Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:১৯৭
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৬ - নভেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
কমপিউটার
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস
১৭৮৪ সালে সূচিত প্রথম শিল্পবিপ্লব, ১৮৭০ সালে সূচিত দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব, ১৯৬৯ সালে সূচিত তৃতীয় শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে এই মুহূর্তে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। আর এই আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি হবে সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস। এই সিস্টেমস গড়ে উঠছে ফিউশন অব টেকনোলজিস বা প্রযুক্তির সংমিশ্রণে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকছে রোবটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস, থিডি প্রিন্টিং, ন্যানোটেকনোলজি বায়োটেকনোলজি ইত্যাদি। এ বিপ্লব আমাদের প্রতিদিনের জীবন-যাপনে আনবে অভাবনীয় এক পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকে তৈরি করতে না পারলে আমরা সব দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ব। এই আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিস্তারিত নিয়ে তৈরি হয়েছে এই প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।
আমরা এখন দাঁড়িয়ে নতুন এক প্রাযুক্তিক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। এই বিপ্লব আমূল পরিবর্তন আনবে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের ধরন-ধারণে, কাজে-কর্মে ও আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কে। এর পরিধি, সুযোগ ও জটিলতা এবং পরিবর্তনধারা হবে এমন, যা মানবজাতি এর আগে কখনও দেখেনি। আমরা এখনও জানি না এই বিপ্লব মানবজাতির সামনে কী অভাবনীয় সব বিষয়-আশয় উদঘাটন করবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- এই বিপ্লব মোকাবেলা করতে হবে সমন্বিত ও ব্যাপকভাবে। আর এর সুফল সাফল্যের সাথে ঘরে তুলতে হলে এতে সংশ্লিষ্ট করতে হবে গোটা বিশ্বের সব অংশীজন (স্টেকহোল্ডার), সরকারি ও বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজকে।
আমরা জানি, প্রথম শিল্পবিপ্লবের শুরু ১৭৮৪ সালে। এই শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয় যান্ত্রিক উৎপাদনে বাষ্প ও পানিশক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয় ১৮৭০ সালে, ব্যাপক উৎপাদনে শ্রমবিভাজন ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে। তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের শুরু ১৯৬৯ সালে ইলেকট্রনিকস ও আইটির ব্যবহার এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের মাধ্যমে। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এখন ঘটতে যাচ্ছে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া ডিজিটাল বিপ্লব তথা তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ওপর দাঁড়িয়ে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সূচিত হতে যাচ্ছে ফিউশন অব টেকনোলজিস তথা প্রযুক্তিগুলোর সংমিশ্রণের মাধ্যমে। আর এসব প্রযুক্তি হবে ফিজিক্যাল, ডিজিটাল ও বায়োলজিক্যাল জগতের। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস ও ক্লাউড কমপিউটিং। মোটামুটিভাবে ‘সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস’কেই বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনাকারী হিসেবে। সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমকেন্দ্রিক এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে অভিহিত করা হচ্ছে বিভিন্ন নামে- Industry 4.0, Industrie 4.0 or the fourth industrial revolution। আর বলা যায়, এটি অটোমেশন ও ম্যানুফ্যাকচারিং টেকনোলজির বর্তমান প্রবণতা।
আজকের দিনের যে পরিবর্তনধারা, তাকে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবকে নিছক দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে উস্থাপন করা যাবে না। এর তিনটি দিক- গতি (ভেলোসিটি), সুযোগ (স্কোপ) ও সিস্টেমের প্রভাব (সিস্টেমস ইমপেক্ট)। ফলে তা উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজন চতুর্থ আরেক শিল্পবিপ্লবের। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পথ করে নেয়ার গতি ইতিহাসে অভূতপূর্ব। যখন আগের শিল্পবিপ্লবগুলোর সাথে তুলনা করা হবে, তখন দেখা যাবে চতুর্থটি বিকশিত হচ্ছে সরলরৈখিকভাবে না হয়ে বরং গুণিতকভাবে। অধিকন্তু এটি প্রতিটি দেশের প্রতিটি শিল্পকে ব্যাহত করছে। আর এই পরিবর্তনের পরিধি ও গভীরতা গোটা উৎপাদন ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনে (প্রডাকশন, ম্যানেজমেন্ট, গভর্ন্যান্স) এক বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত করছে।
এমনটিই সম্ভাবনা- মোবাইল ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত শত শত কোটি মানুষের মোবাইল ডিভাইসগুলোর থাকবে অভূতপূর্ব অসীম প্রসেসিং পাওয়ার, স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ও জ্ঞানসাগরে প্রবেশযোগ্যতা। আর আগামী দিনের নতুন নতুন প্রযুক্তিগুলো এই সম্ভাবনাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলবে। এই সম্ভাবনা বাড়বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস, অটোনোমাস ভেহিকল, থ্রিডি প্রিন্টিং, ন্যানোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, এনার্জি স্টোরেজ ও কোয়ান্টাম কমপিউটিংয়ের মতো আরও নানা ক্ষক্ষত্রে। এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি আমাদের চারপাশে বেশুমার জায়গা দখল করে বসে আছে। সেলফ-ড্রাইভিং কার ও ড্রোন থেকে শুরু করে ভার্চু্যয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও সফটওয়্যারে পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সদর্প উপস্থিতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে আশাপ্রদ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এর কমপিউটিং পাওয়ার বেড়েছে এক্সপোন্যান্সিয়াল বা গুণিতক হারে। এর ফলে বিপুল পরিমাণে বেড়েছে ডাটা পাওয়ার পরিধিও। অপরদিকে ডিজিটাল ফেব্রিকেশন টেকনোলজির আমত্মঃক্রিয়া চলছে প্রতিদিনের জৈবিক জগতের সাথে। প্রকৌশলী, নকশাকার, স্থপতিরা একীভূত করছেন কমপিউটেশনাল ডিজাইন, অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং, ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, আমাদের দেহ, আমাদের ভোগ্যপণ্য এবং এমনকি আমাদের বসবাসের ভবনকেও।
চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
এর আগের তিনটি বিপ্লবের মতোই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্বে আয়ের মাত্রা বাড়ানোর এবং বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের ক্ষক্ষত্রে। আজ পর্যন্ত এই বিপ্লব থেকে সবচেয়ে বেশি অর্জন করতে যারা সক্ষম হয়েছে, তারা হচ্ছে সেইসব ভোক্তা যাদের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। প্রযুক্তি সম্ভব করে তুলেছে নতুন পণ্য ও সেবার, যার মাধ্যমে বেড়েছে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের সক্ষমতা ও সন্তুষ্টি। ক্যাব ভাড়া করার অর্ডার দেয়া, ফ্লাইট বুকিং করা, কোনো পণ্য কেনা, অর্থ পরিশোধ, গান শোনা, সিনেমা দেখা, গেম খেলা- ইত্যাদি সবকিছুই এখন করা যায় দূর থেকেই তথা ঘরে বা অফিসে বসেই।
আগামী দিনগুলোতে প্রাযুক্তিক উদ্ভাবন সরবরাহের ক্ষক্ষত্রে আনবে বিস্ময়কর অগ্রগতি। এর মাধ্যমে অর্জিত হবে দীর্ঘমেয়াদী নানা অর্জন। দক্ষতায় ও পণ্য উৎপাদনে আসবে যুগান্তকারী অগ্রগতি। পরিবহন ও যোগাযোগ খরচ কমবে ব্যাপকভাবে। লজিস্টিক ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা হয়ে উঠবে অধিকতর কার্যকর। ব্যবসায়-বাণিজ্যেও খরচ নেমে আসবে প্রায় শূন্যের কোটায়। সবকিছু মিলে উন্মুক্ত করবে নয়া বাজার, যা এগিয়ে নিয়ে যাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে।
অর্থনীতিবিদ এরিক ব্রিনজলফসন ও অ্যান্ড্রু ম্যাকাফি উল্লেখ করেন- একই সাথে এই বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে আরও বড় ধরনের বৈষম্য। বিশেষ করে সম্ভাবনা রয়েছে এই বিপ্লব শ্রমবাজারকে তছনছ করে দিতে পারে। গোটা অর্থনীতিতে শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠবে অটোমেশন। শ্রমিকদের জায়গায় যন্ত্রের আগমনের মূলধনের আয় ও শ্রমিকদের আয়ের পার্থক্য আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে। অপরদিকে এমন সম্ভাবনাও আছে- টেকনোলজির মাধ্যমে শ্রমিকদের অপসারণ সামগ্রিকভাবে নিরাপদ হতে পারে ও আকর্ষণীয় চাকরি সংখ্যা বাড়তে পারে।
এই সময়ে আমরা বলতে পারছি না, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বাস্তবে কোন পরিস্থিতির জন্ম দেবে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, শেষ পর্যন্ত ফলটা দাঁড়াবে এই দুইয়ের সম্মিলিত এক রূপে। তা সত্ত্বেও এই দুই অর্থনীতিবিদ একটি বিষয়ে একমত- ভবিষ্যতে মূলধনের চেয়েও মেধা বেশি প্রতিনিধিত্ব করবে উৎপাদনে। এর ফলে উত্থান ঘটবে এমন একটি চাকরির বাজারের, যার চরিত্র হবে ‘কম দক্ষতা-কম বেতন’ এবং ‘বেশি দক্ষতা-বেশি বেতন’ (‘low-skill/low-pay’ and ‘high-skill/high-pay’)। এর ফলে দেখা দিতে পারে সামাজিক ক্ষক্ষাভ ও অস্থিরতা।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক উদ্বেগের বাইরে বৈষম্যের বিষয়টি হবে সবচেয়ে বড় ধরনের সামাজিক উদ্বেগের। এই বিপ্লবের উদ্ভাবন থেকে সবচেয়ে বড় ধরনের উপকারভোগী হবে ইনটেলেকচুয়াল ও ফিজিক্যাল ক্যাপিটেলের জোগানদাতারা। এদের মধ্যে আছে- ইনোভেটর, শেয়ারহোল্ডার ও ইনভেস্টরেরা। এর ফলে যারা মূলধনের ওপর নির্ভরশীল তাদের ও শ্রমিকদের মধ্যে সম্পদ বৈষম্য ব্যাপক বেড়ে যাবে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠীর আয়ে নেমে আসবে স্থবিরতা, এমনকি কমে যেতে পারে আয়ের হারও। একই সাথে কম শিক্ষক্ষত ও কম দক্ষ লোকের চাহিদা কমে যেতে পারে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে। চাকরির বাজারে উচ্চ ও নিচু স্তরের চাকুরেদের চাহিদা বাড়লেও কমবে মধ্যম স্তরের চাকুরেদের। এ থেকে বুঝা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের কাজ হারানোর ভয়ে ভীত। এরা ভীত এদের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে। সবচেয়ে বেশি ভীত মধ্যম শ্রেণির চাকুরেরা। তাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ব্যাপারে এরা অসন্তুষ্ট। তাদের শঙ্কা ‘উইনার-টেকস-অল’ ইকোনমি নিয়ে। অসন্তুষ্টি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে ডিজিটাল টেকনোলজির সর্বব্যাপিতা এবং ইনফরমেশন শেয়ারিংয়ের গতি-প্রকৃতির কারণে, বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফরমেশন সরবরাহের ধরন-ধারণের কারণে। বিশ্বের ৩০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সংযোগ গড়ে তোলা, শেখা, তথ্য বিনিময়ের জন্য এখন ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম। একটি আদর্শ দুনিয়ায় এসব মিথষ্ক্রিয়া, আমত্মঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া ও এক সাথে থাকার একটা সুযোগ সৃষ্টি করবে। তা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়া লাভবান করতে পারে গোষ্ঠীবিশেষকে।
ব্যবসায়ের ওপর এর প্রভাব
গ্লোবাল সিইও এবং ঊর্ধ্বতন বিজনেস এক্সিকিউটিভেরা আজ বলেন, উদ্ভাবনের গতির ত্বরণ ও ব্যাহত করার গতি উপলব্ধি করা সর্বোত্তম সংশ্লিষ্ট ও তথ্যসমৃদ্ধজনদের জন্যও বেশ কঠিন। অবশ্য সামগ্রিক শিল্পে সুস্পষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে- যেসব প্রযুক্তি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি নির্মাণ করে, সেসব প্রযুক্তির বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে ব্যবসায়ের ওপর। সরবরাহের ক্ষক্ষত্রে অনেক শিল্প খাত দেখতে পাচ্ছে, নতুন প্রযুক্তির সূচনার প্রয়োজন রয়েছে বর্তমান চাহিদা পুরোপুরি মোকাবেলায় সম্পূর্ণ নতুন উপায় বের করার জন্য এবং বিদ্যমান ইন্ডাস্ট্রি ভ্যালু চেইন উল্লেখযোগ্যভাবে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে নেয়ার জন্য। ব্যবসায়ে নানা বাধাবিঘ্ন আসছে গতিশীল প্রতিযোগীদের কাছ থেকেও। এরা প্রবেশ করেছে গবেষণা, উন্নয়ন, বিপণন, বিক্রির বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে। এর ফলে মান, গতি ও দামের ক্ষক্ষত্রে উন্নয়ন ঘটবে। অপরদিকে ডিমান্ড বা চাহিদার ক্ষক্ষত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কারণ, ক্রমবর্ধমান হারে স্বচ্ছতা, ভোক্তার সংশ্লিষ্টতা এবং ভোক্তার আচরণের নতুন ধরন কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করছে তাদের ডিজাইন, বাজার, পণ্য ও সেবা সরবরাহের ধাঁচ পাল্টে ফেলতে।
এ ক্ষক্ষত্রে একটি মুখ্য প্রবণতা হচ্ছে, বর্তমান শিল্পকাঠামোকে ভেঙে চাহিদা ও সরবরাহকে একীভূত করার জন্য টেকনোলজি-এনাবল্ড প্ল্যাটফরম তৈরি করা। এসব টেকনোলজি প্ল্যাটফরম স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজে ব্যবহারের উপযোগী। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় পণ্য ভোগ ও সেবার সম্পূর্ণ নতুন ধরনের উপায়। অধিকন্তু, এর ফলে কমে ব্যবসায়ের বাধা, কমে ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পদ সৃষ্টি। আর পাল্টে যায় শ্রমিকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজের পরিবেশ। এই নতুন প্ল্যাটফরম বিজনেস দ্রুত বহুগুণে বাড়ছে অনেক নতুন সেবার ক্ষক্ষত্রে- লন্ড্রি থেকে শুরু করে শপিং, প্রতিদিনের ঘর-গেরস্থালির টুকটাক কাজ থেকে পার্কিং এবং ম্যাসেজ থেকে পর্যটন পর্যন্ত।
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়- ব্যবসায়ের ওপর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের রয়েছে চারটি প্রধান প্রভাব- গ্রাহকদের প্রত্যাশার ওপর, পণ্য জোরদার করে তোলার ওপর, সহযোগিতামূলক উদ্ভাবনের ওপর এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর। ভোক্তা বা ব্যবসায়ের কথাই বলি, গ্রাহকেরা এখন ক্রমেই চলে আসছে অর্থনীতির কম্পনবিন্দুতে। আজ অর্থনীতির উন্নয়ন নির্ভর করছে কী করে গ্রাহকদের কাছে সেবা সরবরাহ করা হচ্ছে, তার ওপর। অধিকন্তু ভৌত পণ্য ও সেবা এখন আরও জোরদার করে তোলা যাবে ডিজিটাল সক্ষমতার মাধ্যমে, যা বাড়িয়ে তুলবে পণ্য ও সেবার দাম। নতুন প্রযুক্তি সম্পদকে তৈরি করে আরও টেকসই ও স্থিতিস্থাপক। অপরদিকে ডাটা ও অ্যানালাইটিকস পাল্টে দিচ্ছে এর রক্ষণাবেক্ষণকেও। ডাটা অ্যানালাইটিকের মাধ্যমে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতার জগত, ডাটাবেজ সার্ভিস ও অ্যাসেট পারফরম্যান্সের জন্য দরকার নতুন ধরনের সহযোগিতা। আর গ্লোবাল প্ল্যাটফরম ও অন্যান্য বিজনেস মডেলের উদ্ভবের চূড়ান্ত অর্থ হচ্ছে- মেধা, সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
সামগ্রিকভাবে সিম্পল ডিজিটালাইজেশন (তৃতীয় শিল্পবিপ্লব) থেকে উদ্ভাবনভিত্তিক একীভূত প্রযুক্তিতে (চতুর্থর্ শিল্পবিপ্লব) উত্তরণ ঘটাতে কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করছে, তাদের ব্যবসায়ে অবলম্বিত উপায়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে। সারকথা হচ্ছে- ব্যবসায়ী নেতারা ও জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদেরকে বুঝতে হবে পরিবর্তিত পরিবেশ। আর অব্যাহতভাবে লেগে থাকতে হবে উদ্ভাবনের কাজে।
সরকারের ওপর প্রভাব
যেহেতু ফিজিক্যাল, ডিজিটাল ও বায়োলজিক্যাল জগৎ অব্যাহতভাবে একবিন্দুতে এসে মিলিত হচ্ছে, নয়া প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফরমগুলোও ক্রমবর্ধমান হারে নাগরিকেরা সংশ্লিষ্ট হবে সরকারের সাথে, জানাবে তাদের মতামত, সমন্বিত করবে নিজেদের উদ্যোগ-আয়োজন এবং এমনকি নাগরিকেরা সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর তত্ত্বাবধানকে এড়িয়ে চলবে। একই সাথে সরকার জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য অর্জন করবে নতুন নতুন প্রাযুক্তিক শক্তি বা সক্ষমতা। আর এর ভিত্তি হবে সর্বব্যাপী সার্ভিল্যান্স সিস্টেম বা নজরদারি ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বিষয়টি। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্টতা ও নীতি-নির্ধারণী উদ্যোগ পরিবর্তনের জন্য ক্রমবর্ধমান চাপ। কেননা, প্রতিযোগিতার নতুন নতুন উৎসের কারণে সরকারের নীতি-নির্ধারণী ভূমিকা কমে আসবে। আর নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্ভব করে তুলবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও পুনর্বণ্টনকে।
শেষ পর্যন্ত সরকার ব্যবস্থার ও সরকারি কর্তৃপক্ষ নাগরিকের ইচ্ছার সাথে কতটুকু খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা রাখে, তার ওপর নির্ভর করবে সরকারের টিকে থাকার বিষয়টি। এরা যদি তাদের স্বচ্ছতার দক্ষতার মান সাপেক্ষক্ষ বিশ্বের এলোপাতাড়ি পরিবর্তনকে গ্রহণ করার সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে, তবেই এরা প্রতিযোগিতায় সবকিছু মোকাবেলা করে টিকে থাকতে পারবে। সেভাবে বিকশিত হতে না পারলে সরকার ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে বেশি থেকে বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হবে, বিশেষ করে এটি সত্যি রেগুলেশন বা বিধি-বিধানের ক্ষক্ষত্রে। বর্তমান সরকারি নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবেরর পাশাপাশি, যখন সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এবং এ ব্যাপারে যথাযথ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করার জন্য। পুরো প্রক্রিয়াটি ‘টপ ডাউন’ উদ্যোগ কঠোরভাবে অনুসরণ করে ডিজাইন করা হতো সরলরৈখিক ও কারিগরি করে তোলার জন্য। কিন্তু এখন আর এ ধরনের উদ্যোগ সম্ভব নয়। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্রুতগতি পরিবর্তন বিধায়ক ও বিধি-নিয়ন্ত্রকদের জন্য অভূতপূর্ব মাত্রায় চ্যালেঞ্জ সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এরা এখন বেশিরভাগ ক্ষক্ষত্রেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপারগ হয়ে পড়ছেন।
এখন একদিকে অব্যাহত সহযোগিতা জোগাতে হচ্ছে উদ্ভাবনের কাজে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার কী করে গ্রাহক ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। অ্যাজাইল গভর্ন্যান্স বা গতিশীল শাসনকে অবলম্বন করে বেসরকারি খাত সফটওয়্যার তৈরির মাধ্যমে ব্যবসায় পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছে। এর অর্থ রেগুলেটরদেরকেও অব্যাহতভাবে মানিয়ে নিতে হবে নতুন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে, নিজেদেরকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে যাতে করে তারা সত্যিকারভাবে বুঝতে পারে তারা কী নিয়ন্ত্রণ করছেন বা করতে যাচ্ছেন। তা করতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য প্রয়োজন হবে সুশীল ও ব্যবসায়ী সমাজের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রাখা।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রকৃতির ওপরেও। এই প্রভাব থাকবে সম্ভাবনা ও দ্বন্দ্বের প্রকৃতি বা ধরন-ধারণের ওপরও। যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ইতিহাস হচ্ছে প্রাযুক্তিক উদ্ভাবনেরই ইতিহাস। আজকের দিনেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকৃতিগতভাবে হাইব্রিড বা সঙ্কর। এতে মিশে আছে প্রচলিত যুদ্ধক্ষক্ষত্রের কৌশলের সাথে অরাষ্ট্রিক নায়কদের যুদ্ধের উপাদানগুলোও। কমব্যাটেন্ট ও নন-কমব্যাটেন্ট এবং ভায়োলেন্ট ও নন-ভায়োলেন্ট (ভাবুন সাইবার যুদ্ধের কথা) যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যেকার পার্থক্য যন্ত্রণাদায়কভাবে হয়ে উঠছে দুর্বোধ্য।
যেহেতু এই প্রক্রিয়া চলমান এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি, যেমন- অটোনোমাস বা বায়োলজিক্যাল ওয়েপন ব্যবহার সহজতর হয়ে উঠছে, তাই ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র্র্রগোষ্ঠী পর্যায়ে এমন সক্ষমতা আসবে, যা একটি রাষ্ট্রকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে দিতে পারে। এই নতুন ভঙ্গুরতা সৃষ্টি করছে নতুন নতুন ভীতির। কিন্তু একই সময়ে প্রযুক্তি অগ্রগতির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে ভায়োলেন্সের মাত্রা কমিয়ে আনার। নতুন ধরনের প্রটেকশন মোড তৈরি করে তা সম্ভব। যেমন- টার্গেট নির্ধারণকে আরও যথাযথকরণের মাধ্যমে তা সম্ভব হতে পারে।
মানুষের ওপর প্রভাব
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুধু আমাদের কাজেই পরিবর্তন আনবে না, একই সাথে এর পরিবর্তনে প্রভাব পড়বে মানুষের ওপরেও। এটির বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের সত্তা বা আইডেনটিটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর ওপর- আমাদের প্রাইভেসি, আমাদের মালিকানার ধরন-ধারণ, আমাদের ভোগের ধরন, দক্ষতার চর্চা, কাজ ও বিশ্রামের সময়, কর্মজীবন গঠন, মানুষের সাথে সাক্ষাতের ধরন, মানুষের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি নানাকিছুর ওপর। এই চতুর্থ বিপ্লব এরই মধ্যে পরিবর্তন এনেছে আমাদের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে। এর তালিকা অন্তহীন, যা আমরা শুধু কল্পনা করতে পারি মাত্র। যারা শুরু থেকেই প্রবলভাবে প্রযুক্তি প্রয়োগে আগ্রহী, তারা মাঝে মাঝে অবাক হন- অব্যাহতভাবে আমাদের জীবনে সমন্বিত হওয়া প্রযুক্তি আমাদের কিছু উৎকর্ষ মানব সক্ষমতাকে, যেমন- সমবেদনা, সহযোগিতা ইত্যাদিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এ ক্ষক্ষত্রে স্মার্টফোনের সাথে আমাদের সম্পর্ক একটি উদাহরণ।
নতুন তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মানুষের প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। আমরা সহজাতভাবেই বুঝতে পারি, কেনো এই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অপরিহার্য। তারপরেও নতুন কানেকটিভিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এই ইনফরমেশন ট্র্যাকিং ও শেয়ারিং। বিতর্ক উঠেছে এ সম্পর্কিত নানা মৌল সমসা নিয়ে। বলা হচ্ছে, এর ফলে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। আগামী বছরগুলোতে এই বিষয়টি জোরালোভাবে চলবে, সেই সাথে এ নিয়ে বিতর্কের তীব্রতা বাড়বে। একই বিপ্লব ঘটে চলেছে বায়োটেকনোলজি ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষক্ষত্রেও। এর ফলে আমাদেরকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে আমাদের নীতি-নৈতিকতার সীমা-পরিসীমা।
আগামীর নির্মাণ
টেকনোলজি ও এর সূত্রে আসা ডিজরাপশন বাইরে থেকে আসা কোনো নিয়ামক শক্তি নয়, যার ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এর উদ্ভব নির্দেশ করার জন্য আমরা সবাই দায়ী। একজন নাগরিক, ভোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবে সিদ্ধান্ত নেয়ার মধ্যেই এর উদ্ভব। অতএব এভাবে আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগ ও শক্তিকে কাজে লাগানো উচিত একটা অনুকূল ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষক্য্ে। আর সেই ভবিষ্যতের মাঝে প্রতিফলিত হবে আমাদের সবার অভিন্ন লক্ষ্য ও মূল্যবোধ।
তা সত্ত্বেও এ কাজটি করতে আমাদেরকে তৈরি করতে হবে একটি ব্যাপক ও বৈশ্বিকভাবে শেয়ার করা অভিমত। এর বিষয় হবে- কীভাবে টেকনোলজি প্রভাব ফেলছে আমাদের জীবনযাত্রা আর আমাদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানব পরিবেশিক জগতকে পাল্টে নতুন রূপ দেয়ার ক্ষক্ষত্রে। অতীতের কোনো সময়ই বড় ধরনের প্রতিশ্রুতিশীল বা ধ্বংসাত্মক ছিল না। আজকের দিনের সিদ্ধান্তপ্রণেতারা মাঝে মাঝেই প্রচলিত সরলরৈখিক চিন্তার ফাঁদে আটকা পড়েন। কিংবা তাদের পুরো মনোযোগ পড়ে থাকে নানা সঙ্কটের চাহিদা মেটাতে। ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য এখন তাদেরকে ভাবতে হবে ডিজরাপশন শক্তি মোকাবেলার জন্য উদ্ভাবনের পথ ধরে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।
সবশেষে আসে মানুষ ও মূল্যবোধের কথা। আমাদের নির্মাণ করতে হবে এমন এক ভবিষ্যৎ, যা উপকার বয়ে আনবে আমাদের সবার জন্য। আর এ কাজটি চলবে সব মানুষকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে। অবশ্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অবশ্যই আমাদের অনেক মানবিকতাতে আরও রোবটাইজ করতে পারে। এর মাধ্যমে মানুষকে বঞ্চিত করতে পারে হৃদয় ও মনের দিক থেকে। কিন্তু মানব-প্রকৃতির সর্বোত্তম অংশগুলোর (ক্রিয়েটিভিটি, এমপ্যাথি ও স্টিউয়ার্ডশিপ) পরিপূরক হিসেবে এটি মানবতাকে তুলে আনতে পারে নতুন সঙ্ঘবদ্ধ ও নৈতিক চেতনার পর্যায়ে, যার ভিত্তি হবে ‘শেয়ার্ড সেন্স অব ডেসটিনি’।
সৃষ্টি করছে আকর্ষণ
আমরা এখন প্রবেশ করতে যাচ্ছি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে, এই ধারণাটির প্রতি গোটা বিশ্বের মানুষ ক্রমেই আকর্ষিত হচ্ছে। এমনকি চলতি বছরের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’ অনুষ্ঠিত হয়েছে এই থিম বা ধারণার ওপর। ২০১৬ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফেরাম রিপোর্টে বলা হয়- ‘আজকে আমরা অবস্থান করছি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের শুরুর জায়গাটায়।’ রিপোর্টে আরও বলা হয়- ‘জেনেটিকস, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবটিকস, থ্রিডি প্রিন্টিং, ন্যানোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি ও এমনি আরও কিছু দিকের অগ্রগতি সামগ্রিকভাবে জোরদার করে তুলছে একে-অপরকে। এগুলো ভিত্তি নির্মাণ করবে একটি বিপ্লবের। এই বিপ্লব হবে আগের যেকোনো বিপ্লবের তুলনায় অধিকতর জোরালো ও অভূতপূর্ব।’
এই বিপ্লবের বিশিষ্ট্যতা বা পার্থক্যটা কোথায়? পার্থক্যটা হচ্ছে- এটি কোনো একক প্রযুক্তির ওপর প্রতিশ্রুতিশীল নয়। বরং এটি একসাথে করে নিয়ে আসছে নানা প্রযুক্তি, যা নাড়া দিতে পারে আমাদের পুরো অস্তিত্বের ওপর। এটি মানুষের কল্যাণের বিনিময়ে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনও নয়। এর অর্থ বিশ্ব সম্পদে অভাব থেকে প্রবৃদ্ধিকে আলাদা করা। সিগনিয়ার সিইও ম্যাগদা উইরজাইকা বলেন- ‘বিশ্বকে ডেমোক্র্যাটাইজ, ডিমনিটাইজ ও ডিম্যাটেরিয়েলাইজ করতে এসব প্রযুক্তির রয়েছে অপরিমেয় সম্ভাবনা। এগুলো একসাথে মিলে এই পৃথিবীটাকে করে তুলতে পারে আরও বিভিন্নমুখী, সুষ্ঠু ও নিরাপদ।’ এই মহিলা আরও উল্লেখ করেন- মানুষের চাহিদা মেটানোর উপকরণ সস্তা থেকে সস্তাতর হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে ৭০ শতাংশ খরচ হয় বাড়ি, পরিবহন, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি, শিক্ষা ও বিনিয়োগের পেছনে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এসব খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে। উইরজাইকা বলেন- ‘উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, স্কাইপি টেলিফোন করাকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছে। গুগল দখল করে নিয়েছে এনসাইক্লোপিডিয়ার স্থান। আর ইউবার অপসারণ করেছে নিজের জন্য প্রাইভেট কারের প্রয়োজনীয়তাকে। ক্যামেরা, ঘড়ি, অ্যালার্ম ঘড়ি, জিপিএস, স্টেরিও, চলচ্চিত্র, থিয়েটার ও এমনি কিছুর কাজ এখন একাই করে একটি স্মার্টফোন।’
ভবিষ্যতে সেলফ-ড্রাইভিং ইউবার কারের কারণে কারও নিজস্ব গাড়ি কেনার দরকার পড়বে না। এর ফলে মানুষ বেঁচে যাবে বড় ধরনের এক খরচ থেকে। কারণ তখন গাড়ির বীমা, মেরামত, পার্কিংয়ের জন্য খরচ করতে হবে না। একইভাবে জেনেটিক ও বায়োলজিক্যাল অগ্রগতির ফলে খাদ্য উৎপাদনের খরচ কমবে। জেনিটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন এরই মধ্যে বাস্তব রূপ ধারণ করেছে। বড় আকারে এর প্রয়োগের ফলে জমি, পানি ও জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার কমে আসবে। বর্তমানে কৃষিতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে এবং জমির অভাবও প্রকট। আরেকটি বিষয়ে মানুষের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। সেটি হচ্ছে ‘ক্লিন এনার্জি’। বিশ্ববাপী গত বছর শুধু এ শিল্প খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১৮ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। স্টোরেজ এখন আরও সস্তা ও কার্যকর হয়ে উঠছে। এখন আমরা প্রচুর শক্তি নিখরচায় সংগ্রহ করতে পারি সূর্য থেকে। উইরজাইকা বলেন, ‘এসব টেকনোলজি করপোরেটের ওপর প্রভাব ফেলছে গুণিতক হারে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সূচনা হতে ১০০ বছর সময় লাগেনি। এটি ঘটতে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য গতিতে।’
বিনিয়োগকারীদের জন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সামনে এনেছে সুযোগ ও ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবিভাগের অনুমিত হিসাব মতে- আজকের দিনে যে চাকরি আছে এর ৪০ শতাংশ থাকবে না আগামী ২০ বছরের মধ্যে। উল্টোদিকে বেসরকারি সমীক্ষা থেকে জানা যায়- আগামী ১০ বছরে মানুষ যে কাজ করবে তা এখনও উদ্ভাবনই হয়নি। বিনিয়োগকারীদের ভাবতে হবে দু’টি বিষয়- প্রথমত, আজকে এরা যে শিল্পে বা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছে, তা অদূর ভবিষ্যতে থাকবে কি না। বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এরা আর ফসিল জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করবে না। এরা মেনে নিয়েছে, পৃথিবী এসব জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অতএব এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কোনো অবকাশ নেই। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের ভাবতে হবে- চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি শিল্প খাতে বা কোম্পানির বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনা হবে কি না। বেশ কিছু কোম্পানি, যেমন- গুগল, আইবিএম, মাইক্রোসফট এরই মধ্যে অনেক বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আরও কয়েক ডজন কোম্পানি রয়েছে যেগুলো ততটা সুপরিচিত নয়, এগুলোও অপিরিমেয় সম্ভাবনাময়।
দক্ষক্ষণ আফ্রিকার বিনিয়োগকারীদের জন্য এই থিমের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা খুবই কঠিন। সেখানে স্থানীয় বাজারের সুযোগ খুবই সীমিত। এদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজার চিহ্নিত করে প্রবেশ করা একটা কঠিন কাজ। সে কারণে এই ১ নভেম্বর থেকে চালু করা হচ্ছে ‘সিগনিয়া ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলিউশন গ্লোবাল ইক্যুইটি ফান্ড।’ উইরজাইকা বলেন, এই তহবিল কোনো নতুন কিংবা পরীক্ষামূলক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবে না। যেসব বড় কোম্পানির বাজার মূলধনায়ন ২৫ কোটি ডলারের বেশি, সেসব কোম্পানিতে তা বিনিয়োগ করা হবে।
মোট কথা
কেউ এই বিপ্লবকে বলেন ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’। কেউ বলেন ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’। কিন্তু এই বিপ্লবকে যে নামেই ডাকি, এটি হচ্ছে সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস, ইন্টারনেট অব থিংস ও ইন্টারনেট অব সিস্টেমস ইত্যাদির এক সম্মিলন। সংক্ষক্ষপে- এটি স্মার্ট ফ্যাক্টরির একটি ধারণা, যেখানে ওয়েব কানেকটিভিটির মাধ্যমে যন্ত্রগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলা হয় এবং যন্ত্রগুলোকে এমন একটি সিস্টেমের সাথে যুক্ত করা হয়, যা গোটা প্রডাকশন চেইন দেখে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৬ - নভেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস