Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > ডিজিটাল ‘পুঁথি’
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: ইমদাদুল হক
মোট লেখা:৫৪
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৪ - সেপ্টেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
সফটওয়্যার
তথ্যসূত্র:
তথ্যপ্রযুক্তি
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
ডিজিটাল ‘পুঁথি’
একসময় হাতে লেখা পুস্তিকা বা পুঁথিই ছিল আমাদের সাহিত্যচর্চার সম্বল। ছাপাখানা আবিষ্কারের পর তৎকালীন পুঁথি চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, মহাভারত, ইউসুফ-জোলেখা আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। আমাদেরকে দিয়ে চলেছে সমকালীন জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলো। এবার এই পুঁথিকে কালের খেয়ায় আরও সুসংহত করল টিম ইঞ্জিন, উদ্ভাবন করল হাতের লেখা ও ছাপা বাংলা অক্ষর ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণের প্রযুক্তি বাংলা ওসিআর-পুঁথি। গত ১৫ আগস্ট অনলাইনে সবার মাঝে আত্মপ্রকাশ করল এই ডিজিটাল পুঁথি। বেসরকারি উদ্যোগেই ৩৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব ভাষার ছাপা অক্ষর (অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনাইজার) মেশিনে পাঠযোগ্য করার সফটওয়্যার তৈরির গৌরব অর্জন করল বাংলাদেশ।
ওসিআর
কমপিউটারে বাইরে থেকে ইমপোর্ট করা অক্ষর ডিজিটাল অক্ষরে পরিবর্তন করার প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন’ (ওসিআর)। একটি ভাষা-স্বতন্ত্র ও বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই কাজটি সম্পাদন করা হয়। এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে হাতের লেখা, টাইপ করা ও ছাপার হরফের লেখাকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য লেখায় রূপান্তর করে তা সংরক্ষণ ও সম্পাদনা করা যায়। এই সফটওয়্যারের ফলে এটি ছবির ফরম্যাটে সংরক্ষিত অক্ষরও চিনতে পারে। ফলে ছবির অক্ষরকে স্ক্যান করে অথবা ছবি তুলে টেক্সট ফাইলে রূপান্তর এবং সম্পাদনা করা যায় খুব সহজেই। অবশ্য সংরক্ষণ ও সম্পাদনার চেয়ে এই সফটওয়্যারটির অন্যতম সুবিধা হচ্ছে, ছবির ফরম্যাটে ওয়েবে বা কমপিউটারে সংরক্ষিত ডকুমেন্ট থেকে ‘সার্চ’ অপশনের মাধ্যমে সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। পুরো ডকুমেন্টটি তল্লাশি করতে হয় না।
বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’
কমপিউটারে সংরক্ষিত বাংলা ডকুমেন্ট থেকে ইউনিকোডের বাইরের অক্ষরের কোনো ডকুমেন্ট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এতদিন অসাধ্য ছিল। আর বাংলা অক্ষরের ছাপা ডকুমেন্ট সংরক্ষণ সীমাবদ্ধ ছিল শুধু ছবি অথবা পিডিএফ ফরম্যাটে। ফলে প্রয়োজনের মুহূর্তে ঐতিহাসিক অনেক দলিল বা তথ্য খুঁজে পাওয়া আমাদের কাছে এখনও সাত সাগর তের নদী পাড়ি দেয়ার সমান। এই অসাধ্য সাধনের পথে ডিজিটাল সেতু তৈরি করল বাংলা ওসিআর পুঁথি, বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনাইজার। আবার বাংলাসাহিত্য ও জীবনগাঁথা রচনার সবচেয়ে পুরনো মাধ্যমও পুঁথি। এই দুই পুঁথির মধ্যে রয়েছে একটি সমান্তরাল সম্পর্ক। কেননা, বাংলা ওসিআরের মাধ্যমে পুরনো সেই পুঁথি থেকে শুরু করে সব ধরনের ডকুমেন্ট ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ ও সম্পাদনযোগ্য করা যায়।
পুঁথির ক্যারিশমা
বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’র মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নতুন-পুরনো বই, নথি ডিজিটালাইজড করা যাবে। এতে এসব বই, নথি একেবারে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। বই, নথি, কাগজের সত্মূপ থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে কোনো তথ্য খুঁজে বের করতে হবে না। ওয়েবে থাকলে সার্চ দিলেই সব তথ্য পাওয়া যাবে। এ ছাড়া অনলাইন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় বাংলা ওসিআর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ই-গভর্ন্যান্স ও কাগজ-ফাইলবিহীন যে অফিসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, সেখানেও ভূমিকা রাখতে পারবে বাংলা ওসিআর। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আগের সব ফাইল ডিজিটাল ফরম্যাটে ওয়েব/সার্ভার কিংবা কমপিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করা যাবে। এই মুহূর্তে ‘পুঁথি’ উইন্ডোজের সব ভার্সন সাপোর্ট করে। পরবর্তী সফটওয়্যারটি আপগ্রেডের মাধ্যমে সব অপারেটিং সিস্টেমে সাপোর্ট করে ইতোমধ্যেই সেই কাজও শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই সফটওয়্যারটি সিম্বল সাপোর্ট করে, তবে আরও উন্নয়নের পর টেবিল (কলাম, রো সংবলিত) সাপোর্ট করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নির্মাতারা। তাদের মতে, বাংলাভাষায় লিখিত সব কনটেন্ট ডিজিটালের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে টিম ইঞ্জিনের তৈরি পুঁথি ওসিআর অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। এতে সংরক্ষণ করা যাবে ১৮৭৪ সাল থেকে ব্যবহৃত নতুন-পুরনো বইয়ের সব ধরনের তথ্য। গণগ্রন্থাগারকে খুব সহজেই অনলাইনে নিয়ে আসার একটি বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান যেমন সংবাদপত্র শুধু ডকুমেন্টের ইমেজ ফরম্যাটটি ওয়েবে আপ করে দেয়। গবেষণা বা অন্য প্রয়োজনে কোনো তথ্য সার্চ দিলে ওই ইমেজ ফরম্যাট থেকে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। ওসিআর অপটিক্যালি ক্যারেক্টারকে রিড করে পাঠককে এই তথ্যের সন্ধান দেবে নিমেষেই। এনবিআর, আদালত, ব্যাংক, জমির নিবন্ধন অফিস- এ ধরনের অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রাত্যহিক দাফতরিক দালিলিক কার্যক্রম সম্পাদন করতে পুরনো ডকুমেন্ট কমপিউটার থেকে সহজেই সার্চ করতে সক্ষম হবে। ডকুমেন্ট সার্চ করতে আর কোড নম্বরের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ডকুমেন্টের ইমেজকে ওয়ার্ডে কনভার্ট করে অথবা সরাসরি ইমেজ থেকে রিড করে আউটপুট বের করা যাবে। ওসিআর থেকে সুবিধা নিতে পারবেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও। কেননা, ওসিআর ব্যবহার করে পুরনো বা নতুন বইকে ব্রেইল বইয়ে রূপান্তর খুব সহজেই করা সম্ভব। অডিও বুক করাও সহজতর হবে। বইটি স্ক্যান করেও করা যায়, তবে টেক্সট এডিট করতে গেলে ওসিআর তাকে সাহায্য করবে। তাই বাংলাসাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো মাধ্যমটির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রথম বাংলা ওসিআরের নামকরণ করা হয়েছে ‘পুঁথি’।
শুরুর কথা
এই গৌরবের কাজ শুরু হয় আরও তিন বছর আগে। প্রথম এক বছর গেছে শুধু মৌলিক গবেষণার কাজে। এরপর দুই বছর ধরে চলেছে ডেভেলপমেন্টের কাজ। অবশেষে ৩০ জনের গবেষণা ও উন্নয়ন দলের নিরন্তর পরিশ্রমের ফসল এখন ঘরে উঠেছে বলে জানিয়েছেন টিম ইঞ্জিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকা। তিনি বলেন, আমাদের অনলাইন লাইব্রেরি ‘অ্যানসেস্টর’ তৈরি করতে গিয়ে বাংলা ওসিআরের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এটা ২০১০ সালের কথা। তখন আমরা পৃথিবীর প্রায় আশি হাজার বিভিন্ন রিসোর্সের বইকে একত্রিত করি। কিন্তু বাংলায় সেটা করতে গিয়ে দেখলাম ওসিআর ছাড়া সম্ভব নয়। তাই আমরা এটি নিয়ে গবেষণা ও নানা খোঁজখবর শুরু করলাম। এরপর ২০১২ সালে টেক্সট টু স্পিচ, ওসিআর এবং বাংলা ডিজিটাল অভিধান করপাস তৈরি করতে নিজেরাই কাজ শুরু করি। আশা করছি, এ বছরই করপাসও আলোর মুখ দেখবে। এদিকে গত ১৫ আগস্ট ওয়েবে (puthiocr.com) সীমিত আকারে বিশ্বের প্রথম বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’ সেবাটির সাথে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেই। আমাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে সেখানে স্ক্যান করা বাংলা ছাপা অক্ষরের কোনো ডকুমেন্ট আপলোড করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সরকারি অনুদান পেলে পুঁথির একটি সংস্করণ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার কথাও জানালেন হিমিকা। তিনি বলেন, ফ্রি সংস্করণে শতাধিক ফন্টের মধ্যে ১০টির মতো ফন্ট রয়েছে। আর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স সফটওয়্যার কিনতে হবে। প্রকল্পের আওতায় পুঁথি সফটওয়্যারটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। পুঁথির সক্ষমতা বিষয়ে হিমিকা আরও জানান, এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আগের সব ফাইল ডিজিটাল ফরম্যাটে হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া অনলাইন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় বাংলা ওসিআর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এটি মাত্র ৪ সেকেন্ডে বইয়ের একটি পাতাকে ডিজিটালাইজ এবং এডিটেবল করতে পারে এবং মূল টেক্সটের শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি শব্দ নির্ভুলভাবে প্রদর্শন করতে সক্ষম। নিজস্ব ইঞ্জিন ‘বাংলা ইঞ্জিন’-এ তৈরি এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে হাতে লেখা, স্ক্যান করা, টাইপ করা লেখাকে মেশিনে পড়া ও সম্পাদনা করার মতো করে রূপান্তর করা যায়। এটি ব্যবহার করে নাম দিয়েই খোঁজা যাবে সব ধরনের বাংলা ডকুমেন্ট। বাঙালি সভ্যতা ও হাজার বছরের বিলুপ্তপ্রায় বাংলাসাহিত্য সংরক্ষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো এই ২৫ মেগাবাইট সাইজের সফটওয়্যারটি দিয়ে।
কারিগরদের কথা
বিশ্বে প্রায় ৮০টি ভাষার ওসিআর থাকলেও উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে বাংলা ওসিআর তৈরি করেছে ‘টিম ইঞ্জিন’। টিম ইঞ্জিন একটি সোশ্যাল গুড কোম্পানি। সামাজিক কল্যাণ ও মুনাফা দুই-ই নিশ্চিত হয়- এমন সব প্রকল্প নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত তথ্য তৈরি ও সরবরাহ এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য তিনটি ভিন্ন প্রকল্প নিয়ে এখন কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম দুটি টেক্সট টু স্পিচ এবং বাংলা ওসিআরের কাজ শেষ হলেও এখন এই তরুণ দলটি ব্যস্ত রয়েছে ‘বাংলা করপাস’ তৈরির কাজ নিয়ে। টিম ইঞ্জিনের আরএনডি বিভাগের প্রধানের সহযোগিতায় বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার তৈরির প্রধান আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেছেন এসএম আল আমিন (সম্রাট)। মাসুদ রশিদের নেতৃত্বে এসব সফটওয়্যার তৈরির কাজে সহযোগিতা করেন ফয়সাল, মোনা, সাজ্জাদসহ ৩০ জন। এদের মধ্যে রয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আশিকুর রহমান অমিত। আগামীতে এই পুঁথি যেন মোবাইল ফোনেও ব্যবহার করা যায় সেজন্য অ্যান্ড্রয়িড ও আইওএস প্লাটফর্মে অ্যাপ্লিকেশন তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে টিম ইঞ্জিন, জানালেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকা। গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে রাত-দিন ধানমন্ডির একটি বাড়ির নিচতলায় কাজ করছেন এই দলের সদস্যরা।
পুঁথি ব্যবহার
সীমিত পরিসরে ওসিআর ‘পুঁথি’ অনলাইনে বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে। তবে পেশাদার বা বাণিজ্যিক কাজের জন্য সফটওয়্যারটি সংগ্রহ করে পিসিতে ইনস্টল করার পর রান করে ব্যবহার করা যাবে। অনলাইনে ওসিআর করতে চাইলে পুঁথির ওয়েবসাইটে ডকুমেন্ট আপলোড করে ওসিআর করা যাবে। প্রাথমিকভাবে মোট পাঁচটি প্যাকেজে পুঁথি বাজারে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানা গেছে। টিম ইঞ্জিন সূত্র জানিয়েছে, প্যাকেজগুলোর মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ফন্ট সংবলিত বেসিক প্যাকেজ থাকবে। পাশাপাশি একটি হাই-এন্ড প্যাকেজ বাজারে থাকবে, যা শতাধিক ফন্ট কমপ্যাটিবল হবে এবং এর প্রসেসিং স্পিড হবে দ্রুততর। এ ছাড়া বিশেষ কোনো প্রজেক্টের জন্য ডেডিকেটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজও থাকবে। অচিরেই মোবাইল অ্যাপ হিসেবেও বাংলা ওসিআর বাজারে নিয়ে আসা হবে।
ব্রাত্যজনের কথা
৭ আগস্ট রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘পুঁথি’র পরিচিতি অনুষ্ঠান। অনষ্ঠানে ‘পুঁথি’কে বাংলাভাষার মাইলফলক উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে পুঁথির মতো ছোট ছোট সফলতা বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে। আর এভাবে বাংলাদেশ তার কাঙিক্ষত ডিজিটালাইজেশনে পৌঁছাবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, হিন্দি ভাষার ওসিআর এখনও হয়নি। ৩৭তম দেশ হিসেবে আমরা তা করে দেখালাম। অবশ্যই এটি গর্বের এবং আনন্দের। এই অর্জন ডিজিটাল বাংলাদেশের, এ দেশের তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমীদের স্বাক্ষর বহন করে।
আর বাংলাদেশ কমপিউটার সমিতির (বিসিএস) সাবেক সভাপতি মোস্তাফা জববার বলেন, কমপিউটিংয়ে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা যে চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বেশি মোকাবেলা করছিলাম তা হচ্ছে অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিডার পাওয়া। ওসিআর ‘পুঁথি’ বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই অনেক বড় ঘটনা। আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য এবং ১৭৭৮ সালের পরবর্তী মুদ্রিত বাংলা বিষয়বস্ত্তকে যদি সচল-সজীব ও ডিজিটাল যুগের মাঝে রাখতে চাই, তবে এই বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’ একটি বড় হাতিয়ার। কিন্তু এই কাজটির মূল্যায়ন করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই মেধাস্বত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু আমি শুনে দুঃখিত হয়েছি, গোড়াতেই হিমিকাকে তার সোর্সকোডসহ ‘পুঁথি’ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কাছে বেঁচে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তবে হিমিকা তাতে রাজি না হয়ে একটি সাহসী কাজ করেছে। একই সাথে ‘পুঁথি’ বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সামনে মেধাজাত পণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে। এর পাশাপাশি বাংলাভাষা ও লিপিকে কেন্দ্র করে সরকারের কর্মপ্রচেষ্টাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যারা মনে করেন বাংলাভাষা শুধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখার জন্য এবং রোমান কিবোর্ড বা রোমান হরফ দিয়ে এসএমএসের মতো করে বাংলা লিখতে পারলেই ডিজিটাল যুগের বাংলাভাষার সব চাহিদা পূরণ হলো, তাদের আমার বলার কিছু নেই। ওসিআর বা বাংলা হরফমালা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। ইন্টারনেটে মাইক্রোসফটের বাংলা হরফ বৃন্দা হরফ ব্যবহার করেই যারা তুষ্ট, তাদেরও এই বিষয়ে মাথাব্যথার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ১৭৭৮ সালে হলহ্যাডের বাংলা ব্যাকরণের মুদ্রণ, পঞ্চানন কর্মকারের ছেনিকাটা হরফ, উইলকিন্সের ডিজাইন, বাংলা সীসার হরফ, বাংলা লাইনো-মনো, ফটোটাইপসেটার, ফিয়োনা রসের বাংলা হরফমালা এবং কমপিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের হরফমালার সাথে ওসিআরের সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক আছে ৩৫ কোটি বাংলা ভাষাভাষীর হাতের লেখার সাথে। অহমিয়া বা পূর্ব ভারতীয় ভাষাগুলোর কথাই বা ভুলে যাই কেন?
আমাদের বর্তমানের হাতের লেখা, পুঁথির হস্তলিপি, প্রাচীন বাংলার অক্ষরসমষ্টিসহ বাংলা মুদ্রণের সাথে যুক্ত সব ধরনের টাইপোগ্রাফির সাথে এর সম্পর্ক। এর সাথে সম্পর্ক বাংলা বর্ণমালার বিভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্য, যুক্তাক্ষর গঠনের পদ্ধতি, পাঠ্যবইয়ের স্পষ্টীকরণ, সীসার হরফের বৈচিত্র্য ও আসকি-ইউনিকোড ফন্টগুলোর যাবতীয় বৈচিত্র্য।
মোস্তাফা জববার বলেন, সম্ভবত হিমিকা, প্রান্ত, সম্রাট ও তাদের ৩০ জনের একটি বাহিনী এবং বাংলা ওসিআর তৈরির সাথে যুক্ত ও জড়িতরাই প্রথম অনুভব করেন, বাংলা লিপি ও তার বৈচিত্র্য কত গবেষণার দাবি রাখে। কেউ কেউ হয়তো এমনটি ভেবেও অবাক হয়েছেন, এ-কার, ও-কার, ঔ-কারের কখন মাত্রা থাকে বা কখন থাকে না। একই সাথে কেউ হয়তো এটি ভেবেও অবাক হবেন, আকারও অন্তত দুই ধরনের হয়। শব্দের মাঝখানের আ-কার ও শেষের আ-কার যে একরকম নয়, এটি কয়জন বাংলা ভাষাভাষী জানেন। একইভাবে কয়জন বলতে পারেন- লাইনো, লুডলো, মনো-লাইনো, আসকি, ইউনিকোড এসব পদ্ধতির জন্য বাংলা লিপির কত রূপ বদলে যায়। কয়জন বলতে পারেন- কেমন করে যুক্তাক্ষরগুলো পাশাপাশি বসে নাকি ওপর-নিচ বসে। কখন অর্ধবর্ণ দিয়ে যুক্তাক্ষর তৈরি হয় বা কখন টাইপরাইটারের মতো বাংলা হরফ হয়। অনেকেই হয়তো অবাক হন, বাংলায় কেন পেট কাটা ব, পেটকাটা র আর লী বর্ণটি রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
আমি ধারণা করি, যারা ওসিআর বানিয়েছেন বা বানানোর চেষ্টা করেছেন তাদের কাছে এসব নানা প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে। আমি এখনও টিম ইঞ্জিনের পুঁথি ওসিআরটি কার্যক্ষেত্রে দেখিনি। শুধু মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে দেখেছি। কাজ করতে পারলেই এর ভালো-মন্দ বলতে পারব। তবে আমি এটুকু বলতে পারব, হাজার বছরের বাংলাসাহিত্যের পাশাপাশি ২৩৬ বছরের বাংলা মুদ্রণের ইতিহাসে ওসিআর একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। ১৯৮৭ সালে বাংলা পত্রিকা প্রকাশ এবং ১৯৮৮ সালে বিজয় কিবোর্ড প্রকাশ করার পর বাংলাভাষার এটি একটি নতুন মাইলফলক
ফিডব্যাক : netdut@gmail.com

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৪ - সেপ্টেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস
অনুরূপ লেখা