Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > নতুন মাইলফলকে নিউরোমরফিক কমপিউটিং
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:২০১
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৪ - সেপ্টেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
কমপিউটার->চিন্তাশক্তি চালিত
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ২
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
নতুন মাইলফলকে নিউরোমরফিক কমপিউটিং
বিগত কয়েক বছর ধরে টেক কোম্পানিগুলো ও শিক্ষাবিদেরা চেষ্টা করে আসছেন বহুল আলোচিত নিউরোমরফিক কমপিউটার আর্কিটেকচার-চিপ তৈরি করতে, যা তৈরি হবে মানব-মস্তিষ্কের অনুকরণে। এর সক্ষমতা হবে মানব-মস্তিষ্কের মতোই, অ্যানালাইটিক্যাল ও ইনটুইটিভ (বিশ্লেষণগত ও অন্তর্জ্ঞানমূলক) উভয়ভাবেই। আর ওই চিপ বিপুল পরিমাণের ডাটার কনটেক্সট ও মিনিং (প্রসঙ্গ ও অর্থ) সরবরাহ করতে পারবে। বর্তমানে এ ধরনের একটি সিস্টেম গড়ে তোলার ব্যাপারে পরিচালিত পদক্ষেপ নতুন এক মাইলফলকে পৌঁছল। এর মাধ্যমে নিউরোমরফিক কমপিউটিং তথা ব্রেন-ইনস্পায়ার্ড কমপিউটিংকে পৌঁছে দিল এক নতুন উচ্চতায়। চার হাজারেরও বেশি নিউরোসিনেপটিক কোরসমৃদ্ধ ৫.৪ বিলিয়ন ট্রানজিস্টর চিপ তৈরির মাধ্যমে এ সাফল্য অর্জিত হলো। প্রতিটি কোরে রয়েছে এমনসব কমপিউটিং উপাদান, যা এর বায়োলজিক্যাল উপাদানের অনুরূপ। কোর মেমরি কাজ করে মস্তিষ্কের synapse-গুলোর মতো। এগুলো এমন প্রসেসর, যা জোগান দেয় কোরের সণায়কোষ বা নিউরন এবং এর যোগাযোগের সক্ষমতা ঠিক মস্তিষ্কের অ্যাক্সন নার্ভ ফাইবার বা সণায়ুগ্রন্থির মতো। উল্লেখ্য, মস্তিষ্কের সাইনেপস হচ্ছে সেই পয়েন্ট, যেখান দিয়ে একটি নার্ভাস ইমপালস এক নিউরন থেকে আরেক নিউরনে চলে যায়। আইবিএম ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এ প্রকল্প গত ৮ আগস্ট তাদের গবেষণার ফল প্রকাশ করেছে ‘সায়েন্স’ পত্রিকায়।
এই দুই প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সির (ডিএআরপিএ) ‘সিস্টেম অব নিউরোমরফিক অ্যাডাপটিভ প্লাস্টিক স্ক্যালেবল ইলেকট্রনিকস’ (SyNAPSE) প্রজেক্টের অংশ হিসেবে।
আইবিএম ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নতুন এই ব্রেন-ইনস্পায়ার্ড কমপিউটিং চিপ ডিজাইন করেছে এভাবে, যাতে এটি আচরণ করে এনার্জি এফিশিয়েন্ট স্পাইকিং নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো। সাধারণ নিউরাল নেটওয়ার্ক থেকে একটু ব্যতিক্রমী হয়ে এই নিউরাল নেটওয়ার্ক একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর ডাটা প্রসেস করে। এটি তখনই কাজ করে (ফায়ার করে) যখন একটি ইলেকট্রিক্যাল চার্জ একটি সুনির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে। একটি স্পাইকিং নেট এ ক্ষেত্রে অধিকতর দক্ষ ও কার্যকর। এই ফায়ারিং তখন অন্যান্য কৃত্রিম নিউরনের চার্জের ওপর প্রভাব ফেলে। ঠিক যেমনটি চলে মানুষের প্রকৃত মস্তিষ্কে। প্রতিটি চিপের নিউরোসাইনেপটিক কোরে রয়েছে ২৫৬টি ইনপুট লাইন, যা কাজ করে অ্যাক্সনের মতো। উল্লেখ্য, অ্যাক্সন হচ্ছে মস্তিষ্কের দীর্ঘ ও একক সণায়ুকোষ। উল্লিখিত এই ২৫৬টি ইনপুট লাইন কাজ করে নিউরনের মতো। আইবিএমের এই নতুন চিপে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৪০৯৬টি নিউরোসাইনেপটিক কোর, যা তৈরি করে ১০ লাখেরও বেশি প্রোগ্রামযোগ্য স্পাইকিং নিউরন এবং ২৫ কোটি ৬০ লাখ কনফিগারযোগ্য সাইনেপসি।
আইবিএম ও SyNAPSE পার্টনারদের চূড়ান্ত লÿ্য জুতার বাক্সের আকারের একটি নিউরোসাইনেপটিক সুপারকমপিউটার তৈরি করা, যাতে থাকবে ১ হাজার কোটি নিউরন ও ১০০ ট্রিলিয়ন (এ ক্ষেত্রে ১ লাখ কোটি = ১ ট্রিলিয়ন) সাইনেপসি। আর এতে বিদ্যুৎ খরচ হবে মাত্র ১ কিলোওয়াট। মানব-মস্তিষ্কে রয়েছে ১০০ ট্রিলিয়ন সাইনেপসি, কিন্তু এতে বিদ্যুৎ খরচ হয় মাত্র ২০ ওয়াট, যা মোটামুটি খরচ হয় একটি ওভেন লাইট জ্বালাতে।
আইবিএম নিউরোসাইনেপটিক চিপকে দেখছে নতুন প্রজাতির সুপারকমপিউটারের বিল্ডিংব্লক হিসেবে, যা হবে মানব-মস্তিষ্কের অনুরূপ। এতে ব্যবহার হবে মাত্র কয়েক মিলিমিটার আকারের চিপ এবং খুবই কম বিদ্যুৎ খরচ হবে। এটি এমবেডেড করা যাবে একটি চশমায়, ঘড়িতে ও অন্যান্য পরিধানযোগ্য যন্ত্রপাতিতে। এসব চিপ আরও ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে সেন্সরি ইনপুটের মাধ্যমে এগুলো মেডিক্যাল ডায়াগনসিসে ব্যবহার করা যায়। আইবিএম গবেষকেরা এমন একটি ডিজিটাল থার্মোমিটারের কথা ভাবছেন, যা একটি কগনিটিভ তথা অবধারণক্ষম সেন্সরের সাথে লাগানো থাকবে। এই থার্মোমিটার স্ক্যান করতে পারবে এবং বেশ কিছু কেমিক্যাল সিগন্যাল দিতে পারবে একটি অসুস্থ শিশুর মুখে তা লাগালে। এটি ডায়াগনসিসের ফলাফলও জানিয়ে দেবে দ্রুত।
আরও তাৎক্ষণিক যেসব উদ্যোগ কগনিটিভ টেকনোলজি সরবরাহের ব্যাপারে আইবিএম নিয়েছে, তার প্রতিফলন রয়েছে আইবিএমের ওয়াটসন কমপিউটারে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াটসন কমপিউটার টেলিভিশনের বহুল আলোচিত জিওপার্ডি ক্যুইজ শো’র সাবেক দুই চ্যান্সিয়নকে পরাজিত করেছে প্রশ্নের ফ্যাকচুয়াল ডাটাবেজ সার্চ করার ক্ষমতার সুবাদে। গত বছরের শেষ দিকে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টার এবং ‘কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক লার্নার কলেজ অব মেডিসিন’ পরীক্ষা শুরু করেছে ডাটা অ্যানালাইসিস টুল ও রোগীদের প্রশিক্ষণ টুল হিসেবে ক্ষুদ্রতর ও অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্করণের ওয়াটসন কমপিউটার দিয়ে। আইবিএম পরিকল্পনা করছে এমন ওয়াটসন কমপিউটার তৈরি করতে, যা ক্লাউড সার্ভিসে পাওয়া যাবে এবং ভালোভাবেই ইন্টারনেট-কানেকটেড যন্ত্রপাতিকে পরিণত করবে একটি কগনিটিভ কমপিউটারে তথা অবধারণক্ষম কমপিউটারে।
নিউরোমরফিক কমপিউটিং
কমপিউটার মানুষকে সুযোগ করে দেবে মস্তিষ্ককে আরও ভালো করে জানার ও বোঝার। আর ব্রেনকে ভালো করে জানতে ও বুঝতে পারলে মানুষ সুযোগ পাবে আরও উন্নত মানের শক্তিধর কমপিউটার তৈরি করার। মানুষের সেই প্রয়াসের সূত্রেই সৃষ্টি হয়েছে নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিং আবার নিউরোমরফিক কমপিউটিং নামেও পরিচিত। নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিং তথা নিউরোমরফিক কমপিউটিং নামের ধারণাটির জন্ম ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে। এ ধারণার জন্ম দেন মার্কিন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী কারভার মিড। তিনি তখন বর্ণনা দেন ভেরি-লার্জ-স্কেল-ইন্টিগ্রেশন তথা ভিএলএসআই সিস্টেম ব্যবহারের, যে সিস্টেমে রয়েছে আমাদের সণায়ুতন্ত্রে তথা নার্ভাস সিস্টেমে থাকা নিউরোবায়োলজিক্যাল আর্কিটেকচারের অনুরূপ বহু ইলেকট্রনিক অ্যানালগ সার্কিট। সম্প্রতি নিউরোমরফিক পদবাচ্যটি ব্যবহার হচ্ছে অ্যানালগ, ডিজিটাল ও মিক্সড-মোডের অ্যানালগ/ডিজিটাল ভিএলএসআই ও সফটওয়্যার সিস্টেম বর্ণনায়, যা নিউরাল সিস্টেমের নানা মডেল বাস্তবায়ন করে।
নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মুখ্য বিষয় হচ্ছে এটুকু জানা ও বোঝা- কী করে ব্যক্তিবিশেষের নিউরনের মরফোলজি অর্থাৎ প্রাণী ও উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থান চলে, কী করে সার্কিটগুলো সার্বিক আর্কিটেকচার সৃষ্টি করে প্রত্যাশিত কমপিউটেশন, কী করে তথ্য উপস্থাপনের প্রভাব সৃষ্টি করে এবং পরিবর্তনে সহায়তা করে। নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিং একটি নতুন ধরনের বিষয়, যার ভিত্তি জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, গণিত, কমপিউটার সায়েন্স ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং। নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা কমপিউটিংয়ের এসব বিষয়ের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ডিজাইন করা হয় আর্টিফিসিয়াল নিউরাল সিস্টেম- যেমন ভিশন সিস্টেম, হেড-আই সিস্টেম, অডিটরি প্রসেসর এবং অটোনোমাস রোবট। এগুলোর ফিজিক্যাল আর্কিটেকচার ও ডিজাইন নীতির ভিত্তি হচ্ছে বায়োলজিক্যাল নার্ভাস সিস্টেম।
নিউরোমরফিক কমপিউটার হার্ডওয়্যারের একটি উদাহরণ হচ্ছে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্রেনস ইন সিলিকন’ গ্রুপের তৈরি ‘নিউরোগ্রিড’ বোর্ড। এটি ডিজাইন করা হয় মানুষের বায়োলজিক্যাল ব্রেনের অনুকরণে। ২০১১ সালের নভেম্বরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একদল গবেষক ৪০০ ট্রানজিস্টর ও স্টান্ডার্ড সিএমওএস টেকনিক ব্যবহার করে তৈরি করেন প্রথম ব্রেন-ইনস্পায়ার্ড কনপিউটার চিপ। ২০১২ সালের জুনে স্পিনট্রনিক গবেষকেরা লেটারেল স্পিন ভাল্ব ও মেমরিস্টর ব্যবহার করে একটি নিউরোমরফিক চিপ তৈরির ডিজাইন উপস্থাপন করে একটি প্রবন্ধ উপহার দেন।
হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্ট
নিউরোমরফিক প্রকৌশল প্রয়োগের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ‘হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্ট’। এ প্রজেক্টের লক্ষ্য বায়োলজিক্যাল ডাটা ব্যবহার করে মানুষের পরিপূর্ণ ব্রেন একটি সুপারকমপিউটারে সিমুলেট করা, যাতে করে আরও ভালোভাবে জানা যায় মানব-মস্তিষ্ক কী করে কাজ করে। এ গবেষণা প্রকল্পটি তৈরি করেন একদল নিউরোসায়েন্স, মেডিসিন ও কমপিউটিং গবেষক। হেনরি মারকাম এ প্রজেক্টের সহ-পরিচালক। তিনি বলেছেন, এ প্রকল্পটি চাচ্ছে একটি নতুন ভিত গড়ে তুলে মস্তিষ্ক ও এর রোগব্যধিকে জানতে ও বুঝতে এবং এই জ্ঞানকে ব্যবহার করে গড়ে তুলতে নতুন এক কমপিউটিং টেকনোলজি। এ প্রকল্পের তিনটি প্রাথমিক লক্ষ্য : ০১. মস্তিষ্কের অংশগুলো কী করে পরস্পর সংযুক্ত ও কীভাবে এগুলো একযোগে কাজ করে, তা জানা; ০২. কী করে মস্তিষ্কের রোগ সঠিকভাবে চিহ্নিত করে এর চিকিৎসা করা যায়, তা জানা; ০৩. এর মানব-মস্তিষ্ক সম্পার্কিত জানা-বোঝাকে কাজে লাগিয়ে নিউরোমরফিক কমপিউটার তৈরি করা। মানব-মস্তিষ্কের পুরোপুরি সিমুলেশন তথা নকল করতে পারলে আজকের দিনের একটি সুপারকমপিউটারের শক্তি আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে তোলা যাবে। আর সে জন্য আজ গবেষকদের নজর নিউরোমরফিক কমপিউটারের দিকে। হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্টে তাই ইউরোপীয় কমিশন ১৩০ কোটি ডলার বরাদ্দ দিতে পিছপা হয়নি। এই প্রকল্পের শুরু ২০১৩ সালে। এটি ১০ বছরব্যাপী একটি বড় ধরনের গবেষণা প্রকল্প। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থে পরিচালিত এই প্রকল্প সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক। এ প্রকল্পের কিছু কৌশলগত লক্ষ্যও রয়েছে। এর কৌশলগত লক্ষ্য নিউরোইনফরমেটিকস, ব্রেন সিমুলেশন (নকলকরণ), হাই-পারফরম্যান্স কমপিউটিং, মেডিক্যাল ইনফরমেটিকস, নিউরোমরফিক কমপিউটিং ও নিউরোরোবটিক- এই ছয়টি ক্ষেত্রে আইসিটি প্ল্যাটফরম গড়ে তোলা। এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন বিশ্বের ২৬টি দেশের ১৩৫টি পার্টনার ইনস্টিটিউশনের কয়েকশ’ গবেষক।
আরেকটি গবেষণা প্রকল্প
নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা কমপিউটিংয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গবেষণা প্রকল্প হচ্ছে BRAIN (Brain Research through Advancing Innovative Neurotechnologies) Initiative, যা Brain Active Map Project নামেও পরিচিত। ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল বারাক ওবামা প্রশাসন এ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করে। বলা হয়, এ প্রকল্পের লক্ষ্য মানবমস্তিষ্কে থাকা প্রতিটি নিউরনের কর্মকান্ডর ম্যাপ তৈরি করা। হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টভিত্তিক এই ইনিশিয়েটিভ বা উদ্যোগ চলবে ১০ বছর, যেখানে বছরে ব্যয় হবে ৩০ কোটি ডলার। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দি ক্যাভিল ফাউন্ডেশনের মলিকুলার বায়োলজিস্ট (অণুজীব বিজ্ঞানী) মিইয়ং চুন লন্ডনে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। এরপর বেশ কয়েকটি বৈঠক হয় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গবেষণাগারের বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-নীতিসংশ্লিষ্ট দফতরের সদস্যবর্গ, হাওয়ার্ড হাফস মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট ও অ্যালেন ইনস্টিটিউট অব ব্রেন সায়েন্স এবং সেই সাথে গুগল, মাইক্রোসফট ও কুয়ালকমের প্রতিনিধিদের মধ্যে। এরা সবাই মিলে শেষ পর্যন্ত এ প্রকল্পের পরিকল্পনা তৈরি করেন। ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা দেন, ২০১৪ সালের রাজস্ব বছরে তিনি এ প্রকল্পের জন্য ১০ কোটি ডলারের প্রাথমিক খরচের তহবিল চাইবেন। হাউস মেজরিটি লিডার এরিক ক্যান্টন বলেছেন, তিনি এই খরচের তহবিল পাওয়ার প্রস্তাব সমর্থন করবেন। অতিরিক্ত খরচ বহন করবে অ্যালেন ইনস্টিটিউট অব ব্রেন সায়েন্স, হাওয়ার্ড হাফস মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, ক্যাভিল ফাউন্ডেশন এবং সল্ক ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ। হোয়াইট হাউসের ঘোষণা চলতি বছরে গ্রীষ্মের দিকে এর বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ, ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি (ডিএআরপিএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ। আর এ ওয়ার্কিং গ্রুপের নেতৃত্ব দেবেন নিউরোসায়েন্টিস্ট কর্নেলিয়া বার্গম্যান এবং উইলিয়াম নিউসাম। খবরে প্রকাশ, এ গবেষণা প্রকল্পে প্রথমে ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণীর নিউরন কর্মকান্ডর গতিবিধি চিহ্নিত করা হবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে মানব-মস্তিষ্কের লাখো-কোটি নিউরনের কর্মকান্ডর ম্যাপ তৈরি করা হবে।
কমপিউটারে মস্তিষ্ক সমন্বিতকরণ
সময়ের সাথে কমপিউটার পরিপক্ব থেকে পরিপক্বতর হচ্ছে। মানব-মস্তিষ্ক কমপিউটারের মতো অতি দ্রুত হিসাব-নিকাশ করতে পারে না। কিন্তু মানব-মস্তিষ্কের বোধশক্তি একটি কমপিউটারের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এ কারণে গবেষকেরা এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন এমন কমপিউটার তৈরি করতে, যা মানব-মস্তিষ্কের মতো বোধজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে কোনো তথ্য চিহ্নিত করে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। ঠিক তথ্য অনুসরণ করে মানুষের চোখ, কান, নাক, এমনকি চামড়া সাড়া দেয় দ্রুত ও কার্যকরভাবে মাথার ঘিলু ব্যবহার করে। এ ধরনের কগনিটিভ তথা বোধসম্পন্ন সিস্টেম খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেন্সর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগৃহীত বিগ ডাটার তরঙ্গকে একটি অর্থপূর্ণ উপস্থাপনে রূপান্তরের প্রয়োজন। যেমন, একটি সড়কবিশেষে গাড়ি চলাচলের তথ্য কিংবা সামুদ্রিক আবহাওয়ার পরিস্থিতির ডাটা তরঙ্গ অর্থপূর্ণভাবে উপস্থাপনে রূপান্তর।
এই নিউরোমরফিক সিস্টেম গড়ে তোলে মানব-মস্তিষ্ক কমপিউটারে সমন্বয় সাধনের বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সোজা কথায় এই নিউরোমরফিক সিস্টেম হবে মানব-মস্তিষ্কের অনুরূপ। বিশেষ করে আইবিএম এ ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে- আইবিএম এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি ব্রেন-ইনস্পায়ার্ড নিউরোমরফিক চিপ তৈরি করেছে। এর ফলে এমন কমপিউটার তৈরি সম্ভব হবে, যা মানব-মস্তিষ্কের মতো দক্ষতার সাথে কাজ করবে। কোড লেখার জন্য একটি নতুন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সৃষ্টি ছাড়াও আইবিএম গড়ে তুলেছে ‘Corelets’ নামের প্রি-রিটেন প্রোগ্রামের একটি লাইব্রেরি। সেই সাথে উদ্ভাবন করেছে, মস্তিষ্কে যেভাবে বিভিন্ন প্রোগ্রাম কাজ করে তারই একটি নকল উপায়। এ ধরনের প্রোগ্রাম একদিন ব্যবহার হবে একটি আই-গ্লাস-মাউন্ডেড কমপিউটার অর্থাৎ চশমার ওপর বসানোর উপযোগী কমপিউটার, যাতে থাকবে ভিডিও ও অডিটরি সেন্সর। আর এই সেন্সর দিয়ে এমন লোকেরা ডাটা ধারণ ও বিশ্লেষণ করতে পারবেন, যাদের মস্তিষ্কের সেই অংশ নষ্ট হয়ে গেছে, যা ভিজ্যুয়াল ইনফরমেশন অর্থাৎ দেখার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রসেস করে। এর মাধ্যমে এসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ধরতে পারবেন দূরত্ব ও গভীরতা। কমপিউটার-বসানো এসব চশমা ব্যবহার করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যেকোনো ধরনের জটিল পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে একা চলাফেরা করতে পারবেন। এতে লাগানো চিপ এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে, এটি কাজ করবে ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের মতো। এটি চালকবিহীন গাড়িতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ওয়াটসন কমপিউটার
আইবিএম বিল্ট ওয়াটসন বিভিন্ন ধরনের ব্যাকরণ-কাঠামোর জটিল ভাষা বোঝার ক্ষমতা রাখে। সুনির্দিষ্ট সময় সীমাবদ্ধতার আওতায় এটি বিশ্লেষণমূলক ভাবনাচিমত্মা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। মানুষের বাম মস্তিষ্কের প্রেক্ষাপট থেকে আর্টিফিশিয়াল ও কগনিটিভ কমপিউটিং গবেষণার ফল হচ্ছে আইবিএমের তৈরি ওয়াটসন। ওয়াটসন হচ্ছে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কমপিউটার সিস্টেম। একটি ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজে করা প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। আইবিএমের Deep QA প্রজেক্টে এটি তৈরি করেছে একটি গবেষক দল। এর নেতৃত্বে আছেন প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর David Ferrucce। ওয়াটসনের নাম দেয়া হয়েছে আইবিএমের প্রথম সিইও ও শিল্পপতি থমাস জে. ওয়াটসনের নামানুসারে। এই কমপিউটার সিস্টেম বিশেষত গড়ে তোলা হয় ক্যুইজ শো ‘জিওপার্ডি’র প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য। ২০১১ সালে ওয়াটসন কমপিউটার জিওপার্ডি ক্যুইজ শো-তে প্রতিযোগিতা করে এর সাবেক বিজয়ী ব্রাড রাটার ও কেন জেনিংসের সাথে। ওয়াটসন তখন জিতে নেয় ১০ লাখ ডলারের প্রথম পুরস্কার। ওয়াটসনের অ্যাক্সেস ছিল ২ কোটি পৃষ্ঠার স্ট্রাকচার্ড ও আনস্ট্রাকচার্ড কনটেন্টে, যার পরিধি ছিল ৪ টেরাবাইটের ডিস্ক স্টোরেজ। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল উইকিপিডিয়ার সম্পূর্ণ টেক্সট। কিন্তু প্রতিযোগিতার সময় ওয়াটসন সংযুক্ত ছিল না ইন্টারনেটের সাথে। প্রতিটি ধারণাসূত্র বা ক্লু’র জন্য ওয়াটসনের তিনটি সম্ভাব্য সাড়া টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয়। ওয়াটসন অব্যাহতভাবে গেমের সিগন্যালিং ডিভাইসে এর মানব প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে রাখে। তবে কিছু কিছু ধরনের প্রশ্নের জবাব দিতে ওয়াটসনের সমম্যা হচ্ছিল। বিশেষ করে যেসব প্রশ্নের ধারণাসূত্র দেয়া হয় কম শব্দের ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের, সেগুলোর উত্তর দিতে ওয়াটসনের অসুবিধা হচ্ছিল।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইবিএম ঘোষণা দেয়- ওয়াটসন সফটওয়্যার সিস্টেমের প্রথম কমার্শিয়াল অ্যাপ্লিকেশন হবে ফুসফুসের ক্যান্সার চিকিৎসায় ইউটিলাইজেশন ম্যানেজমেন্ট ডিসিশনের জন্য। এর ব্যবহার হবে স্বাস্থ্যবীমা কোম্পানি Weellpoint-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটারিং ক্যান্সার সেন্টারে’। আইবিএম ওয়াটসনের বিজনেস চিফ মনোজ সাক্সেনা জানান, এ ক্ষেত্রের ৯০ শতাংশ নার্স ব্যবহার করে ওয়াটসন কমপিউটার এবং এরা ওয়াটসনের নির্দেশনা মেনে চলে।
ওয়াটসন হচ্ছ কুয়েশ্চন আনসারিং (কিউএ) কমপিউটিং সিস্টেম। কুয়েশ্চন আনসারিং টেকনোলজি ও ডকুমেন্ট সার্চের মধ্যে মুখ্য পার্থক্য হচ্ছে- ডকুমেন্ট সার্চে প্রয়োজন হয় একটি কীওয়ার্ড কুয়েরি, এর জবাবে দেখানো হয় ডকুমেন্টের একটি তালিকা। কুয়েরির সাথে প্রাসঙ্গিকতা অনুসারে এগুলো সাজানো থাকে। কোনো কোনো ডকুমেন্ট সাজানো থাকে জনপ্রিয় সার্চ অনুযায়ী। কিন্তু কিউএ টেকনোলজির বেলায় নেয়া হয় স্বাভাবিক ভাষায় একটি প্রশ্ন। এখানে এ প্রশ্নের জবাব জানতে চাওয়া হয় বিসত্মৃত বর্ণনায়। এবং এর সাথে দেয়া হয় এর সংক্ষিপ্ত উত্তর।
আইবিএম বলেছে, স্বাভাবিক ভাষা বিশ্লেষণ, সূত্র চিহ্নিত করা, হাইপোথেসিস খুঁজে পাওয়া ও সৃষ্টি করা, সাÿ্য-প্রমাণ পাওয়া ও স্কোর করা, হাইপোথেসিস একীভূত ও মান নির্ধারণ করা- ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা হয় নানা কৌশল। ওয়াটসনে ব্যবহার হয় DeepQA সফটওয়্যার এবং Apache UIMA (Unstructured Information Management Architecture) ফ্রেমওয়ার্ক। ওয়াটসন সিস্টেম লেখা হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়- এর মধ্যে আছে জাভা, সি++ ও প্রলগ। আর এটি চলে SUSE Linux Enterprise Serves II অপারেটিং সিস্টেমে। ডিস্ট্রিবিউটিং কমপিউটিং সুবিধা পাওয়ার জন্য এই অপারেটিং সিস্টেমে ব্যবহার হয় অ্যাপাচি হ্যাডোপ ফ্রেমওয়ার্ক।
সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান ম্যাগাজিনের সপ্তম সম্পাদক জন রিনি বলেছেন, ওয়াটসন প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ গিগাবাইট ডাটা প্রসেস করতে পারে, যা ১০ লাখ বইয়ের তথ্যের সমান। আইবিএমের মাস্টার ইনভেন্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট টনি পিয়ার্সন অনুমিত হিসাব দিয়ে বলেছেন, ওয়াটসনের হার্ডওয়্যারের পেছনে খরচ ৩০ লাখ ডলার। এর ক্ষমতা সেরা মানের ৫০০ সুপারকমিপউটারের সম্মিলিত ক্ষমতার চেয়ে বেশি। রিনির মতে, গেমের জন্য এর কনটেন্ট স্টোর করা হয় ওয়াটসনের র্যা মে, কারণ হার্ডড্রাইভে স্টোর করা ডাটায় অ্যাক্সেস করতে হয় ধীর গতিতে।
ওয়াটসনের ইনফরমেশনের উৎস হচ্ছে : এনসাইক্লোপিডিয়া, ডিকশনারি, ট্রেজার, নিউজওয়্যার, আর্টিকল, লিটারারি ওয়ার্কস। ইনফরমেশনের ওয়াটসন ব্যবহার করে ডাটাবেজ, টেক্সোনমি ও অনটোলজি- বিশেষত ডিবিপিডিয়া, ওয়ার্ডনেট ও ইয়াগো। আইবিএম টিম ওয়াটসনকে জোগাড় করে দিয়েছে লাখ লাখ ডকুমেন্ট ও রেফারেন্স ম্যাটেরিয়েল, যাতে এটি নিজেকে জ্ঞানসমৃদ্ধ করতে পারে। দাবা খেলোয়াড় কমপিউটার ‘ডিপ ব্লু’ ১৯৯৭ সালে বিশ্বখ্যাত দাবাড়ু গ্যারি ক্যাসপারভকে দাবা খেলায় হারিয়ে দেয়। সেই থেকে আইবিএম এ ক্ষেত্রে লেগে আছে নতুন চ্যালেঞ্জের পেছনে। সে চ্যালেঞ্জের পেছনে নানা সময়ে নানা উদ্যোগে আইবিএম পৌঁছেছে আজকের ওয়াটসন কমপিউটারের যুগে। এরপরও হয়তো চলবে নবতর পর্যায়ে ওঠার অব্যাহত সাধনা।
মস্তিষ্কের অনুরূপতা
এখন একদল কমপিউটার বিজ্ঞানী ও গবেষক এমন কমপিউটার বানাতে উঠেপড়ে লেগেছেন, যা কাজ করবে ঠিক মানব-মস্তিষ্কের মতোই। এরা বিশ্বাস করেন, মানুষ শুধু মস্তিষ্ককে শুধু গভীরভাবেই জানবে না, বরং মানুষ আরও উন্নততর ও অধিকতর স্মার্ট কমপিউটার তৈরি করবে মস্তিষ্ককে জানা-শেখার সূত্র ধরে। এসব দূরসৃষ্টিসম্পন্ন বিজ্ঞানী-গবেষকেরা আজ অভিহিত হচ্ছেন নিউরোমরফিক প্রকৌশলী অভিধায়। এরা বলছেন- এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য মানব-মস্তিষ্কের আছে, যা কমপিউটারের নেই। এগুলো হচ্ছে : কম বিদ্যুৎ খরচ (মানব-মস্তিষ্কে খরচ হয় প্রায় ২০ ওয়াট বিদ্যুৎ, অপরদিকে বর্তমানে ব্যবহৃত সুপারকমপিউটারে লাগে কয়েকশ’ মেগাওয়াট); সহনীয়তা (একটি মাত্র ট্রানজিস্টর বিকল হলে ভেঙে পড়তে পারে একটি মাইক্রোপ্রসেসর, কিন্তু মস্তিষ্ক সব সময় নিউরন হারিয়েও সক্রিয় থাকছে); প্রোগ্রামিংয়ের প্রয়োজন নেই (মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে জানতে ও পরিবর্তন ঘটাতে পারে সারা দুনিয়ার সাথে মিথস্ক্রিয়ার জন্য, কমপিউটারের মতো মস্তিষ্ককে সুনির্দিষ্ট পথ ও শাখাপথ অনুসরণ করতে হয় না, যার থাকে পূর্বনির্ধারিত অ্যালগরিদম।
এসব লÿ্য অর্জনে নিউরোমরফিক প্রকৌশলীদের কমপিউটার ও ব্রেনের মধ্যে অনুরূপতা আনতে হবে। আর যেহেতু কেউ জানে না, আসলে মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, অতএব তাদের এ সমস্যার সমাধান করতে হবে আগে। এর অর্থ মস্তিষ্ককে জানা ও বোঝার ক্ষেত্রে নিউরোসায়েন্টিস্ট তথা সণায়ুবিজ্ঞানীদের যে অপূর্ণতা রয়েছে, তা পূরণ করতে হবে নিউরোমরফিক কমপিউটার বিজ্ঞানী ও গবেষকদের। বিশেষ করে, তাদেরকে উপায় বের করতে হবে কৃত্রিম মস্তিষ্ক কোষ তৈরির এবং বিভিন্নভাবে এসব কোষের জন্য সংযোগ গড়ে তোলার। মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবে কী ঘটে তার অনুরূপ ক্রিয়াশীল নেটওয়ার্ক সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে তাদের।
কী করে মানুষের সণায়ুকোষ অর্থাৎ নিউরন কাজ করে, বিজ্ঞান মোটামুটিভাবে তা জানে। বিজ্ঞান এও জানে, মস্তিষ্কের কোন দৃশ্যমান লৌব (ফুসফুস বা মস্তিষ্কের উপরিভাগ) ও গ্যাঙ্গলিয়া (সণায়ুগ্রন্থি) কোন কোন কাজ করে। কিন্তু এসব লৌব গ্যাঙ্গলিয়াগুলো কীভাবে সংগঠিত হয়, তা জানা এখনও অস্পষ্ট থেকে গেছে। এ কারণে আমেরিকার ঘোষিত ‘ব্রেন ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান প্রধান লক্ষে্যর একটি হবে এই বিষয়টির একটি মানচিত্র তৈরি করা, লৌব ও গ্যাঙ্গলিয়ার সংগঠন প্রক্রিয়াকে আরও ভালো করে জানা। নিউরোমরফিক প্রকৌশলীদেরকেই আবিষ্কার-উদঘাটন করতে হবে মানুষের চিমত্মা করার মৌল নীতিগুলো।
এইচআরএল ল্যাবরেটরিজ
ক্যালিফোর্নিয়ার এইচআরএল ল্যাবরেটরিজে একটি নিউরোমরফিক কমপিউটার যন্ত্রের ডিজাইন তৈরি হচ্ছে। যৌথভাবে এই ল্যাবরেটরিজের মালিক বোয়িং ও জেনারেল মোটরস। এ প্রকল্পের নেতা নারায়ণ শ্রীনিবাস বলেছেন, তার নিউরোমরফিক চিপ কাজ করতে এক লাইন প্রোগ্রামিংয়েরও প্রয়োজন হয় না। বরং এর বদলে এটি কাজ করার মধ্য দিয়েই শেখে নেয়, ঠিক যেভাবে সত্যিকারের মস্তিষ্ক কাজ করে। সত্যিকারের মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম হচ্ছে, এটিকে বর্ণনা করা হয় একটি ‘স্মল-ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক’ হিসেবে। মস্তিষ্কে থাকা প্রতিটি নিউরনের রয়েছে অন্যান্য নিউরনের সাথে যুক্ত হাজার হাজার সাইনেপসি। এর অর্থ, যদিও মানবমস্তিষ্কে রয়েছে প্রায় ৮৬০০ কোটি নিউরন। প্রতিটি নিউরনের অন্যসব নিউরনের সাথে দুইটি বা তিনটি কানেকশন রয়েছে অসংখ্য রুটের মাধ্যমে।
প্রাকৃতিক মস্তিষ্ক এবং ড. শ্রীনিবাসের কৃত্রিম মস্তিষ্কসহ অন্যান্য কৃত্রিম মস্তিষ্ক, এই উৎস মস্তিষ্কেই মেমরি ফরমেশন এসব সাইনেপটিক কানেকশনকে জোরালো করে তোলে এবং অন্যগুলোকে ছাঁটাই করে। আর এর ফলে নেটওয়ার্কটি ইনফরমেশন প্রসেস করতে পারে প্রচলিত কমপিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ওপর কোনো ধরনের নির্ভর না করেই। এ ধরনের কৃত্রিম স্মল-ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হচ্ছে একটি সিস্টেমের সব নিউরনের মধ্যে কানেকশন গড়ে তোলা। অনেক নিউরোমরিফক চিপ এ কাজটি করে ক্রসবার আর্কিটেকচার ব্যবহার করে। এই আর্কিটেকচার হচ্ছে তারের একটি ঘন গ্রিড, যার প্রতিটি সংযুক্ত গ্রিডের চৌহদ্দিতে থাকা একটি নিউরনের সাথে। তারগুলো যে জায়গায় ক্রস করে, সেই জংশনই হচ্ছে সাইনেপসি। ÿুদ্র সার্কিটে এটি ভালো কাজ করে। নিউরনের সংখ্যা যত বাড়বে, এটি ততই ব্যবহার হয়।
এরপরও প্রশ্ন
এত কিছু জানার পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে- নিউরোমরফিক কমপিউটিং আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এখনও নিউরোমরফিক কমপিউটিং অবস্থান করছে এর একদম প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু যদি এই কমপিউটিং যথাযথ সাফল্য পায়, তবে এটি সুযোগ করে দিতে পারে এমন কমপিউটার যন্ত্র তৈরির, যা মানুষের মতেই বুদ্ধিমান- এমনকি হতে পারে মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। আর এভাবে বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী একদিন হয়ে উঠতে পারে বিজ্ঞানের সত্য তথ্য। আর সে লক্ষে্যই শত শত কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে এ সম্পর্কিত নানা প্রকল্পে, নানা দেশে, নানাভাবে। হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্ট (এক দশকের বাজেট ১৩০ কোটি ডলার) এবং ব্রেন ইনিশিয়েটিভ (প্রথম বছরের বাজেট ১০ কোটি ডলার) এ ধরনের দুটি উদাহরণ। এ ছাড়া রয়েছে আরও অনেক গবেষণা প্রকল্প। এসব প্রকল্পই একদিন নিউরোমরফিক কমপিউটিংকে নিয়ে যাবে নবতর উচ্চতায়।

অগ্রসর দুই নিউরোমরফিক কমপিউটার
সবচেয়ে অগ্রসর নিউরোমরফিক প্রোগ্রামের মধ্যে দুইটি পরিচালিত হচ্ছে হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্টের (এইচবিপি) আওতায়। ২০২৩ সালের মধ্যে ব্রেনের একটি সিমুলেক্রাম তৈরিতে এটি হচ্ছে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের এক উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ। এই প্রোগ্রাম দুটির অধীনে যেসব কমপিউটার নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে মৌলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ। একটির নাম SpiNNaker- এটি তৈরি করছেন মানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিভেন ফারবার। এটি একটি ডিজিটাল কমপিউটার, যা আজকের দুনিয়ায় আমাদের কাছে সুপরিচিত। এই কমপিউটার ইনফরমেশন প্রসেস করে কতগুলো শূন্য (০) ও এক (১)-এর একটি ধারা ব্যবহার করে, যার উপস্থাপন চলে ভোল্টেজের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির মাধ্যমে।
অন্য কমপিউটার যন্ত্রটি হচ্ছে Spikey- এটি তৈরি করছেন ড. মেয়ারের একটি টিম। স্পাইকি ফিরে গেছে প্রথম যুগের কমপিউটিংয়ে। প্রথম দিকের কতগুলো কমপিউটারের মধ্যে একটি ছিল অ্যানালগ কমপিউটার মেশিন। এসব কমপিউটারে সংখ্যা উপস্থাপিত হয় অব্যাহতভাবে মাত্রা পরিবর্তনশীল ভোল্টেজের ওপর একটি পয়েন্ট হিসেবে। অতএব ০.৫ ভোল্টেজের আলাদা অর্থ থাকবে ১ ভোল্ট ও দেড়ভোল্ট থেকে। অংশত স্পাইকি কাজ করে ঠিক এভাবে। অ্যানালগ কমপিউটার পরাজিত হয়েছে ডিজিটাল কমপিউটারের কাছে। কারণ, দ্ব্যর্থকতার ত্রুটি ডিজিটাল কমপিউটারে অ্যানালগ কমপিউটারের তুলনায় কম, কিন্তু ড. মেয়ার মনে করেন, যেহেতু রিয়েল নার্ভাস সিস্টেমের কাছাকাছি কিছু বৈশিষ্ট্য অ্যানালগ কমপিউটার অপারেট করে, তাই এ কমপিউটার এ ধরনের ফিচার-মডেলিং আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারে।
ড. ফারবার ও তার টিম ২০০৬ সাল থেকে কাজ করে আসছিলেন SpiNNaker-এর ওপর। এই ধারণাটি পরীক্ষায় জন্য দুই বছর আগে এরা আরেকটি সংস্করণ তৈরি করেন, যার রয়েছে ১৮টি প্রসেসর। এরা এখন কাজ করছেন আরও বড় একটি কমপিউটার যন্ত্র নিয়ে। অনেক অনেক বড় এটি। তাদের এই কমপিউটার যন্ত্রের আছে ১০ লাখ প্রসেসর। চলতি বছরেই এটি তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে। এই এতসংখ্যক চিপ দিয়ে ড. ফারবার মনে করছেন, মানব-মস্তিষ্কের ১ শতাংশের মডেল তৈরিতে সক্ষম হবেন। আর তিনি তা করতে পারবেন রিয়েল টাইমে। ড. ফারবারের পরিকল্পনা এখানে থেমে যাওয়া নয়। তিনি আশা করছেন, ২০২০ সালের দিকে SpiNNaker-এর এমন একটি সংস্করণ তৈরি করতে পারবেন, যা উল্লিখিত ১০ লাখ প্রসেসরের কমপিউটার যন্ত্রের চেয়ে ১০ গুণ বেশি কার্যক্ষম হবে।
ড. মেয়ার ডিজিটাল রুটকে একদম বাতিল করে দেননি। বরং তিনি এর ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য আনছেন। তিনি ডিজিটাল কম্পোনেন্টস ব্যবহার করেন সাইনেপসি বরাবর সংবলিত মেসেজের অনুরূপতা আনতে। সাইনেপসি হচ্ছে নিউরনগুলোর মধ্যেকার জংশন বা মিলনকেন্দ্র। নিউরোট্রান্সমিটার নামের রাসায়নিক এ ধরনের মেসেজ বহন করে। এসব ট্রান্সমিটার হচ্ছে ‘অল-অর-নাথিং’ অর্থাৎ এগুলোও ডিজিটাল।

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৪ - সেপ্টেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস