Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > কেমন ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা চায় বাংলাদেশ
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: ইমদাদুল হক
মোট লেখা:৬০
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৬ - ডিসেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
ইনটারনেট
তথ্যসূত্র:
রির্পোট
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
কেমন ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা চায় বাংলাদেশ
ইন্টারনেট। বাধাহীন সাম্যবাদের এক জগত। যেখানে একক সার্বভৌমত্ব বলে কিছু নেই। প্রবেশাধিকার বিশেষ কারও জন্য এককভাবে সংরক্ষক্ষত নয়। সঙ্গত কারণে এই জগতে অভিবাসী হচ্ছেন মুটে-মজুর থেকে শুরু করে সরকার প্রধানেরাও। আছেন ব্যবসায়ী-রাজনীতিক। ধর্ম প্রচারক-শিক্ষক-চিকিৎসক। বাদ নেই ঘরকন্নারাও। এখানে এক অচ্ছেদ্য বাঁধনে জড়িয়ে আছেন জনে-জনে; প্রতি প্রাণে। এ যেনো জগতের ভেতর আরেক জগত। যেখানে নেই সীমান্তের কাঁটাতার। নেই ধনী-গরিব ফারাক; আশরাফ-আতরাফ ব্যবধান। আছে বিপুল তথ্যভা-ার। অপার সম্ভাবনা। ইন্টারনেট তাই আজ জিয়নকাঠির মতো। হাল সময়ের আলাদীনের ডিজিটাল প্রদীপ। এর যেমনটা আছে সম্মোহন ক্ষমতা, তেমনি আছে বিকর্ষণ ক্ষমতাও। সীমানাহীন এই মাধ্যমে আছে দুর্বার গতি। তেমনি মুহূর্তে টেনে আনে দুর্গতিও। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে কেমন ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা চায় বাংলাদেশ।
অংশীজনের মত
জনবিশ্লেষণে সম্ভাবনাময় তারুণ্যের দেশ বাংলাদেশ। ভার্চুয়াল আকাশে তাদের ডানাটাই সবচেয়ে বেশি প্রসারিত। অবশ্য তারুণ্যাধিক্য থাকলেও সব বয়সের মানুষই এখন এই জগতে অভিবাসী হয়ে উঠছেন। তারা এখানে বিচরণ করছেন ইচ্ছেমতো। সংখ্যা আর বৈচিত্র্যতার মতো এই জগতের অভিবাসীদের মধ্যেও অনুপ্রবেশ করতে শুরু করেছে দুষ্টজনেরা। প্রচ্ছন্নভাবে চলছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। ইন্টারনেট জগতের বদৌলতে আরব বসন্ত যেমন হয়েছে, তেমনি অমাবস্যাও নামছে মাঝে-মধ্যে। ভারসাম্যপূর্ণ ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার লক্ষক্ষ্য ৬-৯ ডিসেম্বর ‘ইন্টারনেটে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্যে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামে এ বিষয়ে মিলবে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। আর সেই রূপরেখা তৈরিতে অংশীজনের অভিমত গুরুত্ব পায় সবচেয়ে বেশি।
বিআইজিএফের মুক্ত বৈঠক
বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ২০ নভেম্বর প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (বিআইজিএফ) মুক্ত বৈঠক। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইন্টারনেট পরিচালনায় নীতি-অধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অংশীজনের মত জানতে দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের শুরুতেই বিআইজিএফের কর্মকৌশল ও আন্দোলনের ওপর তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল হক অনু। বাংলাদেশ বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষক্ষর চেয়ারম্যান আকরাম এইচ চৌধুরীর সঞ্চালনায় বৈঠকে বক্তব্য রাখেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসপিএবি) প্রেসিডেন্ট আমিনুল হাকিম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: হারুনুর রশিদ, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মাহদি আহমেদ, বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্কস ফর রেডি কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) সিইও বজলুর রহমান, বুয়েটের সিইসি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মু. সোহেল রাহমান, পিআইবির ডিরেক্টর জেনারেল শাহ মো: আলমগীর, টেলিকম অধিদফতরের এসডিই প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ কায়সার, দৃক আইসিটি কর্ণধার এসএম আলতাফ হোসেন, দৈনিক প্রথম আলোর ডেপুটি ফিচার এডিটর পলস্নব মোহাইমেন, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সভাপতি রাজিব আহমেদ, বিডিনগের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির এবং বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসক নুরুন্নবী চৌধুরী হাসিব বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন সোম কমিউনিকেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা হক রিনা, গিগাবাইট টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার খাজা মো: আনাস খান প্রমুখ। সভা আয়োজনে সহযোগিতা করে আইএসপিএবি, বিএনএনআরসি এবং নলেজ পার্টনার ছিল মাসিক কমপিউটার জগৎ।
শঙ্কার দোলাচলে
আলোচনায় কেমন হবে ইন্টারনেটের ব্যবস্থাপনা, কীভাবে সম্পাদিত হবে সবার জন্য ইন্টারনেট রূপকল্প, ব্যবস্থাপনার নামে আবার নিয়ন্ত্রণের খড়গ আরোপিত হয় কি না, ভূলুণ্ঠিত হয় কি না অংশীজনের অধিকার, বাড়বে না তো বৈষম্য, শেষতক নেট নিরপেক্ষতার কী হবে- ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে এমন নানা প্রশ্ন উঠে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইন্টারনেটকে খাদ্য ও শিক্ষার মতোই মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবিও এতে জোরেশোরে ওঠে। একই সাথে প্রান্তিক মানুষের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছানোর উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ঘুরে-ফিরে বারবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলাভাষায় পর্যাপ্ত কনটেন্ট তৈরির। ইন্টারনেট অর্থ যেনো ফেসবুক আর মেইল না হয়, সে বিষয়ে সচেতনতার বিষয়টিও উচ্চকিত হয়েছে সভায়। আলোচনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে অনলাইন ওয়েব পোর্টালের নীতিমালা প্রণয়ন ও দেশী প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেটভিত্তিক টিভি (আইপিটিভি) পরিচালনা করতে পারে, সে ব্যাপারে অনুমোদন দেয়ার দাবি জানান কয়েকজন বক্তা। সভায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সঠিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা করতে হলে দরকারি নীতিমালা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন সবার আগে। আলোচনার ফাঁকে শৃঙ্খলা আনয়নের নামে শৃঙ্খল গড়ে তোলার বিপক্ষক্ষ জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেন অংশীজনেরা। দাবি জানানো হয় নীতিমালায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় সমন্বয়ের। একই সাথে হালসময়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয়গুলো সামঞ্জস্য সাধনের। ইন্টারনেট যেনো গোষ্ঠী-সুবিধাভোগীদের করতলগত না হয়, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। ইন্টারনেট নিয়ে এর ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নেয়ার কথাও জোরেশোরে উচ্চারিত হয় সভায়। সভায় অংশ নেয়াদের প্রায়ই সরকার ও অংশীজনের শঙ্কার দোলাচলের মধ্যে মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমেই ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন।
অংশীজনের ভাবনায়
ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার রূপরেখা নির্ধারণী নিয়ে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভা সঞ্চালনার সময় বাংলাদেশ বরেন্দ্র উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আকরাম এইচ চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়। তাই ইন্টারনেটে যেনো জাতীয় নিরাপত্তা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্রভিত্তিক উস্কানি ও মানহানিকর বিষয় জায়গা না পায়- সে বিষয়ে আমাদেরকেই সোচ্চার হতে হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। এর মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্রত হতে হবে। ইন্টারনেট শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; জলবায়ুর পরিবর্তন, জমির উর্বরতা, পানির গভীরতা, শস্য ফলনে সহায়ক ইত্যাদি তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমও।
বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান বলেন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন করতে হলে আমাদেরকে এই প্রসার-বিকাশ ও ব্যবহারের ক্ষক্ষত্রে পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ইন্টারনেটবান্ধব অবকাঠামো ও এর মান, আইন, অর্থনীতি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। বক্তব্যে তিনি যত দ্রুত সম্ভব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সরকারের অধ্যাদেশের মধ্যে ভারসাম্য আনয়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। ‘প্রটেকশন অব দ্য পাবলিক অর্ডার’ নিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয় যেনো তাদের অবস্থান তুলে ধরার আহবান জানায়, সে বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্ব দেন এই প্রাজ্ঞ সমাজকর্মী। তিনি বলেন, ইন্টারনেটে একদিকে যেমন স্বাধীনতা ও অধিকার, অপরদিকে নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা রয়েছে। বিষয়টি খুব সরল নয়। তাই এ ক্ষক্ষত্রে আমাদের খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে। যেকোনো নীতি-বিধি তৈরি করার আগে
সংশ্লিষ্টদের অভিমত নিয়েই করতে হবে। সব ক্ষক্ষত্রেই ভারসাম্যাবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বুয়েটের কমপিউটার কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রাহমান ইন্টারনেট জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট তথ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে এক ছাতার নিচে আসার পরামর্শ দেন। গুরুত্বারোপ করেন অনলাইন কনটেন্টের বিষয়ে সাবধানতা ও সচেতনতার ওপর। অনলাইন শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স তৈরি করতে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়ারও পরামর্শ দেন এই শিক্ষক। তবে মোবাইল বা ট্যাবের মাধ্যমে শিশুশিক্ষার বিষয়টি আরও ভেবে দেখার প্রতি মত দেন তিনি। অ্যাকাডেমি, সরকার ও ইন্ডাস্ট্রি খাত- কেউ যেনো একাকী না চলে সমন্বিতভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে, সে জন্য সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার প্রতি আহবান জানান সোহেল রাহমান। তিনি
বলেন, সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোর মাধ্যমে ইন্টারনেটে যেকেউ ইচ্ছে-খুশি মতো তথ্য প্রকাশ করতে পারে। তাই স্পর্শকাতর তথ্য যাচাই করার বিষয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। নিরপেক্ষ প্রচারের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেটের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে ইক্যুইটি, অ্যাক্সেসিবিলিটি ও সিকিউরিটি বিষয়ে বুয়েট যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্ত্তত।
সভায় ‘ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা ও সরকার ব্যবস্থা এক নয়’ উল্লেখ করে এর আশীর্বাদের পাশাপাশি অভিশাপের বিষয়টিও আমলে আনার পরামর্শ দেন প্রকৌশলী খান মোহা. কায়সার। তার ভাষায়, ইন্টারনেটে বাংলা কনটেন্ট তৈরি না করে শুধু ওয়াইফাই হটস্পট করে নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেয়া হয়, তবে তা ব্রিটিশের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মতো হতে পারে। আবার নিয়ন্ত্রণের নামে কোনো মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া হলে তা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়গুলো আমাদের ভাবতে হবে। তিনি বলেন, ইন্টারনেট একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অপরদিকে এর অভিশাপও আছে। তাই আনুষঙ্গিক বিষয়ের উন্নয়ন না করে ‘ইন্টারনেট ফর অল’ সেস্নাগানটি যুৎসই হতে পারে না। এজন্য আমাদেরকে এখন ইন্টারনেটে বাংলা কনটেন্টের বিষয়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে। আর ইন্টারনেট অ্যাক্সেসিবিলিটি বাড়াতে ব্যান্ডউইডথের জোয়ারে ভেসে লাভ নেই। ওয়াইফাই হটস্পট বাড়ানোর চেয়ে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম কমাতে হবে। তাহলে ইন্টারনেটের নিরাপত্তাও বাড়বে।
বক্তব্যে প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পলিসির মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীতা তুলে ধরেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি আমিনুল হাকিম। তিনি দেশীয় উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। নীতিমালা প্রকাশের আগে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে আলোচনার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, অনেকেই এখন ফেসবুকে লাইভ করছে, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার চ্যাট করতে বাধা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি এই সেবা চালু করতে পারে না। কারণ এ ক্ষক্ষত্রে বিটিআরসির নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একইভাবে দেশে আইপিটিভি সম্প্রচারেও রয়েছে বিধিনিষেধের খড়গ। তাই নীতিমালায় এই সমন্বয়হীনতাগুলো দ্রুততম সময়ে সমাধান করা দরকার।
‘আইপিটিভি এখন নাগরিক জীবনে অন্যতম অনুষঙ্গ’ হিসেবে মত দেন দৃক আইসিটির প্রধান নির্বাহী আলতাফ হোসেন। মোবাইল নেটওয়ার্কের পাশাপাশি উচ্চগতির ফাইবার অপটিক লাইন প্রসারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। তিনি বলেন, দেশী প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেটভিত্তিক টিভি (আইপিটিভি) পরিচালনা করতে পারে, সে ব্যাপারে অনুমোদন দেয়া এখন সময়ের দাবি। শুধু মোবাইল নয়, আমাদের মনোযোগী হওয়া দরকার উচ্চগতির ফাইবার অপটিক সংযোগের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড সেবাকে শক্তিশালী করা। অবকাঠামো ও আইনি জটিলতাগুলো সহজতর করা। প্রযুক্তিসেবা পৌঁছানোর পথগুলো গতিশীল হতে সহায়তা করা। তিনি বলেন, এখন যদি কোথাও ভিডিও কনফারেন্স করতে হয় তবে দুই জায়গা থেকে অনুমতি নিতে হয়। অথচ দেশে ও দেশের বাইরে কিন্তু নির্দ্বিধায় স্কাইপে কনফারেন্স হচ্ছে।
ইন্টারনেট নিয়ে নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা প্রণয়ণে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে সভায় ই-ক্যাব সভাপতি রাজিব আহমেদ বলেন, সবার আগে আমাদের নজর দিতে হবে কোনো নীতিমালা যেন প্রযুক্তি বিকাশে বাধা সৃষ্টি না করে। আমাদের বুঝতে হবে ইন্টারনেট এখন শিক্ষার চেয়েও বড় মৌলিক অধিকার। কেননা ইন্টারনেট থাকলে বিনা পয়সায় তথ্য মেলে, প্রাইভেট টিউটরের কাছে না গিয়েও শেখা যায়, ব্যবসায় কাজে লাগে। তাই ইন্টারনেট-কে যেন নাগরিকের সবচেয়ে বড় মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে তিনি রাজশাহী নগরীকে ডিজিটাল সিটি হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আইজিএফ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সরকারের সহায়তা প্রত্যাশা করেন।
সভায় ‘প্রযুক্তির সাথে কোনো সেন্সরশিপ চলে না’ বলে সাফ জানিয়ে দেন দৈনিক প্রথম আলোর ডেপুটি ফিচার এডিটর পলস্নব মোহাইমেন। পৃথিবীজুড়ে ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে ক্রস বর্ডার সুবিধা গ্রহণে মনোযোগী হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনেই ব্রিফকেসের বদলে মানুষের হাতে জায়গা পেয়েছে ট্যাব। তাই ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে কোনো লাভ নেই। কেননা, একটা বন্ধ করলে আরেকটা উপায় বের হয়ে আসে। তাই প্রোপাগা-া রুখতে গিয়ে যেনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা না হয়, সে বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা একটি জুজুরবুড়ির ভয়। এই ভয় পেয়ে কোনো লাভ নেই। এ জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ইন্টারনেটে যাই করা হোক না কেনো তার ছাপ থাকবেই। তাই প্রচলিত আইনেই অপরাধীদের সাজা দেয়া যায়। এ সময় তিনি তরুণদের নিয়ে নীতিমালা তৈরির দাবি জানান।
বাংলা উইকিমিডিয়ার প্রশাসক নুরুন্নবী চৌধুরী হাসিব বলেন, ইন্টারনেট এখনও রাজধানীকেন্দ্রিক। সম্প্রতি দিনাজপুরে প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মেইলই পাঠাতে পারিনি। তাই ইন্টারনেট অধিকারকে সার্বজনীন করতে কনটেন্ট নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি এর সহজলভ্যতা ও গতির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।
শুধু অবকাঠামোর দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট না করে তার তদারকি, হালনাগাদকরণ এবং এর মাধ্যমে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে দেশের ইন্টারনেট অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার দাবি তোলেন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপারেটরস গ্রম্নপের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির। একই সাথে ইন্টারনেটে দেশের সুরক্ষার প্রতিও সর্বাধিক গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, ইন্টারনেট দুনিয়ায় ডটকম ৯০ শতাংশ সুরক্ষক্ষত হলেও আমাদের ডটবিডি ও ডটবাংলা মোটেই সুরক্ষক্ষত নয়। ভীষণরকম ভালনারেবল। তিনি আরও বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি নয়, তা দেখভাল করা ও এগিয়ে নেয়াটাই এখন বড় কাজ। এজন্য আমাদের কাজের ধারাবাহিকতা দরকার। বিটিসিএলকে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। নেট নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করা দরকার। বিশ্ব এখন ইন্টারনেট অব থিংসে এগিয়ে গেলেও ইন্টারনেট প্রটোকল সংস্করণ আইপিভি৬-এ আমাদের অবস্থান খুবই খারাপ। অথচ আমরা টেরাবাইট নিয়ে পড়ে আছি। আন্তর্জাতিক পরিম-লে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে জিএএতে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে আমাদের এসব বিষয়েও ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে ইন্টারনেট করপোরেশন ফর অ্যাসাইনড নেম অ্যান্ড নাম্বারর্স (আইক্যান) এর গভর্নমেন্ট অ্যাডভাইসরি কমিটি (গ্যাক) এ বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। সমান্তরালভাবে স্থানীয় সমস্যার বৈশ্বিক সমাধানে এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওন্যাল ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরামের (এপিআরআইজিএফ) সাহায্য গ্রহণের প্রতি গুরুত্বারোপ করে ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার ক্ষক্ষত্রে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সরকারি পর্যায়েও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
পিআইবির মহাপরিচালক শাহ মো: আলমগীর বলেন, ইন্টারনেট আমেরিকার হাতে বিকশিত হয়েছে। তারা এর বাণিজ্যিকীকরণও করে ফেলেছে। ফলে ইন্টারনেটের নিরাপত্তা যতটা না স্থানীয়, তারচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সমস্যা। আইসিটি আইনে গণমাধ্যমকর্মীদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার পরিষ্কার ধারণা নেই। আইসিটি আইন নিভৃতেই হয়েছে। এর ধারা সম্পর্কে আমরা জানতাম না। এই আইন প্রণয়নের সময় তথ্য মন্ত্রণালয় কিংবা পিআইবিকে অবহিত করা হয়নি। এটা কীভাবে হয়েছে আমার জানা নেই। তাই এই ফোরামের মাধ্যমে আমি ইন্টারনেট পরিচালনার জন্য জাতীয় কমিটি গঠনের দাবি করছি। এই কমিটি স্বাধীন হওয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেটকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, ডাক বিভাগ ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) একযোগে কাজ করতে হবে।
সবার অভিমত শুনে সভা শেষে বৈঠকের প্রধান অতিথি বিআইজিএফের চেয়ারপারসন ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, সাইবার ঝুঁকি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এটি মোকাবেলায় অংশীজনের অংশগ্রহণে প্রাযুক্তিক ও কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংবিধানের আলোকে আইন তৈরির মাধ্যমে এই জগতের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে সাইবার জগত সামরিকীকরণ না করার স্বার্থে আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামে দাবি তুলতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি বলেন, আশা করছি ২০১৭ সালের প্রথম ৬ মাসের মধ্যে দেশের সাইবার জগতকে নিরাপদ রাখতে দুটি আইন পাস করা হবে। সংবিধানে বর্ণিত মানুষের অধিকার সমুন্নত রেখেই এ আইন করা হবে। বিকাশমান সম্প্রচার নীতিমালা এগিয়ে নেয়া হবে। কেননা, ‘আইনের মশারির মধ্যে বসবাস করাটাই গণতন্ত্র।’
ইনু আরও বলেন, আইনগত ও প্রাযুক্তিক এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাই আজকে সাইবার জগতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তা মোকাবেলায় ইন্টারনেট নামের কাঁচের ঘর পরিচ্ছন্ন রাখতে ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনায় সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। অন্তর্ভুক্তি নীতির ভিত্তিতে সরকার একটি পরিচালনা পর্ষদ তৈরি করবে। এ ক্ষক্ষত্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইসিটি বিভাগ, বিটিআরসি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠনের অভিমতের প্রতি সমর্থন জানান তিনি।
খ্যাদ্যের পাশাপাশি ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার বিবেচনা করে তা রাষ্ট্রকেই মেটানোর দাবি জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ইন্টারনেট নিজেই একটি অর্থনীতি। এটি পৃথিবীকে একটি কাঁচের ঘরে এনে দিয়েছে। দিচ্ছে স্বচ্ছতা। তাই এই ঘরের শিশু-নারীদের লালন-পালনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। জাতিসংঘের সহযোগী সংগঠন হিসেবে বিআইজিএফ এই কাজ করে এলেও এটা মানার ক্ষক্ষত্রে রাষ্ট্রীয় কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এ বিষয়ে সরকারকে মাথা ঘামাতে হবে। মানবাধিকার কর্মীদেরও ভুলে গেলে চলবে না, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ইন্টারনেটে আইনের লঙ্ঘন করা হবে তাও মেনে নেয়া যায় না। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষক্ষত্রবিশেষে বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে। এসব বিষয়ে আমাদের মতপ্রকাশের জন্য আইক্যানের গভর্নমেন্ট অ্যাডভাইজরি কমিটিতে একজন প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে হবে। ইন্টারনেটের কনটেন্ট যেহেতু সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়, তাই এই খাতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় করে তুলব। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বিশেষ করে তথ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিসিএলের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে। হাসানুল হক ইনু বলেন, ইন্টারনেটের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা, আস্থা, প্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য ইন্টারনেটের তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্যের মান নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টারনেট অব থিংস ধারণায় সময়ের সাথে হালনাগাদ থাকতে আইপিভি৬ প্রটোকলবান্ধব পণ্য আমদানিতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। মন্ত্রী মনে করেন, প্রযুক্তির আধার ‘ইন্টারনেট’ এর সুব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই

প্রস্তাবনা
* ‘ইন্টারনেট’ নাগরিকের মৌলিক অধিকার
* ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনায় চাই জাতীয় কমিটি/স্বাধীন কমিশন
* ওয়েব কনটেন্টের দেখভালের দায়িত্ব দিতে হবে তথ্য মন্ত্রণালয়কে
* ওয়েব প্রকৌশল ও নকশার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বিটিআরসি ও আইসিটি বিভাগ
* ঠুঁটো জগন্নাথ থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে বিটিসিএলকে
* তুলে নিতে হবে দেশীয় আইপিটিভি ও আইপিফোন সেবা চালুতে অহেতুক বাধা
* ইন্টারনেটে ছাঁকনি দিয়ে বাধা সৃষ্টি না করে সচেতনতা বাড়াতে হবে
* কারিগরি সক্ষমতা দিয়েই অপরাধীদের মোকাবেলা করতে হবে
* ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইসিটি বিভাগ, বিটিআরসি, বিটিসিএল ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে আনতে হবে এক ছাতার নিচে
* ‘প্রটেকশন অব দ্য পাবলিক অর্ডার’ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান জানাবে প্রতিটি মন্ত্রণালয়


পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৬ - ডিসেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস