Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > ইউনিকোডে বিজয় ও বাংলা লিপির প্রমিতকরণ
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: মোস্তাফা জব্বার
মোট লেখা:৯৩
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৪ - আগস্ট
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
ইউনিকোড
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
ইউনিকোডে বিজয় ও বাংলা লিপির প্রমিতকরণ
অভিনন্দন বাংলাদেশ। ধন্য আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে। কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে। একই সাথে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, বিশেষত কমপিউটার কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আশফাক হোসেন ও এর কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল কবিরকে ধন্যবাদ। একই সাথে এনামুল কবিরের সহযোগী হিসেবে আমরা যারা ছোটখাটো অবদান রেখেছি, তাদের জন্যও শুভ কামনা। আসুন ইউনিকোডে আমাদের বিজয়কে আড়ম্বরতার সাথে উদযাপন করি। এটি আমাদের এক বিশাল বিজয়।
আমাদের জন্য দুঃসংবাদ যেন ওঁৎ পেতে থাকে। প্রতিদিন শুধু হতাশা-ক্ষোভ আর যন্ত্রণার কথাই বলতে হয়। জীবনের শেষপ্রামেত্ম এসেও এই চক্রের বাইরে পা ফেলা যায় না। যদিও মনে হয়, জীবনে ব্যর্থতার চেয়ে প্রাপ্তির পালস্নাটা অনেক ভারি, তবুও যেখানেই কিছু হতে দেরি হয়, সেখানেই প্রতিবাদ করার ইচ্ছা করে। বাংলাভাষা ও লিপি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিনিয়তই আমি এই কাজটি করে থাকি।
এবার হতাশার মাঝেও একটি সুখবর দিয়ে ইউনিকোড প্রসঙ্গ এবং এর সাথে প্রাসঙ্গিক বাংলা প্রমিতকরণ নিয়ে কথা বলতে চাই।
সুখবরটি এসেছে একটি ই-মেইলে। গত ৯ জুলাই ২০১৪, ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিলের মোহাম্মদ এনামুল কবিরের কাছে একটি মেইল পাঠিয়েছেন। তিনি মেইলটির একটি কপি আমাকে ফরোয়ার্ড করেছেন। এটি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য নয় এবং বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য একটি অর্জন বলে আমি এই মেইলটি প্রকাশ্যে শেয়ার করছি।
আলোচিত মেইলটির প্রেÿÿতটি বর্ণনা না করা হলে এর মর্মার্থ অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। এ জন্য মেইলটির আগেই আমি এর প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষিতটি সংক্ষেপে বলে নিতে চাই। প্রথমত, সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য এটি বলা দরকার, কমপিউটার বস্ত্তত কোনো ভাষা বোঝে না। এটি যুগ্ম সংখ্যায় কাজ করে এবং এর ভাষা শুধু ০ ও ১। দুনিয়ার সব ভাষাই সঙ্কেত আকারে ০ ও ১ হিসেবেই কমপিউটারে প্রক্রিয়াকরণ হয়। আমরা কমপিউটারের পর্দায় যা দেখি, সেটি শুধু আমাদের দৃশ্যমানতা। যুগ্ম সংখ্যাকে কমপিউটারের প্রোগ্রামের সহায়তায় আমাদের ভাষায় রূপান্তর করে দেখানো হয়। ভাষার জন্য কমপিউটারের প্রয়োজনে প্রথমে রোমান হরফকে ১২৮টি কোডের মাঝে চিহ্নিত করা হয়। একে (লোয়ার) আসকি কোড বলা হতো। ১৯৬০ সালের অক্টোবর এটি নিয়ে কাজ শুরু হলেও এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। এক সময়ে সেটিকে ২৫৬টি কোডে পরিণত করা হয়। সেটিকে উচ্চতর আসকি বলা হতো। আমেরিকানদের তৈরি করা সেই কোডই কমপিউটারে রোমান হরফের মান হিসেবে প্রচলিত ছিল। আসকি কোডে দুনিয়ার আর কোনো বর্ণমালার কোড ছিল না। কালক্রমে আসকিকে আরও সম্প্রসারিত করে এক্সটেন্ডেড আসকি কোড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে লাতিন সব ভাষার সব বর্ণকে তার মাঝে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দুনিয়ার আর কোনো ভাষার কোনো বর্ণকে এই কোডে যুক্ত করা হয়নি।
আমরা ১৯৮৭ সালে প্রথম যখন কমপিউটারে বাংলা চালু করি, তখন রোমান হরফের সেই কোডেই (২৫৬টি) বাংলা হরফের চেহারা বা ফন্ট বানিয়ে তাকে ব্যবহার করতাম। এখনও আমাদেরকে মুদ্রণ ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে সেই আসকি কোডই ব্যবহার করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম নামের একটি বেসরকারি সংস্থা দুনিয়ার সব ভাষার জন্য একটি কোড পরিকল্পনা করে। সেই কোডে বাংলারও ঠাঁই হয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই কোড প্রস্তাব না করার ফলে নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে ইউনিকোড ৭.০ সংস্করণ পর্যন্ত বাংলা দাড়ি ও দুই দাড়ি কোড দুটি দেবনাগরী থেকে ব্যবহার করার ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতের ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রনিক্স এই প্রস্তাবটি পাঠিয়েছিল। বলে রাখা ভালো, শুরুতে বাংলা ড়, ঢ়, য় ও ৎ বর্ণগুলোও ইউনিকোডে ছিল না। তবে বেসরকারি চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত এসব বর্ণ বাংলায় যুক্ত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১০ সালের জুন মাসের আগে বাংলাদেশ এই কনসোর্টিয়ামের সদস্য হয়নি বা এতে অংশ নেয়নি। ফলে ২০১০ সালের আগে আমাদের পক্ষ থেকে এই দুটি কোড বাংলায় বসানোর প্রস্তাব করার সুযোগই ছিল না। তবে ২০১১ সালে আমরা আমাদের নিজস্ব মানে এই কোড দুটি অন্তর্ভুক্ত করি (বিডিএস ১৫২০ : ২০১১) এবং ২০১৪ সালের মে মাসে আমাদের প্রতিনিধি ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামকে আমাদের প্রস্তাব মেনে নেয়ার অনুরোধ করেন। সেই সময়ে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম তাতে সম্মত না হলেও পরে মেইল পাঠিয়ে জানায়, ইউনিকোডের অষ্টম সংস্করণে তারা আমাদের প্রস্তাব মেনে নেবে। এটি আমাদের জন্য, বাংলাভাষার জন্য, বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি বিশাল অর্জন। মেইলটি এরকম :
Hello again Mohammad,
We have taken editorial action items in the Editorial Committee for this. The editors will update the annotations in the names list for Version 8. (Version 7 has already been published.) We will also update the Bengali block description for the Version 7 Core Specification to note the names dahri and double dahri used in Bangla. (That would be in the section corresponding to Chapter 9, Section 2.) The Core Spec is planned for October 2014 publication. If you think it’s necessary to have any further information in meeting minutes beyond what is now documented, then we could enter your recent comments as feedback on 7.0, and capture formal action items in the August meeting. (That is coming up in about 1 month.) I hope that helps.
Regards, Rick
এর ফলে বাংলা লিপি সম্পূর্ণভাবে নিজের পরিধিতে তথ্য বিনিময়ের ক্ষমতা অর্জন করল। এই অর্জনের পরও আমাদেরকে ইউনিকোড ও তার প্রয়োগ এবং বাংলাভাষার প্রমিতকরণ নিয়ে কিছু বিষয় আলোচনা করতে হবে। একটু গোড়ার কথাও বলতে হবে।
বাংলা কোড ও ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে আমরা বাংলাভাষাকেই গণ্য করি। বস্ত্তত ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তার নামে পাকিস্তান তৈরির পর ১৯৪৮ সালেই বাঙালিরা ভাষার প্রশ্নে জেগে ওঠে। ১৯৫২ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনের সফলতা থেকেই এই জাতি তার জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনের ভিত রচনা করে। কালক্রমে সেই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হয়। সেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার ডিজিটাল যন্ত্রে প্রমিতকরণের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানটি ছিল অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সাথে যুক্ত হওয়া। এই সংস্থাটি রোমানসহ দুনিয়ার সব ভাষার সব হরফের প্রমিতকরণ করে থাকে। বাংলাভাষার জন্য ব্যবহার হওয়া লিপিমালার প্রমিতকরণও এই সংস্থাটি করেছে। কিন্তু যথাসময়ে সেই সংস্থার সাথে আমরা যুক্ত হতে পারিনি বলে বাংলা বর্ণমালার প্রমিতকরণ নিয়ে সঙ্কট ছিল। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রধান ও একমাত্র উপায়টি ছিল সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান এর সদস্য হওয়া। সদস্য হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ১২ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা। কিন্তু অতীতের বাংলাদেশ সরকার বছরের পর বছর ধরে এই ১২ হাজার ডলার দিয়ে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ নেয়নি। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বছরের পর বছর আবেদন-নিবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এই শতকের প্রথম দিকে ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকার বা তার পরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেউ বাংলাভাষার জন্য এই সামান্য কাজটুকু করতে চায়নি। আমরা কোনোভাবেই সেসব সরকারকে এই সদস্যপদের গুরুত্ব বোঝাতে পারিনি। তারা এই প্রতিষ্ঠানটি কি, সেটিই বুঝেনি।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার সময়ে সেই স্বপ্নের সিঁড়ি আমরা পার হলাম। ইউনিকোডের জন্মের প্রায় ২৩ বছর পর বাংলাদেশ সরকার ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্য হলো। অথচ অন্তত আরও ১৯ বছর আগে এই সদস্যপদ হওয়া যেত। বিশেষ করে ২০০১ সালের পরে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ লাভ করা আমাদের জন্য জীবন-মরণ ব্যাপার ছিল। এটি না হওয়ার ফলে বাংলাভাষার অগ্রগতি আর যাই হোক না কেন, বহু বছর পিছিয়ে গেছে- এ বিষয়ে সন্দেহ করার কিছু নেই।
অবশেষে গত ৩০ জুন ২০১০ ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ সদস্যপদ লাভ করে এবং ১ জুলাই ২০১০ থেকে এই সদস্যপদ সক্রিয় হয়। প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য বাংলাদেশ ১২ হাজার ডলার সদস্য চাঁদা দেয় এবং প্রতিবছর বার্ষিক চাঁদা পরিশোধ করে এই সদস্যপদ নবায়ন করা হচ্ছে। আমার জানা মতে, ২০১৩-১৪ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সদস্য চাঁদা পরিশোধ করা হয়েছে। আশা করি, ২০১৪-১৫ সালের চাঁদাও দেয়া হবে। আন্তরিক ধন্যবাদ সেই সময়কার (এখনকারও) সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, তার অনুপ্রেরণাতেই বাংলাদেশ এই সদস্যপদ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আমাদের তৎকালীন (বর্তমানেরও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী) বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে। ধন্যবাদ বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিলকেও। ১৮ মার্চ ২০১০ ইউনিকোড সদস্যপদের জন্য আবেদন করে ৩০ জুনের মাঝে সদস্যপদ প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের মাইলফলক অর্জন। এর ফলে প্রমাণিত হলো, আন্তরিকতা থাকলে কোনো কাজই অসম্ভব নয়। ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ দেয়া উচিত বিসিসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমানকে।
চরম অবহেলা ও অবজ্ঞার মধ্য দিয়ে আমরা সময় অতিক্রান্ত করেছি। তবে বরফ গলে ২০১৪ সালের মার্চে। সেই সময়ে রীতিমতো ঝগড়া করে আমি কমপিউটার কাউন্সিলের বাংলাভাষা প্রমিতকরণ কমিটির সভা আহবান করাতে সক্ষম হই এবং তাতে কমপিউটার কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আশফাক হোসেন সম্মত হন, আমাদের একজন প্রতিনিধি ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের মে মাসের সভায় যোগ দেবেন ও আমাদের প্রস্তাবটি সেখানে পেশ করা হবে। সেই মোতাবেকই মোহাম্মদ এনামুল কবির সেই সভায় যোগ দেন। এর আগে আমরা বিপুল পরিমাণ হোমওয়ার্ক করি, যাতে আমাদের প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। সে সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাব সরাসরি অনুমোদন পায়নি। এরা আমাদেরকে আরও হোমওয়ার্ক করার জন্য বলে। আমরা যখন সে কাজটি করছি তখনই এ সুখবরটি আসে। তবে প্রসঙ্গত এটি স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার, শুধু ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করাতেই আমরা বাংলাভাষার সম্মান অর্জন করতে পারিনি। আমাদেরকে যেতে হবে অনেকদূর।
ইউনিকোড ও ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম
ইউনিকোড হলো সারা দুনিয়ার ভাষাগুলোর জন্য ডিজিটাল যন্ত্রের এক ও অভিন্ন অ্যানকোডিং ব্যবস্থা। অন্যদিকে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম হলো এই কোড প্রমিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত একটি অলাভজনক সংস্থা। এর সূচনা ১৯৮৬ সালে হলেও এর জন্ম ১৯৮৭ সালে। ১৯৮৮ সালে এটি মোটামুটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে ইউনিকোড ইনকর্পোরেটেড হয়। র্যা৮ঙ্ক জেরক্সের জো বেকার এবং অ্যাপল কমপিউটারের লি কলিন্স ও মার্ক ডেভিস প্রাথমিক আলোচনার মধ্য দিয়ে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের যাত্রা শুরু করেন। মূলত র্যাআঙ্ক জেরক্স ও অ্যাপল কমপিউটারের উদ্যোগ হলেও এটি এখন সারা দুনিয়ার ভাষাগুলোর ডিজিটাল যন্ত্রের মান নির্ণয় করে থাকে। যদিও আইএসও (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশন) হলো বিশ্বের মান নির্ধারণ বা প্রমিতকরণ সংস্থা, তথাপি ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামই কার্যত কমপিউটারে বিশ্বের ভাষাগুলো ব্যবহার করার একমাত্র মান প্রস্ত্ততকারী সংস্থা। এখনকার প্রেক্ষিতে এই দুটি সংস্থাকে আলাদা করে ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে জানা যাবে, ইউনিকোড শব্দটির উৎপত্তি জো বেকারের হাতে। তিনি from unique, universal, and uniform character encoding-এর বিবেচনায় এই নামটি রাখেন। বস্ত্তত এর প্রথম মানটি তৈরি করার কাজ শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। কিন্তু সেই সংস্করণটি প্রস্ত্তত করতে সময় লাগে ছয় বছর। তাই ১৯৯২ সালের জুন মাসে প্রথম সংস্করণটি প্রকাশিত হয়। এর মাঝে ইউনিকোডের সাতটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৪ সালের জুনে প্রকাশিত হয় এর সপ্তম সংস্করণ।
ইউনিকোড ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে এর ৭.০ সংস্করণের পূর্ণ বিবরণ এখনও নেই। তবে ইউনিকোড ৬.০ সংস্করণের বিবরণ এরকম : মোট ১,০৯,৪৪৯টি গ্রাফিক, ১৪২টি ফরম্যাট, ৬৫টি কন্ট্রোল, ১৩৭৪৬৮টি ব্যক্তিগত ব্যবহার, সারোগেট ২০৪৮, নন-ক্যারেক্টার ৬৬ ও ৮,৬৫,০৮২টি সংরক্ষিত কোড রয়েছে। এতে ২০৮৭টি নতুন অক্ষর যোগ করা হয়েছে। তিনটি নতুন লেখন পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে, যার মাঝে একটি হচ্ছে ব্রাহ্মী-বাংলালিপির উৎপত্তিস্থল।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সংস্করণটি হলো ইউনিকোড ৬.৩। এতে মোট ১,১০,১৮৭টি বর্ণ রয়েছে। বলা যেতে পারে, প্রতিটি সংস্করণেই এর ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয় এবং বিশ্বের ভাষাগুলো ডিজিটাল যুগে ব্যবহার হওয়ার নতুন নতুন প্রযুক্তির সন্ধান পায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্ব মান সংস্থা আইএসও ডিজিটাল যন্ত্রের মান নির্ণয়ে শুধু এই সংস্থাটির সাথেই কাজ করে। ফলে দুনিয়াতে এই বিষয়ে একাধিক মান তৈরির আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
এতসব ইতিহাসের কথা বলার পরও একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্য হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কি? তার আগে জানার প্রয়োজন হবে কেন আমার ভাষার সাথে ইউনিকোড জড়িত।
কমপিউটারের যারা আদি ব্যবহারকারী তারা জানেন, এই ডিজিটাল যন্ত্রটি একেবারে শুরুতে রোমান হরফ ছাড়া আর কোনো হরফ বুঝত না। শুরুতে আমরা এসব প্রসঙ্গ এবং আসকি অ্যানকোডিং নিয়ে কথা বলেছি। র্যা ঙ্ক জেরক্স কোম্পানি আসকির কোডসীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করলেও একই সমান কোড বহাল রেখে রোমান ভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষা ব্যবহারের সহজ সুযোগ আসে ১৯৮৪ সালে জন্ম নেয়া মেকিন্টোস কমপিউটারে। ১৯৮১ সালে জন্ম নেয়া আইবিএম পিসির জন্য প্রণীত ডস অপারেটিং সিস্টেমেও রোমান হরফের কোড সীমানায় অন্য ফন্ট এবং সেই সুবাদে অন্য ভাষা ব্যবহার করা যেত। কিন্তু প্রক্রিয়াটি জটিল ছিল বলে অ্যাপল কমপিউটার কোম্পানির মেকিন্টোস কমপিউটার ডেস্কটপ বিপস্নবে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করে। অ্যাপলের গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস এবং ক্যুইক ড্র অ্যাপ্লিকেশনগুলো খুব সহজে গ্রাফিক্স পদ্ধতিতে রোমান ছাড়া অন্য ভাষার বর্ণমালা উৎপন্ন করতে শুরু করে। মাল্টিপল ফন্ট ব্যবহারের প্রযুক্তিও এজন্য সহায়তা করেছে। ফলে ডস অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা প্রয়োগ করার চেষ্টা আশির দশকের শুরুতে করা হলেও বস্ত্তত অ্যাপল মেকিন্টোস কমপিউটারেই প্রথম বাংলাভাষা সঠিক ও সুন্দরভাবে লেখা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ মে প্রকাশিত হয় কমপিউটারে কম্পোজ করা প্রথম বাংলা পত্রিকা আনন্দপত্র। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালে উইন্ডোজের হাত ধরে মেকিন্টোসের সেই প্রযুক্তি পিসিতে আসে। শুধু ইন্টারনেট ছাড়া অন্য সব কাজেই আমরা এখনও সেই প্রযুক্তিই ব্যবহার করছি।
২৫৬ কোডের আসকি কোডসেট নিয়ে বাংলা লেখার প্রধান অসুবিধা তিনটি। প্রথমত, বাংলা বর্ণের সংখ্যা অনেক বেশি। ২৫৬ কোডের মাঝে সর্বোচ্চ ২২০টি কোড ব্যবহার করে বাংলা সব যুক্তাক্ষর অবিকৃতভাবে লেখা অসম্ভব। এতে বর্ণগুলোর সৌন্দর্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ বর্ণকে সঠিকভাবে উৎপন্ন করা গেলেও অনেক বর্ণ তার প্রকৃতরূপে দেখা যায় না। বিশেষ করে যুক্তাক্ষরের ক্ষেত্রে সমস্যাটি গভীর। ফলে যখনই আমরা বাংলা হরফের বিষয়টি পর্যালোচনা করি, তখনই দেখি যুক্তাক্ষরগুলো তার আদি রূপ হারিয়ে ফেলছে বা নানা ধরনের অক্ষরাংশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে বলে যথাযথভাবে সেটি উৎপন্ন হচ্ছে না। বাংলা হরফে যেহেতু শুধু বর্ণ নয়, ফলা এবং চিহ্নও আছে, সেহেতু সেগুলো সঠিকভাবে বর্ণগুলোর সাথে যুক্ত হচ্ছে কি না সেটিও দেখার বিষয়। বাস্তবতা হলো, ২৫৬টি কোডে বাংলা সঠিকভাবে লেখা সম্ভব নয়। আমরা যারা বাংলা হরফ তৈরি করি, তারা কার্যত আপোস করি। একে মন্দের ভালো বলা যায়। আসকি কোডের দ্বিতীয় অসুবিধা হলো, বাংলাভাষার জন্য এর কোনো মান নেই। বাংলাদেশের বিএসটিআই এক সময়ে বাংলার জন্য একটি মান তৈরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। যদিও ২০০০ সালে একটি মান তৈরি হয় (বিডিএস ১৫২০ : ২০০০), কিন্তু সেটি আইএসও গ্রহণ করেনি। ফলে সেটিকে আন্তর্জাতিক মান বলা যায় না। অন্যদিকে বেসরকারি সফটওয়্যার নির্মাতারা নিজেরা একেকটি মান তৈরি করে বলে একাধিক মানের জন্ম হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশের একাধিক মান, পশ্চিমবঙ্গের একাধিক মান এবং আসাম-ত্রিপুরার মানগুলো নিয়ে আমরা ব্যাপকভাবে সঙ্কটে পড়েছি। যদিও বাংলাদেশে বিজয়ের মান অনেকটাই প্রচলিত, তবুও অন্য মানগুলোর কথা একেবারে অস্বীকার করা যাবে না।
খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও তৃতীয় আরেকটি সমস্যা হলো- একই কোড ইংরেজি ও বাংলা ব্যবহার করে বলে ফন্ট পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাষাও বদলে যেতে পারে। বাংলা ও ইংরেজি মিশ্রিত দলিলে এটি বেশ বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে। ফন্ট বদলাতে গেলে বা কনভার্ট করতে গেলে সেগুলো ভীষণ সমস্যা তৈরি করে।
ইউনিকোড মান আমাদের এসব সমস্যার সমাধান দিয়েছে। যদিও ইউনিকোড মানে শুধু মূল বর্ণগুলোর মান রয়েছে এবং আমাদের যুক্তবর্ণকে কোনো মান দেয়া হয়নি, তথাপি ওপেনটাইপ নামের একটি প্রযুক্তি দিয়ে আমরা অক্ষরের সংখ্যা যেকোনো পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি। ফলে অক্ষরের আকার-আকৃতি নিয়ে যে সমস্যা আসকিতে রয়েছে, সেটি আর থাকে না। ইউনিকোড যেহেতু সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সেহেতু এর মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠছে না। বাংলাদেশে ইউনিকোড মান সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও এটি স্বীকৃতি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের যে সংস্থাটি ইউনিকোডের সদস্য, তাদের মন্তব্য হলো- Data Representation and Encoding Standard: Society for Natural Language Technology Research has decided to accept UNICODE 5.0 and upwards as the standard for data representation and encoding for Bangla.
এর মানে হচ্ছে, ইউনিকোড মান ব্যবহার করলে বাংলাদেশের একটি টেক্সট ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও একইভাবে কোনো পরিবর্তন ছাড়া ব্যবহার করা যাবে। অন্যদিকে ইউনিকোডের মানে যেহেতু ভাষাগুলোর কোডিং আলাদা, সেহেতু কোনো টেক্সটের ফন্ট বদলালে সেটির ভাষাও বদলে যায় না।
অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমি এ কথা বলব, আমাদের ইউনিকোডের সদস্যপদ অনেক জরুরি ছিল। এর প্রথম কারণ হচ্ছে বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। ফলে এই ভাষার মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমরা নীরব থাকতে পারি না। শুরু থেকেই ইউনিকোড মান যখন নির্ধারিত হতে থাকে, তখন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ছিল না বলে তাতে আমরা যেভাবে বাংলা লিখি এবং আমাদের যেসব হরফের খুবই প্রয়োজন সেগুলো ইউনিকোড অন্তর্ভুক্ত করেনি। প্রধানত হিন্দির অনুকরণে বাংলার প্রমিতকরণ করা হয়। ফলে প্রথম দিকের সংস্করণগুলোতে আমাদের ড়, ঢ়, য় ও ৎ ছিল না। ইউনিকোডে এসব অক্ষর প্রবেশ করতে অনেক সময় লেগেছে। থাইল্যান্ডে যখন আমি ইউনিকোডের প্রথম সংস্করণের নমুনা দেখি, তখন স্পষ্টতই বাংলাকে হিন্দির অনুগত মনে হয়। সেখানে প্রতিবাদ করার ফলে প্রথম সংস্করণ চূড়ান্ত করার আগেই অনেক অগ্রগতি হয়।
আমাদের পক্ষ থেকে সরকারকে আমরা বারবার এই কথা বলে এসেছি, ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ পাওয়াটাই বড় কথা নয়। ২০১০ সালের সদস্যপদ লাভের পর থেকে এই কনসোর্টিয়ামের নানা ধরনের কর্মকা- হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিল ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের একটি কারিগরি কমিটির সভা ছাড়া আর কোনো সভায় যোগ দেয়নি। সদস্য হয়ে যদি ঘরে বসে হাত-পা গুটিয়ে রাখি, তবে যে চাঁদাটা শোধ করা হলো সেটিও জলে যাবে। এখন সময় হয়েছে আরও কিছু কাজ করার।
ইউনিকোড ও সঙ্কট
ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার ৭ সেপ্টেম্বর ১৩ সংখ্যার শেষ পাতায় একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তিন কলামে ছাপা এই খবরটির শিরোনাম ছিল : ‘সরকারি কাজে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট; কারিগরি ত্রুটির কারণে সব মন্ত্রণালয়ে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।’ আমরা জেনেছি, গত ১৮ জুলাই ২০১৩ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে একটি আমত্মঃমন্ত্রণালয়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সরকারের অতিরিক্ত সচিব মো: নজরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। সভার বরাত দিয়েই পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয়।
আমত্মঃমন্ত্রণালয় সভায় জানানো হয়, নিকস ফন্ট ও জাতীয় কিবোর্ড ব্যবহারে কারিগরি জটিলতা, কয়েকটি সফটওয়্যারে ইউনিকোড বাংলা ফন্ট সমর্থন না করা, বাণিজ্যিক প্রকাশকদের কাছে বাংলা ইউনিকোডে কোনো কিছু মুদ্রণ করতে হলে পুনরায় নন-ইউনিকোড ফন্টে কম্পোজ করা ও এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ এবং সময় ব্যয়, ইউনিকোড ব্যবহারে কর্মকর্তাদের অনাগ্রহ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়, সেতু বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলা ইউনিকোড ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা নেই বলে সভায় দাবি করা হয়।
সরকার ইউনিকোডকে জাতীয় মানের খবরই দেয়নি
যদিও খবরে বলা হয়েছে, সরকার সব মন্ত্রণালয় ও দফতরে ইউনিকোড ব্যবহার হোক বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তথাপি বাস্তবতা হচ্ছে সরকারের নিজেই নিজের মান মানে না। সরকার বিডিএস ১৫২০ : ২০১১ নামের যে ইউনিকোড মানটি স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেটি সরকারি ফন্ট নিকস ও আমার বর্ণমালাতে অনুসরণ করা হয়নি। সরকার এই মানটি অনুসরণ করার জন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশও দেয়নি। বরং ইউনিকোড অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে সরকারের মানটিকে অবহেলাই করা হয়েছে। কোনো সরকারের এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের গঠিত বাংলাভাষা প্রমিতকরণ কমিটির ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভার সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এরপর দীর্ঘদিন সেই কমিটির সভা ডাকা হয়নি। বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতি লিখিত ও মৌখিকভাবে এ কমিটির সভা ডাকার জন্য অনুরোধ করেছে। বহু কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে গত ৩ মার্চ ২০১৪ এ কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে অতি দ্রুত ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের কারিগরি কমিটিতে বাংলাদেশের মানটি প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৫ মার্চ কমপিউটার কাউন্সিলের এনামুল কবির আমার সাথে আলোচনা করেই ইউনিকোডের নির্ধারিত ফরম অনুসারে প্রস্তাবনাটি প্রস্ত্তত করেছেন এবং সেটি ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৮ জুন ২০১৪ সেই কমিটির আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ভয়ঙ্কর দিক হলো সরকার বাংলাদেশের মান ও ইউনিকোডের বর্তমান মান দুটিকে আলাদা করতে পারেনি। এর ফলে যে কোডে এখন ডাটা তৈরি হচ্ছে তার সাথে বাংলাদেশের মান এবং ইউনিকোড ৮.০-এর মান মিলবে না। সরকার যদি এখনই এ বিষয়ে সতর্ক না হয়, তবে বাংলাভাষার প্রমিত মান নিয়ে সরকারের ঝামেলা প্রকট আকার ধারণ করবে। অন্যদিকে মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, কোয়ার্কসহ যেসব প্রতিষ্ঠান এখনও বাংলার মান অনুসরণ করে না, তাদেরকে অবশ্যই এই মান অনুসরণ করতে অনুরোধ করতে হবে।
কারিগরি সঙ্কট
ইউনিকোড প্রয়োগ বিষয়ের খবরে বিস্তারিতভাবে বলা হয়নি, কারিগরি ত্রুটি কোথায় রয়েছে। সরকারের বড় আমলারা ইউনিকোড ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পর্যালোচনা করে দেখেনি, মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারই হলো একমাত্র সফটওয়্যার, যা শতকরা ৯৯ ভাগ ইউনিকোড সমর্থন করে। তবে তাতেও ছোটখাটো সমস্যা রয়েছে। অ্যাডোবি বা কোয়ার্ক তাদের সফটওয়্যারে বাংলা ইউনিকোড সমর্থন করে না। অথচ এসব সফটওয়্যার ইউনিকোডে হিন্দি সমর্থন করে। মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারেও কোনো কোনো বাংলা যুক্তাক্ষর ঠিকমতো দেখায় না। র্য বা র্যক এমন দুটি যুক্তবর্ণ যেটি নিয়ে সমস্যা হয়। রেফ বসার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। এ ছাড়া নিকস ফন্টের যুক্তাক্ষরে ত্রুটি আছে। এমনকি আমার বর্ণমালা ফন্টেও ত্রুটি আছে। যদি সঠিকভাবে বাংলা লিখতে হয়, তবে এই ত্রুটিগুলো আগে দূর করতে হবে। প্রথমত, এই বিষয়গুলো আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এরপর মাইক্রোসফটকে বলা উচিত, তারা যেন এসব ত্রুটি দূর করে। এখন আমাদেরকে আরও একটু বেশি কথা বলতে হবে। এখন মাইক্রোসফটকে বলতে হবে তারা যেন শুধু ইউনিকোড অ্যানকোডিংয়েই সীমিত না থাকে, বরং বিডিএস ১৫২০ : ২০১১ অনুসরণ করে।
অন্যদিকে অ্যাডোবি ও কোয়ার্ককে অনুরোধ করতে হবে, তারা যেন তাদের সফটওয়্যারে বাংলাদেশের বাংলা ইউনিকোড ও বিডিএস ১৫২০ : ২০১১ সমর্থন করে। যেহেতু অ্যাডোবি ও কোয়ার্ক বাংলা ইউনিকোড সমর্থন করে না, সেহেতু মুদ্রণের কাজ ইউনিকোড বা আমাদের মান দিয়ে করা যায় না। রিপোর্টে যথার্থই বলা হয়েছে, মুদ্রণের কাজের জন্য দু’বার খাটতে হয়। একবার এটি ইউনিকোডে তৈরি করতে হয়। আবার সেটি বিজয়ের আসকিতে তৈরি করতে হয়। বস্ত্তত বাংলাদেশের মুদ্রণ শিল্প শতভাগ বিজয়-আসকি ব্যবহার করে থাকে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে। এমতাবস্থায় সরকারের কমপিউটার কাউন্সিল যদি যথানিয়মে তার দায়িত্ব পালন না করে ও ইউনিকোড সমর্থনসহ জাতীয় মান তৈরিতে গুরুত্ব না দেয়, তবে ইউনিকোড বা জাতীয় মান কোনোটাই প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না। আমরা জেনেছি, নির্বাচন কমিশন বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে নিকস নামের ফন্ট তৈরি করেছে। খবরে জানা গেল, সেটি ত্রুটিপূর্ণ। খবরে যা বলা হয়নি সেটি হলো সরকারের এটুআই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা একাডেমি আমার বর্ণমালা নামে একটি ফন্ট ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়েছিল। সেই ফন্টটি এতই ত্রুটিপূর্ণ যে, এরপর সেটি ব্যবহার করার জন্যও কাউকে বলা সম্ভব হয়নি। যুক্তাক্ষর বিকৃত করা ছাড়াও ওই ফন্টটিতে সঠিকভাবে যুক্তাক্ষর তৈরিও করা হয়নি। জানা গেছে, এজন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কপাল ভালো, মোট তিনটি ফন্ট তৈরি করার প্রকল্প থাকলেও আমার বর্ণমালা তৈরির পর বাংলা ফন্ট তৈরির প্রকল্পটি স্থগিত আছে। ২০১৪ সালে নতুন কোনো ফন্ট প্রকাশিত হয়নি। বিস্ময়কর বিষয় হলো, সরকার এসব খাতে টাকা ব্যয় করার সময় কখনও এই শিল্প খাতের সাথে আলোচনা করে না, যারা এই খাতে কাজ করেছে তাদের সাথেও আলোচনা করে না বা কি করছে এবং তার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তার সম্ভাব্যতাও যাচাই করে না
জাতীয় কীবোর্ড
খবরে আরও বলা হয়েছে, সরকার জাতীয় কীবোর্ড প্রয়োগ করতে পারছে না। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, জাতীয় কীবোর্ড নামে যে কীবোর্ডটির কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি আসলে একটি পাইরেটেড বা নকল কীবোর্ড। বিজয় কীবোর্ডকে নকল করে মাত্র কয়েকটা বোতাম অদল-বদল করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কীবোর্ডটিকে গায়ের জোরে বিডিএস ১৭৩৮ : ২০০৪ নামে স্ট্যান্ডার্ড করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে করা সেই কীবোর্ড সম্পর্কে ঘোরতর আপত্তি আছে এবং কপিরাইট বোর্ডের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগও আছে। বাংলাদেশ কমপিউটার কাউন্সিল এজন্য এই কীবোর্ডের প্রয়োগ বন্ধ করে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সেই হিসেবে জাতীয় কীবোর্ড নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার সরকারের নেই। বরং নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য যারা বিজয় কীবোর্ড বা জাতীয় কীবোর্ড কপিরাইট-প্যাটেন্টধারীর সম্মতি ছাড়া ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কপিরাইট আইন ও আইসিটি আইন অনুসারে মামলা হতে পারে। নীতি-নির্ধারকরা এসব বিষয়ে কোনো ধারণা না নিয়েই যখন জাতীয় কীবোর্ডকে চাপাতে চান, তখন তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তো কঠিন হয়ে পড়েই। ব্যবহারকারীরা এটিও জানে না, সরকার কেন অন্য একজনের মেধাসম্পদ চুরি করছে বা সরকার কেন একটি জাতীয় কীবোর্ডের মান তৈরি করতে পারছে না। গত ৫ মার্চ ২০১৪ অনুষ্ঠিত বাংলাভাষা প্রমিতকরণবিষয়ক সভায় বিষয়টি আলোচনা হয়েছে এবং সেই সভায় জাতীয় কীবোর্ডের যে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত বিরোধ আছে, তার নিষ্পত্তি করার এবং একটি জাতীয় কীবোর্ড প্রমিতকরণ করার উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তেমন একটি জাতীয় কীবোর্ড প্রমিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় কীবোর্ড ব্যবহার করার আশা মোটেই সমীচীন নয়। বরং সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হওয়া উচিত যে সরকারের বিরুদ্ধে চুরি করার বা নকল করার অভিযোগ যেন না থাকে।

ইংরেজি হরফে বাংলা
সরকারের মাঝে কারিগরি এবং মনস্তাত্ত্বিক আরেকটি সঙ্কট হচ্ছে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সচরাচর বিজয় বা মুনীর কীবোর্ড দিয়ে বাংলা লিখত। কিন্তু সরকারের কোনো কোনো মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় এখন কেউ কেউ ইংরেজি হরফ দিয়ে বাংলা লিখছে। বিশেষ করে সরকারের এটুআই প্রকাশ্যে, ওয়েবসাইটে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখাকে উৎসাহিত করছে। তারা এমনটাও বলে, রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লিখে খুব সহজেই পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা যায়। তাদের পরামর্শে শিক্ষকরাও ভুল বানানে, ভুল অক্ষরে বাংলা লিখছেন, সেদিকে সামান্যতম নজরও নেই। আমরা খুব ভালো করেই জানি, সম্প্রতি ইউনিকোড বা বাংলা লেখার অন্যতম একটি সমস্যা হলো ইংরেজি হরফ দিয়ে বাংলা লেখা। অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণের ভুল ছাড়াও যুক্তাক্ষরের ভুলে ভরা থাকে এসব বাংলায়। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, বাংলা হরফের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ইংরেজি হরফ দিয়ে কেনোভাবেই সঠিক বানানে বাংলা লেখা যায় না। বস্ত্তত ইংরেজি হরফ বাংলা সব বর্ণ প্রকাশে সক্ষম নয়।
সার্বিকভাবে এটি বোঝা যায়, ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’ হিসেবে ফন্ট-কীবোর্ড ও ইউনিকোড প্রযুক্তিতে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করার পর এখন ইউনিকোড সরকারের আমলাদের গলার কাঁটা হিসেবে বিরাজ করছে। তারা একে না পারছে ফেলতে, না পারছে গিলতে। আমি প্রস্তাব করি, বাজারে বিদ্যমান ফন্টকে গ্রহণ করে সরকারের উচিত সবচেয়ে জনপ্রিয় কীবোর্ডকে জাতীয় কীবোর্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া এবং ইউনিকোড পদ্ধতির কারিগরি ত্রুটি দূর করার জন্য মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, কোয়ার্কের সাথে সমঝোতা করে বাংলা ইউনিকোডের সব কারিগরি ত্রুটি দূর করা। সরকারের নীতি-নির্ধারকদেরকে এটি সম্ভবত বুঝতে হবে, এখনও সরকারের সব কাজ শুধু ইউনিকোডে স্থানান্তর করার সময় হয়নি। বরং আসকির সাথে ইউনিকোডকে মিলিয়ে ব্যবহার করাটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। সরকারের উচিত তেমন সফটওয়্যার ব্যবহার করা, যার সহায়তায় আসকি ইউনিকোডে চলাচল সহজসাধ্য হয়, যাতে আসকি-ইউনিকোড কনভার্টার রয়েছে এবং দুই ধরনের অ্যানকোডিংই সহজভাবে ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে বাংলা লিপির প্রমিতকরণ ছাড়াও আমাদেরকে বাংলাভাষার আরও অনেক দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, সরকারকে এখন তার নিজস্ব মান প্রয়োগ করতে হবে। ইউনিকোড বলে চিৎকার না করে বিডিএস ১৫২০ : ২০১১ বলে চিৎকার করতে হবে।

ফিডব্যাক : mustafajabbar@gmail.com

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৪ - আগস্ট সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস