎক্ষণিক প্রভাব ভয়াবহ এবং তাতে করে আসল ক্ষতি বয়ে আনার সম্ভাবনা থাকে। জর্জিয়ান রিপাবলিকান স্যাক্সবি চ্যামবিস্নস বলেছেন, এই তরুণ যা করেছে আমি চরম নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারি- এর ফলে আরও কয়েজনকে প্রাণ দিতে হবে। উল্লেখ্য, চ্যামব্লিস ‘সিনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্স’-এরও চেয়ারম্যান। প্রেসিডেন্ট ওবামা, হোয়াইট হাউস কিংবা উভয় দলের নেতারা কেউই ক্রমস্ফীত ডাটা কালেকশন প্রোগ্রামের বৈধতা বা কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তা সত্ত্বেও উভয় পক্ষ প্রবল আগ্রহী সেণাডেনকে ধরে এনে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে। টাইম পত্রিকার জরিপ মতে, ৫৩ শতাংশ আমেরিকান মনে করে সেণাডেনের বিচার হওয়া উচিত। অপরদিকে ২৮ শতাংশ মনে করে, তাকে তার মতো করে চলতে দিতে হবে। কিন্তু সেণাডেন ও ম্যানিংয়ের সমবয়েসীদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়েসী) মধ্যে এ হার আরও বেশি। ৩৪ শতাংশের অভিমত, সেণাডেনের বিচার হওয়া উচিত নয়। এই হ্যাকটিভিস্ট ইথোস (তত্ত্ব বা বৈশিষ্ট্য) বিশ্বব্যাপী বেড়ে উঠছে, আর এর ধারক-বাহক হচ্ছে প্রধানত তরুণ হ্যাকারেরা। এরা ক্রমবর্ধমান হারে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা খর্ব করছে অনলাইনে প্রতিবাদ জানানো ও ইন্টারনেট চুরির মাধ্যমে।

‘আশাবাদী হওয়ার মতো এখন অনেক কিছুই ঘটছে। যেমন কমপিউটার-শিক্ষিত তইরুণদের মূলাভিমুখীকরণ বা র্যাওডিকেলাইজেশন। এসব তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের মূল্যবোধ পাচ্ছে ইন্টারনেট থেকে। এটি হচ্ছে পলিটিক্যাল টেকনিক্যাল পিপলের পলিটিক্যাল এডুকেশন। এটি বিস্ময়কর।’- বলেছেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। গত এপ্রিলে গুগলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এরিক স্মিথকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারের সময় তিনি এ কথা বলেন।
গত ২৮ মে নিউইয়র্ক সিটিতে জেরেমি হেমন্ড নামে একজনকে স্টার্ট ফর গেস্নাবাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস নামে একটি বেসরকারি কনসাল্টিং কোম্পানির ই-মেইল, ক্রেডিট কার্ড ইনফরমেশন ও অন্যান্য ডকুমেন্ট চুরির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। জেরেমি হেমন্ডের এ হ্যাকিংয়ের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। হেমন্ড বলেছেন : আমি এ কাজ করেছি, কারণ আমি বিশ্বাস করি সরকার ও করপোরেশনগুলো দরজা বন্ধ করে আড়ালে থেকে যা করছে, তা জানার অধিকার রাখে জনগণ। তিনি আরও লিখেছেন, আমি তা-ই করি, যা আমি সঠিক মনে করি। উল্লেখ্য, হেমন্ড যেসব অ্যাক্টিভিস্টের সাথে কাজ করেন তারা সম্মিলিতভাবে অ্যানোনিমাস নামে পরিচিত।

অতি সম্প্রতি অ্যানোনিমাস টার্গেট করেছে মাস্টার কার্ড ও মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশস অব অ্যামেরিকার মতো ট্রেড গ্রুপ গুলোকে। এদের বিরুদ্ধে ওপেননেস বা উন্মুক্ততার বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। অ্যানোনিমাস প্রতিবাদ জানিয়েছে সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার র্যা পিড- ট্রানজিট সিস্টেমের বিরুদ্ধে, যখন কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে সেলুলার সার্ভিস। আর এরা বিশ্বব্যাপী সমাবেশ করেছে সায়েন্টোলজির বিরম্নদ্ধে ধর্মের গোপনীয়তা রক্ষায় এর আগ্রাসী সংরক্ষণবাদের প্রতিবাদে। ২০১১ সালে হ্যাকারেরা তাদের অ্যানোনিমাস পরিচয় দিয়ে চুরি করে ৭ কোটি ৭০ লাখ সনি প্লে-স্টেশন অ্যাকাউন্ট। এতে করে এ নেটওয়ার্ক এক মাস বন্ধ হয়ে যায়। এ কোম্পানির ডিভাইসের ফার্মওয়্যারে সুনির্দিষ্ট কিছু ফিচার আরোপ করার প্রতিবাদে এরা এ হ্যাকিং করে।
অন্যরা টার্গেট করেছে অ্যাকাডেমিয়া ও আইনী বিষয়ের ওপর। অ্যারন সোয়ার্টজ গত ১৬ জানুয়ারি আত্মহত্যা করেন। ২৬ বছর বয়েসী এ যুবকের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের অভিযোগ ছিল, তিনি একটি অ্যাকাডেমিক কমপিউটার হ্যাকিং করেছেন। তা ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের কমপিউটার হ্যাকং করে লাখ লাখ ফেডারেল কোর্ট ডকুমেন্ট ডাউনলোড করে তা প্রকাশ করে দিয়েছেন। তার কথা হচ্ছে, এসব ডকুমেন্টে প্রবেশের জন্য পাতাপ্রতি ফি নেয়ার প্রতিবাদে তিনি এ হ্যাকিং করেছেন। তাকে আটক করা হয়, কারণ তিনি চেষ্টা করছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ব্যয়বহুল JSTOR ডাটাবেজ থেকে বিপুল পরিমাণ কপিরাইটেড অ্যাকাডেমিক আর্টিকল ডাউনলোড করতে।

যাদেরকে এভাবে আটক করা হচ্ছে, তারা কিন্তু অলস বসে নেই। এরা পাবলিক ডোমেইনের তথ্য উন্মুক্ত করে দেয়ার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করে চলেছেন। তাদের প্রতিবাদের ভাষা : ফ্রি দ্য ফাইলস। এই ফ্রি দ্য ফাইলস প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব আইন এমন প্রকৃতির নয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বিচারযোগ্য। অন্যরাও অনুসরণ করছেন আমেরিকার বহুল আলোচিত টেকনোলজিক্যাল রিভ্যুলিউশনারিদের ট্র্যাডিশন। ফেসবুকের মার্ক জুকারবার্গ হ্যাক করেছিলেন হার্ভার্ডের ছাত্রদের আইডি কার্ডের ডাটাবেজ Facemash ক্রিয়েট করার জন্য। ফেসমেশ হচ্ছে জুকারবার্গের লাখো-কোটি ডলারের সাইট ফেসবুকের পূর্বসূরি। একজন টিনএজার হিসেবে অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস তার বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াকের তৈরি বেশি দূরত্বের ফোনকল করার বক্স বিক্রি করেছিলেন ফোন কোম্পানিকে বোকা বানানোর জন্য। মাইক্রোসফটের বিল গেটস প্রথমদিকের একটি কমপিউটার কোম্পানির অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছিলেন তা ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের হাত থেকে বাঁচার জন্য।

১৯৯০-এর দশকের প্রথম পাদে হ্যাকটিভিস্টেরা সংগঠিত হচ্ছিল বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। যেমন এদের একটি লক্ষ্য ছিল, ব্যক্তিপর্যায়ে অনলাইন গোপনীয়তা নিশ্চিত করা- টু এনশিউর অনলাইন প্রাইভেসি ফর ইন্ডিভিজুয়ালস। ফিল জিমারম্যান নামে এক হ্যাকার একটি ডাটা এনক্রিপশন প্রোগ্রাম ক্রিয়েট করেছিলেন। এর নাম পিজিপি। এতে ব্যবহার করা হয় একটি সফটওয়্যার টেকনোলজি। এ সফটওয়্যার টেকনোলজি যুক্তরাষ্ট্রের আইনে মিউনিশন অর্থাৎ সামরিক রসদ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ। অতএব এর রফতানি নিষিদ্ধ। যেহেতু ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের মাধ্যমে প্রিন্টেড মেটার রফতানি নিষিদ্ধ, তাই জিমারম্যান এমআইটি প্রেসের মাধ্যমে এর কোড প্রকাশ করেন। এসব উদ্যোগকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্দোলন জন্ম দেয় উইকিলিকসের। আজকের দিনে ইন্টারনেটের জগতে এ অবাধ্য হওয়ার প্রবণতা ব্যাপক আকার নিয়েছে। মানুষ জানতে পারছে সেণাডেন, ম্যানিং ও সোয়ার্টজের মতো লোকদের কর্মকা-। হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক লরেন্স লেসিং ছিলেন সোয়ার্টজের মেন্টর বা পরামর্শদাতা। তিনি বলেন, শিশু প্রজন্মকে আজ বারবার বলা হচ্ছে, তাদের আচরণ পরিপূর্ণভাবে যৌক্তিক, আসলে তা অপরাধকর্ম।
পিটার লুডলো হচ্ছেন নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক। তিনি ব্যাপক লেখালেখি করেন সাইবার কালচার বিষয়ে। তিনি বলেছেন, দুটি আলাদা কালচারের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংযুক্তি ঘটেছে। তিনি বলেন, সব সময়েই এ ধরনের টেক হ্যাকার ইথোস বা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। সম্ভবত এ বৈশিষ্ট্য ছিল লিবারটারিয়ান, যা আজ সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে অ্যান্টিঅথরিটারিয়ান পলিটিক্যাল ইমপালসের সাথে। আপনি যদি এ দুটি বিষয়কে একসাথে করেন, তবে তা হয়ে উঠবে দাবানলের মতো। অ্যানোনিমাসের ক্যাচপ্রোইজ বা বহু প্রচলিত স্লোগান হচ্ছে : উই আর লেজিওন। উই ডু নট ফরগিভ। উই ডু নট ফরগেট। এক্সপেক্ট আস। এখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে এদের মোকাবেলা করা হবে।

তথ্যযুগের সূর্যোদয়
সেণাডেনের তথ্য ফাঁসের ঘটনার পর ৮৬টি গ্রম্নপের একটি কোয়ালিশন- যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে 4chan, Reddit Ges BoingBoing -কংগ্রেসের কাছে পাঠানো এক উন্মুক্ত আবেদনে স্বাক্ষর করে। এ আবেদনে এনএসএ প্রোগ্রামকে বলা হয় আনকনস্টিটিউশনাল সার্ভিল্যান্স। Whitehouse.gov -এ ফাইল করা এক পিটিশনে ওবামার প্রতি আহবান জানানো হয় সেণাডেনকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য। মাত্র তিন দিনে এ পিটিশনে ৬০ হাজার নাম সংযোজিত হয়। জর্জ ওরওয়েলের ৬৪ বছরের পুরনো উপন্যাস ‘১৯৮৪’-র বিক্রি ব্যাপক বেড়ে যায়। সাধারণত লিবারেল প্রার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে থাকে প্রগ্রেসিভ চেঞ্জ ক্যাম্পেইন কমিটি। এ কমিটি সেণাডেনের আইনী সুরক্ষা তহবিলেও অর্থ সহায়তা দিয়েছে। আর সাম্প্রতিক এক অনলাইন ভিডিও ক্যাম্পেইনে হলিউডের চিত্রনির্মাতা অলিভার স্টোন এবং ম্যাগি গিলেনহাল ও পিটার সার্সগার্ডের মতো অভিনেতা এবং কিছু লিবারেল জার্নালিস্ট সংগঠিত করে আসছিলেন ‘আই অ্যাম ব্র্যাডলি ম্যানিং’ নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন। এ ক্যাম্পেইনে অভিমত প্রচার করা হয়- ম্যানিং একজন বাঁশিওয়ালার চেয়ে বেশি কিছু নন, যাকে বাঁচাতে হবে বিচারের হাত থেকে।
এমনকি আজকের দিনের সিলিকন ভেলির টাইটানেরাও কম যাননি। এরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন তাদের লিবারটারিয়ান পলিটিক্সের সাথে। সেণাডেন যখন প্রিজম প্রোগ্রামের পার্টনার হিসেবে গুগল, ফেসবুক ও মাইক্রোসফটের নাম ফাঁস করে দেন, এর পরপরই এসব কোম্পানি জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের কাছে অনুমোদন চায় তাদের ইতোপূর্বেকার গোপন সহযোগিতার বিষয় আদালতে আরও পরিপূর্ণভাবে বিস্তারিত প্রকাশের জন্য। এর কারণ, এরা এদের ব্র্যান্ড ধ্বংস করতে চায়নি, যা দীর্ঘদিন যাবত ইন্টানেটের ওপর অবলম্বন করে আসছে ফ্রি এক্সপেরিমেন্টেশন ও মিনিমাল রেগুলেশন। গুগলের চিফ লিগ্যাল অফিসার ড্যাভিড ড্রুমন্ড এক খোলা চিঠিতে ঘোষণা দেন : গুগল হেজ নাথিং টু হাইড- গুগলের গোপন করার কিছুই নেই।

কিন্তু স্বীকার করে নেয়া হয়, টেক কমিউনিটির প্রজ্ঞাকে আমেরিকান জনগণের একটা বড় অংশ সন্দেহের চোখে দেখে। টাইম সাময়িকীর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকার মাত্র ৪৩ শতাংশ মানুষ মনে করে, প্রাইভেসির ওপর আঘাত সৃষ্টি করতে পারে এমন সব প্রোগ্রাম থেকে সরকারের পিছু হটা উচিত। অপরদিকে ২০ শতাংশের অভিমত, তা প্রাইভেসির ওপর আগ্রাসী হলেও এ ক্ষেত্রে সরকারের এগিয়ে গিয়ে আরও কিছু করা দরকার। সেণাডেন যেসব প্রোগ্রামের কথা প্রকাশ করেছেন, সেসব প্রোগ্রাম এরা সমর্থন করেন কি না, সে প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন জনগণ পুরোপুরি বিভক্ত। ৪৮ শতাংশ সমর্থন করেন আর ৪৪ শতাংশ করেন না।
এদিকে মার্কিন সরকার সেণাডেনের সাথে এমন ব্যবহার করছে, যেনো সেণাডেন সণায়ুযুদ্ধকালীন কোনো স্পাই, যিনি দেশকে ডুবাতে চাইছেন। জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট সেণাডেনের গোপন তথ্য ফাঁস করার বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধে বিচার করার সূচনা পদক্ষেপ হিসেবে। মনে হচ্ছ, সরকারপক্ষ চেষ্টা করবে সেণাডেনকে বিচারের জন্য নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে। সেই সাথে চেষ্টা করবে তাকে সারাজীবন কারাগারে আটকে রাখার একটা ব্যবস্থা করতে। এই নতুন অনলাইন পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজমকে ফেডারেল সরকার কীভাবে নেবে, সম্ভবত এর পর্যাপ্ত যথাযথ আভাস পাওয়া যাবে ২০০৮ সালের ইউএস আর্মির কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সেন্টার থেকে চুরি করা একটি গোপন দলিলে, যা হ্যাকটিভিস্টেরা অনলাইনে পোস্ট করে দিয়েছিল। এ ডকুমেন্টে লেখা আছে, ‘উইকিলিকস ডটঅর্গের মতো ওয়েবসাইটের ওপর এরা এ মর্মে নির্ভর করে যে তাদের অর্থাৎ লিকার বা হুইসেল বেস্নায়ারদের নাম-পরিচয় ওরা প্রকাশ করবে না।’ এতে এ মর্মে উপসংহার টানা হয়, ‘সেনাবাহিনীকেই সেসব লোকদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে, যারা সেন্টার অব গ্র্যাভিটি ধ্বংস কিংবা এর ক্ষতি করে। সেই সাথে এ ধরনের কাজ আরও যারা করে, তাদেরকে এসব কাজে নিরুৎসাহিত করার দায়িত্বও নিতে হবে সেনাবাহিনীকে।’

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ গাইডলাইনই বাস্তবায়িত করে চলতে শুরু করে দিয়েছে। ম্যানিংকে আটক করা হয়েছে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে। তখন থেকে তাকে কঠোরভাবে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এমন অবস্থায় যে তাকে দিনে ২৩ ঘণ্টা নির্জন সেলে কাটাতে হয়। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের সাবেক এক মানবাধিকার তদন্তকারী এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের সাবেক মুখপাত্র জোসেফ ক্রাউলি। জোসেফ ক্রাউলি এ অবস্থাকে বর্ণনা করেছেন রিডিকুলাস অ্যান্ড কাউন্টারপ্রোডাকটিভ অ্যান্ড স্টুপিড হিসেবে। এ ধরনের মন্তব্য করে তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু একজন ফেডারেল জাজ পরবর্তী সময়ে রুল দিয়েছেন বিচারপূর্ব সময়ে তার সাথে এ ধরনের কঠোরতা অবলম্বনের ফলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে চূড়ান্ত রায়ে তার সাজা থেকে ১১২ দিন সাজা কমিয়ে দেয়া হবে। ইতোমধ্যেই গোপন তথ্য চুরির জন্য ম্যানিংকে দোষী সাব্যসত্ম করে কমপক্ষ ২০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। তিনি এখন ম্যারিল্যান্ডের ফোর্ট মেডিতে শত্রুদের সহায়তা করা ও এসপায়োনেজ অ্যাক্ট লঙ্ঘনের অতিরিক্ত অভিযোগে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি। এই ফোর্টেই রয়েছে এনএসএ’র সদর দফতর। এজন্য তার যাবজ্জীবন কারাভোগ করতে হতে পারে। ম্যানিং তার আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন : দ্য মোর আই রিড দ্য ক্যাবলস, দ্য মোর আই কাম টু দ্য কনক্লুশন দেট শুড বিকাম পাবলিক। অর্থাৎ তিনি যতই এসব সামরিক গোপন তারবার্তা পড়ে দেখেছেন তত বেশি করে তার কাছে মনে হয়েছে, এসব সাধারণ জনগণের জানা উচিত।

ম্যানিংয়ের এ তথ্য পাচারের পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সমাজ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনী তাদের পদ্ধতি-প্রক্রিয়া নতুন করে এমনভাবে সাজাতে চেষ্টা করছে, যাতে করে এ ধরনের তথ্য ফাঁসের কোনো ঘটনা আর না ঘটে। নতুনঃৎরঢ় রিৎব যোগ করা হয়েছে, যাতে করে গোপন তথ্য ব্যাপকভাবে ডাউনলোড হলে তা ধরা যায়। ওয়ার্কস্টেশনগুলোতে মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। আর গোপন তথ্যগুলোর আরও উন্নত কমপার্টমেন্টেলাইজ করা হয়েছে। স্পষ্টতই আরও অনেক কিছুই করতে হবে। এমন একটি বিশ্বাস জন্মেছে যে- জনস্বার্থে সব তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ করা দরকার। এ বিষয়টিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা একটি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সেণাডেনের তথ্য ফাঁসের ঘটনার ফলে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে গোপন ইনফরমেশন শেয়ারিং আরও সীমিত করে আনার।

‘আমার মনে হয়, একটি গোষ্ঠী আছে যারা যুদ্ধটা করছে না। এরা প্রধানত লিবারটারিয়ান। এরা মনে করে সরকারই হচ্ছে সমস্যা।’- এমনটি বলেছেন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। এ সাউথ ক্যারোলিনা রিপাবলিকান আর্মড সার্ভিস সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ কথা বলেন। তিনি এনএসএ সার্ভিল্যান্স প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়নে সহায়তা করেছিলেন। গ্রাহাম আরও বলেন, তিনি চান গোয়েন্দা সমাজের অভ্যন্তরে আরও উদ্যোগ নেয়া দরকার, যাতে করে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ার আগেই এসব লিকারকে পাকড়াও করে শাস্তি দেয়া যায়। সেণাডেন সম্পর্কে গ্রাহাম বলেন, ‘আমাদের কী করতে হবে, সে সম্পর্কে আমি তোয়াক্কা করি না। এসব কাজ নিরুৎসাহিত করার জন্য আমাদেরকে এসব লিকারদের শাসিত্মর মুখোমুখি করতে হবে।’
কিন্তু অন্যরা যারা গোয়েন্দা জগতের ওপর নজর রাখেন, তারা বলেন- এ কাজটি সহজ হবে না। সেণাডেন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রাইভেট কন্ট্রাক্টর। নাইন-ইলেভেনের পর এ ধরনের হাজার হাজার প্রাইভেট কন্ট্রাক্টরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে নির্ভর করতে হচ্ছে। ম্যানিংয়ের শাস্তি সেণাডেনকে এ কাজ থেকে মোটেও বিরত রাখতে পারেনি। বিষয়টি যদি কিছু করে থাকে, তবে তা অন্যদের ভবিষ্যৎ সেলিব্রিটি বা শহীদ হওয়ার মর্যাদা লাভের পথকেই খুলে দিয়েছে। সিনেটর চ্যাম্বেলিস বলেন, ‘এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা গোয়েন্দা সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি জানি না, তা আমরা সবসময় করতে পারব কি না।’ এদিকে আরও গোয়েন্দা তথ্য ফাঁস হওয়ার হুমকি অনেক বেড়ে গেছে। কেননা, নবপ্রজন্ম ইন্টারনেটের ডিফারেন্ট কালচার নিয়ে এসেছে এবং সেণাডেন তাদের স্বপ্নিল ভাবনা দখল করে নিয়েছেন।

এডওয়ার্ড জোসেফ সেণাডেন
জন্ম ১৯৮৩ সালের ২১ জুন। একজন আমেরিকান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির সাবেক টেকনিক্যাল কন্ট্রাক্টর। সিআইএ’র সাবেক চাকুরে। ২০১১ সালে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার ডিগ্রি নেয়া সেণাডেন জাপানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও কাজ করেছেন। তিনি ফাঁস করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সরকারের অতি গোপনীয় অনেক দালিলিক তথ্য। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি কর্মসূচির গোপন তথ্য রয়েছে ফাঁস করা এসব তথ্যে। সেণাডেন প্রাথমিকভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করেন ২০১৩ সালের মে মাসে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার গ্লেন গ্রিনওয়াল্ডের কাছে। এ তথ্য ফাঁস করার সময় তিনি চাকরি করতেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি কন্ট্রাক্টর বোজ অ্যালেন হ্যামিল্টনে। সেণাডেনের এ নিরাপত্তা তথ্য ফাঁস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জন্ম দিয়েছে এক বড় ধরনের বিতর্ক। কেউ বলছেন সেণাডেন এক বংশীবাদক বীর। যুক্তরাষ্ট্র সরকারসহ অনেকে তাকে দেখছেন এক দেশদ্রোহী হিসেবে। কারণ তিনি এসব তথ্য ফাঁস করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিনষ্ট করেছেন। দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মারাত্মক ক্ষতি করেছেন। ২০১৩ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও সরকারি সম্পদ চুরির অভিযোগে মামলা দায়ের করে। গত মে মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পালিয়ে যান তার বান্ধবী ২৮ বছর বয়স্ক লিন্ডসে মিলসকে নিয়ে। নানা দেশ ঘুরে সর্বশেষ রাশিয়ায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। শোনা গিয়েছিল তিনি তার এ বান্ধবীকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন।

ব্র্যাডলি ম্যানিং
জন্ম ১৯৮৭ সালের ১৭ ডিসেম্বরে, যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায়। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে চাকরিরত ছিলেন ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি থেকে শুরু করে সরকারি সম্পদ চুরির ২০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি ২০১০ সালে ইরাকে কর্মরত থাকার সময় ৭ লাখেরও বেশি গোপন মার্কিন দলিল উইকিলিকসের কাছে ফাঁস করে দেন। এ অভিযোগে তিনি অসম্মানজনকভাবে তার চাকরি হারান। সেই সাথে হারান র্যা ঙ্ক। তার র্যা ঙ্ক ছিল আর্মি প্রাইভেট। সে দেশের এসপায়োনেজ অ্যাক্ট এবং কমপিউটার ফ্রড অ্যান্ড অ্যাবিউজ অ্যাক্ট লঙ্ঘনের জন্য ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তাকে ৩৭ বছরের কারাদ- দেয়া হয়। গত ২২ আগস্ট তার অ্যাটর্নির মাধ্যমে এনবিসির ‘টুডে শো’তে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, ‘আমি আমার বাকি জীবন নারী হিসেবে বাঁচতে চাই।’ এই শোতে তার এই চিঠি পড়ে শোনানো হয়। তিনি চিঠিতে সবাইকে আহবান জানান, এখন থেকে তার নারীবাচক নাম চেলসিয়া ই ম্যানিং নামে যেনো তাকে ডাকা হয়।

অ্যারন সোয়ার্টজ
আমেরিকান কমপিউটার প্রোগ্রামার, লেখক, রাজনৈতিক সংগঠক ও ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট। জন্ম ১৯৮৬ সালের ৮ নভেম্বর। তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন ওয়েব ফিড ফরম্যাট আরএসএস ডেভেলপমেন্ট, ক্রিয়েটিভ কমন্স সংগঠন, ওয়েবসাইট ফ্রেমওয়ার্ক ওয়েব ডটপাই এবং সোশ্যাল নিউজ সাইট রেডিটের সাথে। ২০১৩ সালে তাকে অভিষিক্ত করা হয় ইন্টারনেট হল অব ফেম উপাধিতে। তাকে আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের মরণোত্তর জেমস মেডিসন অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। তার কোম্পানি ইনফোগামি’র সাথে রেডিটের একীভূত করার পর সোয়ার্টজ রেডিটেরও অর্ধেক মালিকানা পান। তার পরবর্তী কর্মকা- ছিল জনসচেতনতা ও ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিজমকেন্দ্রিক। ২০০৯ সালে কার্যকর অ্যাক্টিভিজম শেখার কাজে সহায়তা করার জন্য প্রগ্রেসিভ চেঞ্জ ক্যাম্পেইন কমিটি গঠনে সহায়তা করেন। ২০১০ সালে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিবিষয়ক এডমন্ড জে. সাফরা রিসার্চ ল্যাবের রিসার্চ ফেলো হন। হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক লরেন্স লেসিগ ছিলেন এর পরিচালক। সোয়ার্টজ প্রতিষ্ঠা করেন অনলাইন গ্রুপ ডিমান্ড প্রগ্রেস। এ গ্রুপটি স্টপ অনলাইন প্রাইভেসি অ্যাক্টবিরোধী ক্যাম্পেইনের জন্য সুপরিচিত। ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি এমআইটি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিয়মিত জার্নাল আর্টিকল ডাউনলোড করতেন। সোজা কথায় চুরি করতেন। এ অভিযোগে ফেডারেল কোর্টে তার বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের হয়, তাতে তার সর্বোচ্চ ১০ লাখ ডলার জরিমানাসহ ৩৫ বছরের কারাদ- ও তার সম্পদ বাজেয়াফত হতে পারত। তার প্রাথমিক গ্রেফতারের দুই বছর পর ২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি তার ব্রুকলিনের ক্রাউন হাইটস আ্যাপার্টমেন্টে তিনি ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন।
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস