Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > তথ্যপ্রযুক্তি রফতানির লক্ষ্য পাঁচ নয় পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: মোস্তাফা জব্বার
মোট লেখা:১২৮
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৬ - নভেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
প্রযুক্তি ভাবনা
তথ্যসূত্র:
রির্পোট
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
তথ্যপ্রযুক্তি রফতানির লক্ষ্য পাঁচ নয় পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার
এটি এখন বাংলাদেশ সরকার ও দেশের বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রধান লক্ষ্য ও অঙ্গীকার যে, ২০১৮ সালে ১ বিলিয়ন ও ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার সময়কালে যা এই দেশটির স্বাধীনতারও ৫০ বছর পূর্ণ হবে, তখন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রফতানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বহুদিন আগে থেকেই এমন বড় একটা স্বপ্ন আমরা দেখে আসছি। সেই ’৯৭ সালে যখন রফতানি করার উপায় উদ্ভাবনে সেমিনার করি, এই স্বপ্ন তখন প্রকাশ্যে ঘোষণা করি আমরা। এরপর দিনে দিনে এই স্বপ্ন বড় হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর ২০১৬ সমাপ্ত হওয়া ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডেও এই অঙ্গীকার নানা স্তর থেকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আমরা সফটওয়্যার ও সেবা খাতের পক্ষ থেকেও এই অঙ্গীকারেরাংশ হয়েই আছি। দেশের মিডিয়া থেকে নীতিনির্ধারকদের মাঝে প্রসঙ্গটি শুধু কৌতূহলোউদ্দীপক নয়, বরং চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। বিশেষত রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংক যখন আমাদের ২০১৫-১৬ সালের রফতানি আয় মাত্র ১৫১.৯ মিলিয়ন ডলার বলে গণ্য করে, তখন আমাদের জন্য ১ বিলিয়নই হোক বা ৫ বিলিয়নই হোক, সেটি অর্জন করা যে প্রায় অসম্ভব তেমনটিই ধারণা করা হয়ে থাকে। চারপাশ থেকেই এমন একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, আমরা যেন কোনোভাবেই ১ বিলিয়ন বা ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি করতে পারব না। কিন্তু ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে যে, তারা উভয়েই আমাদের শিল্প খাতের মতোই বিশ্বাস করেন এমন একটি স্বপ্ন আমাদের বেসরকারি খাত অর্জন করতে সক্ষম। আমি এই খাতের বৃহত্তম বাণিজ্য সংগঠন বেসিসের সভাপতি হিসেবে বলতে পারি, আমাদের হিসাবটা ৫ বিলিয়ন নয়, বরং ৫০ বিলিয়নের। হিসাবটি আমার এই লেখা থেকে বুঝে নিতে পারেন।
কেন বা কেমন করে আমরা এই সফলতা অর্জন করতে পারব সেগুলো আমরা একটু তলিয়ে দেখতে পারি। অন্যদিকে এটিও আমাদের দেখা দরকার, এই অর্জনের জন্য সরকারের ও এই খাতের কোন কোন করণীয় রয়েছে।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক দুনিয়ার আউটসোর্সিং বাজারটি কত বড় তার দিকে। আমরা জেনেছি, ২০১৫ সালে বিশ্বজুড়ে আউটসোর্সিং বাজারের মূল্য ছিল ৮৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশী টাকায় যা প্রায় ৭ লাখ ১২ হাজার কোটি। তবে লক্ষণীয়, বিগত সময়ে এই বাজারের প্রবৃদ্ধি তেমন হয়নি। ২০১০ সাল থেকে যে চিত্রটি আমাদের সামনে আসে তা খুবই প্রণিধানযোগ্য। বিশ্ববাজারে আউটসোর্সিং আয় হিসাবটি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার অথরিটি এক্সিলারেন্স থেকে পাওয়া।
ওয়েবসাইট লিঙ্ক : http://www.accelerance.com/research/global-it-market-size-facts-and-figures
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের আউটসোর্সিং বাজারের বিকাশের জন্য ভিত্তিগত পরিবর্তনের সূচনা ঘটেছে। দেশের আউটসোর্সিং শিল্প ক্রমেই আরও পরিপক্ব হয়ে উঠছে, একই সাথে অনেকে দেশের বাইরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন। ভৌগোলিকগত দিক থেকে ৯০ শতাংশের বেশি আইটি খাতে ব্যয় হয় উত্তর আমেরিকা (৩৯.৩৩), পশ্চিম ইউরোপ (৩১.৭৪) এবং এশিয়া প্যাসিফিক (১৯.১৪)।
বর্তমানে বাংলাদেশের আউটসোর্সিং সেবার একটি বড় অংশ যায় ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ায়। এ দেশের উদীয়মান রফতানিকারকেরা তাদের যোগ্যতার যথেষ্ট প্রমাণ দিয়েছে। বাংলাদেশ সুলভ মানবসম্পদসহ আরও অনেক দিক দিয়েই ভারত এবং ফিলিপাইন থেকে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশকে আউটসোর্সিংয়ে শীর্ষ উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ধরা হয়। গার্টনার বাংলাদেশকে আউটসোর্সিংয়ে শীর্ষ ৩০টি দেশের মধ্যে স্থান দিয়েছে। এটির কারণে সার্ভিস ইন্ডেক্সেও বাংলাদেশের অবস্থান চার ধাপ এগিয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসেবে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রফতানি নিমণরূপ-
আমরা যদি রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যাদিকে বিশ্লেষণ করি, তবে আমাদের দেশের রফতানির চিত্রটিও বিচিত্র। আমাদের প্রবৃদ্ধির হিসাবটিও সরলরেখায় ওঠানামা করছে না। কখনও সেটি ৫৬.২৮ শতাংশ বেড়েছে। আবার কখনও মাত্র ৪.৭১ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বে আউটসোর্সিং বাজারের আকার নিয়ে গবেষণায় জানা গেছে, গত তিন বছরে দেশগুলোর আইটিতে ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি অস্থিতিশীল। সে ক্ষক্ষত্রে বাংলাদেশ আউটসোর্সিংয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের দেশীয় আউটসোর্সিং সেবার চাহিদা বহির্বিশ্বে বেশ ভালোভাবেই আছে। প্রসঙ্গত এটি উল্লেখ করা দরকার, ভারত ২০১৫ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখন ৯৯ বিলিয়ন ডলার রফতানি করেছে। ২০১৬ সালে ১১০ বিলিয়ন ডলার রফতানির আশা করে। তারা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে ২০১৫ সালে ১৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে, যার বৃহত্তম অংশ ই-কমার্সের। আমরা ভিয়েতনামের হিসাবটা পেয়েছি- ২০১৫ সালে তারা ৩ বিলিয়ন ডলার রফতানি করেছে।
ইপিবির হিসাবের (১৫১.৯ মিলিয়ন ডলার) পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সূত্রমতে, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংয়ে (বিপিও) গত বছরে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এছাড়া ফ্রিল্যান্সার আয়ের সঠিক হিসাব না থাকলেও তাদের আয় কমবেশি ১০০ মিলিয়ন ডলার বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল গেমিং, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন থেকে শুরু করে আমাদের আইটি সেক্টর, ফ্রিল্যান্সিং- সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার আয় করছে বলে সরকারিভাবে বলা হয়েছে।
ব্যক্তি পর্যায়ে প্রযুক্তি সেবায় বিপুল পরিমাণ আয় হলেও তা ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আসছে না। আমরা রফতানি আয়ের বিচিত্র একটি ধারণা পাই যদি বেসিস সদস্যদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করি। বর্তমানে বেসিস সদস্যভুক্ত আইটি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৫৬। এর মধ্যে ৩৮২টি সদস্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তারা গত বছর ৫৯৪.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রফতানি করেছে। বেসিস সদস্যভুক্ত নয় দেশে এমন আইটি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্তত ১০০০। এই হিসাব থেকে পুরো খাত সম্পর্কে একটি আন্দাজ করা যায়।
২০১৫ সালে দেশের আইটি রফতানির আনুমানিক চিত্র
তবে এটি সত্য, আইটি খাতের সব প্রতিষ্ঠান রফতানি করে না। সে ক্ষক্ষত্রে যদি ধরা হয়, তাদের মধ্যে মাত্র শতকরা ২৫ ভাগ রফতানি কাজে জড়িত, তবুও এর পরিমাণ প্রায় ৭৬১.৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে।
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে এটি উল্লেখ করতে চাই, গত ১৯-২১ অক্টোবর ২০১৬ ঢাকার বসুন্ধরা কনভেনশন সিটিতে আয়োজিত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের মাঝে ১৯ অক্টোবর বেলা ৩টায় সম্পন্ন মিনিস্টিরিয়াল কনফারেন্সের মূল প্রবন্ধে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রফতানি এখন ৭০০ মিলিয়ন ডলার। এতে বোঝা যায়, বেসিসের হিসাবটির সত্যতা সরকারিভাবেও রয়েছে।
যাই হোক, এসব আনুমানিক হিসাব শুধু বিজ্ঞানভিত্তিক জরিপ দিয়েই নিশ্চিত করা যাবে। বেসিস বা সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের জরিপ করা অগ্রাধিকার পেতে পারে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের কাছ থেকে জেনেছি, ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে সফটওয়্যার ও সেবা খাতের আয়কে রিপোর্ট করে না বলে তাদের হিসাবকেও তারা সঠিক বলতে পারেন না। আমি নিজে বাংলাদেশের একটি বড় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের খবর জানি যারা ১২.৫ মিলিয়ন ডলার বিদেশ থেকে আয় করে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান ৫৫ মিলিয়ন ডলার রফতানি করে, কিন্তু সেটি আমাদের ব্যাংকের রফতানি হিসেবে আসেনি। কিন্তু তাদের একটি ডলারও তথ্যপ্রযুক্তি রফতানি হিসেবে রিপোর্ট করা হয় না। বাংলাদেশের রফতানি খাতের হিসাব এভাবে করে তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না এই বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। তবে হিসাবের চেয়েও অনেক বড় প্রসঙ্গ হচ্ছে করণীয় নিয়ে। প্রথমত, বেসরকারি খাতের কথাই আগে বলা যায়। আমি মনে করি, আমরা বিগত সময়ে পুরো বিষয়টিকে বাস্তবানুগভাবে না দেখে অনেকটা অন্যের দেখানো পথে হেঁটেছি এবং যুক্তির চেয়ে আবেগের দিকে বেশি নজর দিয়েছি। আমি এ ক্ষক্ষত্রে কয়েকটি বিষয়ে আমাদের ঔদাসিন্যের কথাও বলতে পারি। অতীতে আমরা বছরের পর বছর রফতানি বলে চিৎকার করলেও একবারও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের কথা বলিনি। এর ফলে আমাদের রফতানি আয় বাড়লেও দেশের ভেতরের বাজারে আমাদের অংশগ্রহণ কমেছে। আমরা রফতানির প্রণোদনার কথাও তুলে ধরতে পারিনি। আমরা বিষয়গুলো একটু তলিয়ে দেখতে পারি।
০১. অভ্যন্তরীণ বাজার : অনেকের কাছে এটি মনে হতে পারে, রফতানি করার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে আমরা দেশের ভেতরের বাজারের কথা বলছি কেন? বাস্তবতা হলো, রফতানি বাজারে প্রবেশের জন্য আমার নিজের দেশের বাজারে কাজ করার অভিজ্ঞতা বা সফলতার ভিতটা তৈরি করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের লোকজন পারতপক্ষক্ষ দেশী সফটওয়্যার ব্যবহার করেন না। ১ কোটি টাকার কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার তারা ১০০ কোটি টাকা দিয়ে কেনেন, প্রতিদিন বিমানে করে বিদেশী আনেন, পাঁচ তারা হোটেলে তাদেরকে রাখেন, কিন্তু আমার নিজের দেশের মানুষকে কাজ করতে দেন না। সরকারি কাজে এমনসব শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, যার জন্য আমাদের দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডারেই অংশ নিতে পারে না। দেশীয় সফটওয়্যারের ক্ষক্ষত্রে অভিজ্ঞতা ও টার্নওভারের শর্ত পূরণ করা যায় না। অন্যদিকে হার্ডওয়্যার রফতানির জন্য বিদেশী প্রখ্যাত ব্র্যান্ডের কথা বলেই দেয়া হয়। আমি মনে করি, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের দেশীয় বাজার গড়ে তুলতে হবে।
আমি সরকারের সব কাজ দেশীয় হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও সেবা গ্রহণ করার ও আমাদের সন্তানদেরকে দিয়েই সৃজনশীল কাজ করানোর অনুরোধ করি। এটির একটি বাড়তি সুবিধা হচ্ছে, এর ফলে আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
আপনি কি ভাবছেন শুধু অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করলেই আমরা ৫ বিলিয়নের বদলে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করতে পারব? সামনে আমরা সেটিও ব্যাখ্যা করব।
০২. রফতানি বাজার তৈরিতে সহায়তা : ক. বহির্বিশ্বে প্রচারণার জন্য বাংলাদেশের দূতাবাসে আইসিটি রফতানি ডেস্ক স্থাপন : আমাদের রফতানি বাজার আছে তেমন দেশগুলোতে আমাদের রফতানি যে তথ্যপ্রযুক্তি সেই বিষয়টি তুলে ধরার জন্য সেইসব দেশের দূতাবাসগুলোতে আলাদাভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন আইটি রফতানি ডেস্ক। এভাবে বেসিস সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে। এ ছাড়া অনেকেই মধ্যপ্রাচ্য, ডেনমার্ক, জার্মানিসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে এবং জাপান, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন এশিয়ান দেশে সফটওয়্যার এবং আইসিটি রফতানি করে থাকে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে এই দেশগুলোতে বাংলাদেশের দূতাবাসে আইটি ডেস্ক স্থাপন করা যেতে পারে। ঘটনাচক্রে বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলো এই সম্পর্কে সচেতন নয়। দেশের আইটি রফতানি বাড়াতে এইসব দেশের দূতাবাসকে পুরোপুরি সক্রিয় করা প্রয়োজন।
খ. রফতানি শ্রেণীবিন্যস্তকরণ : দেশের আইটি কোম্পানিগুলো যারা রফতানি করে থাকে, তাদের চিহ্নিতকরণ এবং রফতানি অনুযায়ী শ্রেণীবিভক্ত করা প্রয়োজন। কারা কী ধরনের পণ্য রফতানি করে, তা জানা থাকলে রফতানি বাড়াতে তাদের সহায়তা করা যাবে।
গ. রফতানি নির্দেশিকা : দেশের রফতানিকারক আইটি প্রতিষ্ঠানের একটি এক্সপোর্ট ডিরেক্টরি তৈরি করা, যেখানে তাদের নাম, যোগাযোগের ঠিকানা এবং কী কী পণ্য ও সেবাদানে তারা সক্ষম লেখা থাকবে। এই এক্সপোর্ট ডিরেক্টরি বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে প্রচার করা হবে। দেশের আইটি পণ্য ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষক্ষপ নিতে হবে।
ঘ. ফ্রিল্যান্সার নির্দেশিকা : ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি নির্দেশিকা প্রয়োজন, যাতে নতুন ফ্রিল্যান্সারেরা সহজেই এই পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে।
ঙ. সেমিনার-কর্মশালা : রফতানি সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন করা দরকার। এ ছাড়া রফতানিভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের আইটি কোম্পানিগুলোকে রফতানির জন্য প্রস্ত্তত করা আবশ্যক।
চ. বিদেশী আইটি মেলায় অংশগ্রহণে আর্থিক প্রণোদনা : বিদেশী ক্রেতা আকর্ষণে ও দেশী সফটওয়্যার এবং আইটিইএসের সক্ষমতা সম্পর্কে জানাতে বিদেশী আইটি মেলায় অংশগ্রহণ জরুরি। কিন্তু এসব মেলায় অংশগ্রহণের খরচ এবং যাতায়াত ভাড়া মিলিয়ে বিশাল অঙ্কের টাকা দেয়ার সামর্থ্য অনেক কোম্পানিরই নেই। সরকারের কাছ থেকে এ ক্ষক্ষত্রে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
ছ. বিদেশী ক্রেতার সাথে যোগাযোগে সহায়তা : বিদেশী ক্রেতাদের সাথে দেশী আইটি কোম্পানির বিটুবি ম্যাচমেকিং মিটিং আইটি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় উন্নতি ও উন্নয়ন আনতে সহায়তা করবে। দেশে ও বিদেশে এ ধরনের মিটিং আয়োজন কোম্পানিগুলোকে সরাসরি বিদেশী ক্রেতা পেতে সাহায্য করবে এবং রফতানি বাড়াতে সরাসরি অবদান রাখবে।
০৩. ইন্টারনেট : দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা হাইটেক পার্ক জাতীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষক্ষত্রে সরকারের ব্যাপক তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি। আশা করি, হাইটেক পার্ক গড়ে তোলার ক্ষক্ষত্রে সরকারের উদ্যোগের ওপর আমাদের ভরসা রাখা যাবে। কিন্তু যে সড়ক দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি প্রবাহিত হবে তার অবস্থা নাজুক। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেটের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। দেশে থ্রিজি ইন্টারনেটের গতি নেই বলা যায়। ইন্টারনেটের ক্রয়মূল্যও মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। ফলে একদিকে আমার দেশীয় ব্যবহারকারীর সক্ষমতা বাড়ছে না, অন্যদিকে ক্যাবল ইন্টারনেটের বাইরে আমরা রফতানি বা আইসিটির কাজ সম্প্রসারিত করতে পারছি না। সরকার ক্যাবল সংযোগ সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করলেও বেতার সংযোগ ও তার গতি ভয়ঙ্করতম খারাপ। দেশে ইন্টারনেট সংযোগ আরও সুলভ হওয়া উচিত। ঢাকার বাইরে দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রয়োজন। এ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আইটি কোম্পানিগুলোর জন্য সুলভে জায়গা বরাদ্দ দেয়া দরকার।
০৪. বিনিয়োগ : দেশী আইটি কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল গঠন করা আবশ্যক। বেসিস থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছিল, যা এখনও স্থবির হয়ে আছে। ইইএফ তহবিলেরও একই অবস্থা। বছরের পর বছর ইইএফ আবেদন বন্ধ রয়েছে। মেধাসম্পত্তির মূল্যের সঠিক নির্ধারক না থাকায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র আইডিএলসি বাদে আর কেউই আইটি কোম্পানিকে ঋণ দেয় না। এর বরাদ্দ করা মাত্র ৪৩ কোটি টাকা আইটি কোম্পানিগুলোর রফতানির সক্ষমতা তৈরিতে পর্যাপ্ত নয়। মেধাসম্পদের নির্ধারক এবং পরিচালনের সঠিক অবকাঠামো তৈরি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আইসিটি খাতের বিনিয়োগ গড়ে তোলার জন্য সাধারণ ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছাড়াও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থাগুলোর বিস্তার ঘটাতে হবে।
০৫. শিক্ষার রূপান্তর : প্রচলিত শিক্ষার রূপান্তর ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হয় এবং আইসিটি খাতে আসলে যে ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন, তাতে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। যে কারণে আইসিটির সণাতকেরা পরবর্তী প্রশিক্ষণ ছাড়া চাকরি পাচ্ছে না। সরকার এবং বেসিস প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিন্তু এসব প্রশিক্ষণ প্রবেশ স্তরের চাকরির জন্য উপযোগী। মধ্যস্তরের আইটি পেশাদারদের জন্য উপযোগী কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এখনও গড়ে ওঠেনি।
ওপরের বিষয়গুলো ছাড়াও ৫ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হলে আরও প্রয়োজন-
০৬. প্রণোদনা : দেশের রফতানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে সরকার মোট ২০টি খাতে উল্লেখযোগ্য হারে রফতানি ভর্তুকি/নগদ সহায়তা প্রদান করে। এক বস্ত্র খাতেই ব্যবসায়ীরা অন্য আরও অনেক ধরনের প্রণোদনার পাশাপাশি বিভিন্ন রফতানি ভর্তুকি পাচ্ছেন। জাহাজ রফতানির মতো তুলনামূলক নতুন শিল্পেও আকর্ষণীয় রফতানি ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। দেশে উৎপাদিত আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন সব নিত্যনতুন পণ্য কয়েক বছর ধরেই যোগ হচ্ছে রফতানি খাতে। সরকারের এইরূপ বিভিন্ন সহায়তায় দেশের তৈরি পোশাক শিল্প, চামড়াজাত দ্রব্য, পাটজাত দ্রব্যসহ বিভিন্ন খাত রফতানিতে অনেক এগিয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, পোশাক শিল্পের আজকের এই অবস্থানে পৌঁছতে সরকারের অবদান ছিল। প্রাথমিক অবস্থা থেকে এই শিল্পে সরকারি বিভিন্ন প্রণোদনা ও ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তিন দশক পরেও সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। আইটি রফতানিকে উৎসাহিত করার জন্য পৃথিবীর বহু দেশ নির্দিষ্ট হারে প্রণোদনা দিয়ে থাকে। ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষক্ষ্য পৌঁছাতে হলে দেশের এই উদীয়মান আইসিটি খাতেও রফতানি ভর্তুকি দেয়া উচিত। এই প্রণোদনা শতকরা ৫ ভাগ হবে নাকি ২০ ভাগ হবে, সেটি আলোচনাসাপেক্ষ হলেও এর বিকল্প কিছু নেই।
০৭. ভ্যাট রহিতকরণ : তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় ট্যাক্স রহিতকরণ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট ৪৫ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশ করা ও আইটিইএস কোম্পানির জন্য বাড়িভাড়ার ওপর থেকে ৯ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা আবশ্যিক।
০৮. রাষ্ট্রীয় ভাড়ায় অফিস স্পেস : নতুন আইটি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সমস্যা সমাধানে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এক বছরের জন্য বিনামূল্যে জায়গা বরাদ্দ দেয়া উচিত। ইতোমধ্যে দেশের প্রথম সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে যশোর টেকনোলজি পার্ক, গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। এ ছাড়া মহাখালী আইটি ভিলেজ, বরেন্দ্র সিলিকন সিটি রাজশাহী, ইলেকট্রনিক সিটি সিলেট, চন্দ্রদীপ ক্লাউড চর, চুয়েট আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এইরূপ আরও কিছু স্টার্টআপ ইউকিউবেটর তৈরি করে তাতে বিনামূল্যে অথবা কমমূল্যে জায়গা ভাড়া দিলে নতুন আইটি কোম্পানিগুলো রফতানিতে অবদান রাখতে পারবে।
সার্বিকভাবে আমি মনে করি, বাংলাদেশ সফটওয়্যার বা তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে রফতানির কাজ করার জন্য পুরোপুরিই প্রস্ত্তত। বলা যেতে পারে, আমরা এখন টেকঅফ স্তরে রয়েছি। আমাদের উচিত হবে এখন সব শক্তি একত্রিত করে টেকঅফ করা। তাতে ১ বিলিয়ন বা ৫ বিলিয়ন নয়, দেশের বৃহত্তম রফতানি খাত হিসেবে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা
ফিডব্যাক : mustafajabbar@gmail.com

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৬ - নভেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস
অনুরূপ লেখা