Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : আশীর্বাদ না অভিশাপ
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:১৯৬
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৭ - সেপ্টেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
প্রযুক্তি ভাবনা
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : আশীর্বাদ না অভিশাপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : আশীর্বাদ না অভিশাপ
গোলাপ মুনীর
আমরা অনেকেই টার্মিনেটর সিরিজের সিনেমা দেখেছি। ছবিটির মূল প্রতিপাদ্য বিলুপ্তপ্রায় মানবজাতি ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সিনথেটিক ইন্টেলিজেন্স তথা স্কাইনেট। স্কাইনেট ডেভেলপ করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ‘গ্লোবাল ডিজিটাল ডিফেন্স নেটওয়ার্ক’ কমপিউটার সিস্টেম হিসেবে, যেটি শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে সেলফ-অ্যাওয়্যার। এটি চালু করার পর নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে মানবজাতিকে লক্ষ্যবস্ত্ততে পরিণত করে এবং এটি পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে মানবজাতিকে ধ্বংস করে ফেলার। স্কাইনেট ছিল ফিকশনাল, কল্পনার বিষয়। কিন্তু আজকের দিনে স্কাইনেটকে তুলনা করা হয় আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) সাথে, যা হতে পারে মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ।
ব্রিটেনের জীবন্ত কিংবদমিত্ম বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং সম্প্রতি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন সত্যিকারের এআই সিস্টেমের ব্যাপারে অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে-‘The development of full artificial intelligence could spell the end of the human race.’ তার এই বক্তব্য সোজাসাপ্টা। তার কথা পরিপূর্ণ মাত্রার আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্সের বিকাশ ঘটাতে পারে মানবজাতির অবসান। তার মতো বিজ্ঞানী যখন এ ধরনের সতর্কবার্তা দেন, তখন এআই সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভীত জাগে বৈ কি! শুধু এই বিবৃতিই নয়, তিনি আরও কয়েকবারই তার বক্তব্যে হুশিয়ারি দিয়েছেন- এআই ইতি টানতে পারে মানবজাতির ইতিহাসের, যদি না এটি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়। এআই চালিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র (অটোনোমাস ওয়েপন) তৈরির ফলে নিকট ভবিষ্যতে মানবজাতি পড়তে পারে ধ্বংসকর বিপর্যয়ের মুখে। স্টিফেন হকিং আরও সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, এআই হতে পারে মানবসভ্যতার ইতিহাসের সর্বশেষ ঘটনা, যদি না মানুষ এর ঝুঁকি মোকাবেলা করতে জানে।
ভালো-মন্দের এআই
স্টিফেন হকিং এমন কথাও বলছেন- এআইয়ের হুমকি থাকা সত্ত্বেও এআই মানবজাতির প্রভূত উপকার সাধন করতে পারে এবং অবসান ঘটাতে পারে দারিদ্র্য ও দুর্যোগের। প্রফেসর হকিং বলেছেন, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে Leverhulme Centre for the Future of Intelligence (LCFI) চালুর ফলে এখন এআইয়ের উপকারিতার সম্ভাবনা অনেক। নতুন প্রযুক্তি বিপ্লবকে কাজে লাগিয়ে আমরা দারিদ্র্য ও রোগব্যাধিকে জয় করতে পারব। এআই আমাদের জীবনের সবকিছুকে পাল্টে দিতে পারে। এটি মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য বয়ে আনতে পারে। কিন্তু এটি হতে পারে শেষ সাফল্যও। যদি না আমরা এর ঝুঁকি মোকাবেলা করতে পারি। তাহলে সারকথা দাঁড়াচ্ছে- এআই যেমন মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হুমকি, তেমনি উপকারী বন্ধুও। শক্তিশালী অটোনোমাস ওয়েপন নিশ্চিতভাবেই মানবজাতির আশঙ্কার কারণ। কিন্তু এআই কতিপয়ের জন্য সৃষ্টি করবে নতুন নতুন পথ, যা কারণ হয়ে দাঁড়াবে বিশ্বের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়ন চালানোর। এটি অর্থনীতিতে আনতে পারে বিপর্যয়। প্রফেসর হকিংয়ের মতে, ‘এআই ভবিষ্যতে গড়ে তুলবে এর will of its own, যা মানুষের ইচ্ছার সাথে দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে। সোজা কথায়, পরিপূর্ণ শক্তিধর এআইয়ের উদ্ভব হতে পারে সর্বোত্তম অথবা হতে পারে সবচেয়ে খারাপ কিছু, যা এর আগে কখনও ঘটেনি। এখনও আমরা জানি না, কোনটা ঘটবে।’
স্টিফেন হকিংয়ের এআই সম্পর্কিত অভিমতকে একপাশে সরিয়ে রেখে আধুনিক সভ্যতার ওপর এআইয়ের ঝুঁকি ও উপকারিতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক। আসলে এআই হচ্ছে কমপিউটার বিজ্ঞানের একটি ক্ষেত্র। এতে জোর দেয়া হয় সুনির্দিষ্ট কিছু মেশিনের ওপর, যেগুলো কাজ করতে ও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে অনেকটা মানুষের মতো। মানুষের ইন্টেলিজেন্সের মাত্রা হচ্ছে দেখা, বক্তব্য দেয়া ও শোনা, সিদ্ধান্ত নেয়া, বিভিন্ন ভাষার ভাষান্তর করার ক্ষমতা ইত্যাদি। এআইয়ের সূচনা মানুষের জীবনকে আরও সহজতর করে তোলার লক্ষ্যকে সামনে রেখে। আজকের দিনে এআইকে আমরা জানি একটি ‘ন্যারো এআই’ বা ‘উইক এআই’ হিসেবে। এ ধরনের এআই ডিজাইন করা হয়েছে ‘ন্যারো টাস্ক’ করার জন্য, যেমন- কারও চেহারা চেনা, ইন্টারনেট সার্চ করা, গাড়ি চালানো ইত্যাদি। এখন এআইয়ের প্রয়োগ দিন দিন শুধু বাড়ছেই।
আজকের দিনের কাজের আর আগামী দিনের কাজের ধরন এক হবে না। আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টিলিজেন্ট মেশিনের চাহিদা দিন দিন শুধু বড়ছেই। কারণ, এগুলো মানবিক দুর্বলতার (ক্লামিত্ম, অবসাদ, আবেগ ও সময়ের সীমাবদ্ধতা) ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, মানুষের মতো কাজ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মেশিন জটিল কাজও সম্পন্ন করতে পারে মানুষের প্রশিক্ষণ ছাড়াই। এরা ক্লামিত্মহীনভাবে একটানা কাজে লেগে থাকতে পারে। কোম্পানিগুলো এসব মেশিনের কাছ থেকে পেতে পারে মানুষের চেয়ে অনেক বেশিগুণ কাজ। এগুলো নিয়ে কোনো কোম্পানিকে ইউনিয়নবাজি মোকাবেলা করতে হয় না।
তবে এ কথাও ঠিক, এরই মধ্যে আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্ট মেশিন আঘাত হানতে শুরু করেছে চাকরির বাজারে। যদি উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বেড়েই চলছে। তবে মাঝারি ও সাধারণ চাকরিজীবীদের স্থান মেশিন দখল করে নিচ্ছে। মানুষের স্থান মেশিনের এ ধরনের দখল করার বিষয়টি নিয়ে নৈতিক সমস্যারও জন্ম দিচ্ছে। এমনও হতে পারে, মানুষ অতিমাত্রায় মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে মানুষ তার নিজের মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। মানুষের পার্শ্বাভিমুখী চিমত্মা ও বহু কাজ করার ক্ষমতা এক সময় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। যদিও এআই মেশিন উদ্ভাবনের লক্ষ্য ছিল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রের কাজগুলোতে অধিকতর দক্ষতা অর্জন। কিন্তু মেশিন নিয়ন্ত্রণে বিপর্যয় দেখা দিলে এর প্রভাব বিপর্যয়কর হতে পারে।
আমরা যদি আজকের এআইয়ের সঙ্কীর্ণ উপকারের বৃত্তের বাইরের দিকে তাকাই, তবে ভবিষ্যৎ এআই নিয়ে রয়েছে কিছু ঝুঁকিও। এই ঝুঁকির মাত্রা এখন আন্দাজ-অনুমান করা কঠিন। হয়তো এআই বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়টা আসবে আর মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই, নয়তো কয়েক শতাব্দীর মধ্যে। কিছু অ্যাকাডেমিক ও পেশাজীবী এই সিস্টেমের ওপর বিরতিহীনভাবে কাজ করে চলেছেন। এরা হয়তো সক্ষম হবেন সত্যিকারের আর্টিফিসিয়্যাল কনশাসনেস সৃষ্টি করতে। এটি যদি তখন আরও সেলফ-ইমপ্রম্নভমেন্টে যায়, তবে তা হিউম্যান ইন্টেলেক্টকে অনেক পেছনে ফেলে দেবে। মানুষের প্রত্যাশা সুপার ইন্টেলিজেন্ট মেশিন। কিন্তু আমরা জানি না এগুলোর আচরণ কেমন হবে। এ ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মেশিন আনতে পারে নবতর প্রযুক্তি বিপ্লব, একই সাথে আনতে পারে ধ্বংস, যদি না আমরা মানবতার সাথে এটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে পারি। আর্টিফিসিয়্যাল মেশিনে যদি ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য প্রোগ্রাম করা হয়, এতে কিছু উপকারী প্রোগ্রাম থাকলেও এটির আচরণ হতে পারে ধ্বংসাত্মক।
চারপাশে উদ্বেগ
এই সময়ে এআই নিয়ে উদ্বেগের মাত্রাটা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। এখন অনেক গবেষকেরা মনে করছেন, এরা এদের জীবদ্দশায়ই সুপার ইন্টেলিজেন্ট মেশিন উদ্ভাবন করতে পারবেন। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত পোয়ের্টেরিকো সম্মেলনে বেশিরভাগ গবেষক অনুমান করে বলেছেন, এই কাজটি সম্পন্ন হবে ২০৬০ সালের আগেই। স্টিফেন হকিং, এলন মাস্ক, স্টিভ উজনিয়াক ও বিল গেটসের মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের সেরা সেরা ব্যক্তিত্ব সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এসআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে। বিশেষ করে তাদের উদ্বেগ অটোনোমাস ওয়েপন নিয়ে। আগামী কয়েক বছরে এআই কতটুকু অগ্রগতি অর্জন করবে, সেই চিমত্মা মাথায় না নিয়েও মানুষের উদ্বেগ এ ক্ষেত্রে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে।
এদিকে সম্প্রতি শতাধিক বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী নেতা জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে কিলার রোবট উৎপাদন ও ছড়িয়ে দেয়া নিষিদ্ধ করার আবেদন জানিয়ে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। এই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন- আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞ টোবি ওয়ালশ, তেসলার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এলন মাস্ক, চীনের ইউবিটেকের জেমস চৌ, গুগলের উববঢ়গরহফ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা সুলেমান। বিশেষজ্ঞেরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, কিলার রোবট তৈরির ‘লেথাল অটোনোমাস টেকনোলজি’ সন্ত্রাসীরা হ্যাক করতে পারে। বিশেষজ্ঞেরা একে যুদ্ধক্ষেত্রে ‘থার্ড রেভ্যুলিউশন’ নামে আখ্যায়িত করে এ সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন।
জাতিসংঘের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্স (এআই) জগতের নেতারা বলেছেন, কিলার রোবট সম্পর্কিত যুদ্ধক্ষেত্রের এই তৃতীয় বিপ্লব সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্র দেরি না করে সতর্ক হতে হবে। এই চিঠিতে তারা বলেন, লেথাল অটোনোমাস টেকনোলজি হচ্ছে একটি প্যান্ডোরার বাক্স। এই ১১৬ জন বিশেষজ্ঞ যুদ্ধাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহবান জানান। চিঠিতে তারা আরও উল্লেখ করেন, একবার যদি এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যুদ্ধাস্ত্র তথা কিলার রোবট তৈরি হয়ে যায়, তবে সশস্ত্র সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছবে, যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। আর তা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। তা ছাড়া এগুলো হয়ে উঠতে পারে সন্ত্রাসীদের ব্যবহারেরও অস্ত্র। অসীম ক্ষমতার অধিকারী শাসকেরা ও সন্ত্রাসীরা তা ব্যবহার করতে পারে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেও। একই সাথে অপ্রত্যাশিতভাবে এই প্রযুক্তি হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।
এই চিঠি হচ্ছে প্রযুক্তি জগতের নেতাদের পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর প্রতি কিলার রোবট উদ্ভাবন নিষিদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ নিয়ে এগিয়ে আসার এক জরুরি বার্তা। তারা চিঠিতে উল্লেখ করেন- ‘we do not have long to act’, অর্থাৎ তাদের সুস্পষ্ট তাগিদ হচ্ছে, এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের হাতে আর লম্বা সময় নেই। কারণ তাদের মতে, ‘একবার যদি এই প্যান্ডোরার বাক্সের মুখ খুলে যায়, তবে তা বন্ধ করা হবে কঠিন।’
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই কিলার রোবট উদ্ভাবন নৈতিকভাবে একটি ভুল প্রযুক্তি। তাদের ভাষায় ‘মরালি রং টেকনোলজি’। আর তারা চান এই টেকনোলজি সংযুক্ত হোক জাতিসংঘের ‘সার্টেইন কনভেনশনাল ওয়েপনস’ (সিসিইউ) বিষয়ক কনভেনশনের আওতায় নিষিদ্ধের তালিকায়।
পেশাজীবীদের কাজ হারানোর ভয়
কয় মাস আগে প্রকাশিত হয়েছে এশিয়া’স এআই অ্যাজেন্ডা রিপোর্ট। রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে এডিপির সদর দফতর ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। এই রিপোর্ট মতে, ৭০ শতাংশ হিউম্যান রিসোর্স (এইচআর) এক্সিকিউটিভ মনে করেন, এআই ও রোবটিকস অ্যাডাপশনের ফলে আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তাদের চাকরি হারাবেন। এআই ও রোবটিকস এরই মধ্যে মানুষের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, এমন ভীতির মুখে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাজুড়ে দুই ডজন সিনিয়র এইচআর এক্সিকিউটিভ ও ব্যবসায়ী নেতার ওপর এক জরিপ চালানো হয়। এই জরিপ কাজ চলে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। এই জরিপের মাধ্যম জানার চেষ্টা চালানো হয়, কী গতিতে এআই এগিয়ে যাচ্ছে। এই জরিপ রিপোর্ট মতে, এশীয় নির্বাহীরা মনে করছেন, যেমনটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার আগেই আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্সের ঢেউ এশিয়ার বিজনেসের ওপর আঘাত হানবে। একই সাথে এটি ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধির ওপর উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাবও ফেলবে।
এডিপি ইন্ডিয়া ও সাউথ ইস্ট এশিয়ার মার্কেটিং হেড সুবিস বিশ্বনাথন বলেন, এআই নীরবে ঢুকে পড়েছে এবং প্রতিদিনই এর পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চাকরিজীবীরা এখন এর জন্য প্রস্ত্তত এবং মেনে নিচ্ছে এই পরিবর্তনকে। তার কথার সাথে আরও যোগ করে এডিপি ইন্ডিয়া ও সাউথ ইস্ট এশিয়ার এমডি রাহুল গয়াল বলেন, ৬০-৭০ শতাংশ নির্বাহী এই পরিবর্তনে খুশি এবং আইটি, বিপিও, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো খাতে বোরট ও এআই ব্যবহার করছে দ্রুতগতিতে। তা সত্ত্বেও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতের নির্বাহীরা এখনও ততটা আস্থাশীল নন যে মেশিন লার্নিং ও অটোমেশন তাদের খাতের জন্য উপকার বয়ে আনবে। সি-স্যুট (প্রধান নির্বাহী) রেসপন্ডারদের অভিমত- এআই এশিয়ায় তাদের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়াবে। বিশেষ করে বাড়াবে তাদের প্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং কাস্টমার ডাটা আরও উন্নততর হবে।
এখন এশিয়ায় খুব কম হারে এআই উন্নয়নের পেছনে বিনিয়োগ হচ্ছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান এআইয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে বিনিয়োগ করেছে এবং ৫০ শতাংশ এ খাতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে।
সময় এখন রি-স্কিলিংয়ের
ভারতীয় একটি সংবাদ সংস্থার খবরে প্রকাশ, চাকরির বাজারে মন্দা চলা অবস্থায় আইটি খাতে আরও চাকরি হারানোর একটা ভীতি এখন ভারতে কাজ করছে। Robert Bosch Engineering and Business Solutions (RBEI)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্রী কৃষ্ণান বলেন, নিমণমাত্রার আইটি এনাবল্ড সার্ভিস ও বিপিও জব আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে হারিয়ে যাবে। উল্লেখ্য, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ইন্ডিয়ায় এআই ডিভিশনেরও প্রধান।
তিনি বলেন, ‘এআই নিয়ে মানুষের ভয় নতুন নয়। কিন্তু এটি হচ্ছে পরবর্তী শিল্পবিপ্লব। যখন যুক্তরাজ্যে বস্ত্রশিল্পে অটোমেশন শুরু হয়, অথবা যখন বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবির্ভূত হয়, তখন ভয় ছিল মেশিন মানুষের স্থান দখল করে নেবে। উৎপাদনশীলতা যখন শতগুণে বাড়ল, তখনও ভয় ছিল এসব পণ্য কারা ভোগ করবে, কারণ মানুষের তখন চাকরি থাকবে না। কিন্তু মানুষ শিগগিরই নিজেদের দক্ষ করে তুলল বৃহদাকার উৎপাদন শিল্পে কাজ করার মতো উপযোগী করে। তখন আগেকার মেকানাইজড জব অটোমেশন হয়েছে। এখন ইন্টেলিজেন্ট জব অটোমেশন হচ্ছে। অতএব মানুষের ভয়ের কোনো কারণ নেই।’
লেনদেনের কাজেও অটোমেশন চলবে। ‘রোবটিক প্রসেস অটোমেশন’ মানুষের কাজে দখল বসাবে। ডাটা এন্ট্রি, ইনভয়েস রিডিং ইত্যাদি কাজে মানুষের প্রয়োজন হবে না, যদি না মানুষ আরও বুদ্ধিমত্তার কাজ করে। কিন্তু সেসব ইন্টেলিজেন্ট কাজও এখন অটোমেটেড করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘এখন সময় হচ্ছে মানুষ নিজেকে আবার দক্ষ তথা রি-স্কিল্ড করে তোলার। যারা চাকরিতে আছেন শুধু তাদের জন্য নয়, যারা এখনও লেখাপড়ায় আছেন তাদের জন্যও প্রয়োজন এই রি-স্কিলিং। এমনকি একজন ক্লাসিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারও চাকরি পাবেন না, যদি না তিনি জানেন মেশিন লার্নিং ও এআই টপিক। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে পিওর ক্লাসিক্যাল সফটওয়্যার প্রোগ্রামিংয়ের, যা সিকুয়েন্সিয়াল প্রোগ্রামিং নামেও পরিচিত।’
তিনি জানান, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে ‘ডিপ লার্নিং’ বিষয়ক বড় বড় বিশেষজ্ঞের ভিডিও এখন ইউটিউবে পাওয়া যায়। তার মতে, এটাই হচ্ছে শেখার মতো একমাত্র অ্যাপটিচুড, যারা চাকরির সন্ধানে আছেন।
কাজের সঙ্কটে ভারত
বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত এগিয়ে চলা অর্থনীতির দেশ ভারতে এখন চলছে জব ক্রাইসিস। বড় বড় কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর সৃষ্টি করা হতো লাখ লাখ কর্মসংস্থান। এখন এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চলছে ছাঁটাই। আইটি সঙ্কট এরই মধ্যে ভারতে এক ধরনের ভীতির জন্ম দিয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ম্যানুফেকচারিং খাতের মতো অন্যান্য অনেক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে লে-অফ ঘোষিত হচ্ছে।
পরিস্থিতি ভয়াবহ- বিশেষ করে এই সময়টায়, যখন ভারতের প্রত্যাশা দেশটিতে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ইয়াং ওয়ার্কিং এইজ পপুলেশন’ তৈরি করা। কিন্তু শ্রমঘন খাতে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের এই দেশে কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এখানে গ্র্যাজুয়েটদের প্রশিক্ষণের মান প্রশ্নসাপেক্ষ, কম-দক্ষতার কর্মসংস্থানের সংখ্যার দুর্বল প্রেক্ষাপটে চাকরি সুযোগে সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারতের জন্য অপেক্ষা করছে এক ফিকে ভবিষ্যৎ।
PeopleStrong নামে হিউম্যান টেক সলিউশন ফার্মের মতে, ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি ১০টি জবের ৪টি খেয়ে ফেলবে আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্স। ক্রমবর্ধমান হারে ভারতে আসবে অভিজাত ধরনের প্রযুক্তি। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের মতে, অটোমেশনের কারণে ভারতের ৬৯ শতাংশ জব হুমকির মুখে।
আইটি খাত : ভারতের ১৫ হাজার কোটি টাকার আইটি শিল্প চলছিল মিড-লেভেলের পেশাজীবীদের নিয়ে। অটোমেশনের ধাক্কায় এই খাত এখন অপ্রয়োজনীয় হওয়ার পথে। এরই মধ্যে Cognizant এবং Infosys-এর মতো কোম্পানি লে-অফ ঘোষণা করেছে ১৫ হাজার কর্মীর চাকরি। এই চাকরি হারানোর বিষয়টিকে পেশাজীবীদেরকে প্রতিশ্রম্নতিশীল ইউনিয়নাইজেন মুভমেন্টের দিকে ধাবিত করছে। ভারতীয় আইটি ফার্মগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে স্থানীয় মেধাবীদের কাজে লাগাতে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক প্রধান প্রধান দেশ বের করে দিচ্ছে ভারতীয় পেশাজীবীদের। এদিকে ভারতের কিছু কিছু কোম্পানি এখন নজর দিচ্ছে তাদের লোকদের নতুন টেকনোলজি ও প্রসেসের ব্যাপারে রি-স্কিলিংয়ের ওপর। ভারতের আইটি বিজনেস নেতারা স্বীকার করেন, বিষয়টি এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই এ ব্যাপারটি জানেন, কিন্তু কেউ যেনো এ নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না।
ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাত : আইটি খাতের লে-অফ যখন শিরোনাম হয়ে আসছে, অন্যান্য খাতও হয়ে পড়েছে অনেকটা কর্মতৎপরতাহীন অবস্থায়। যেমন ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাত। এইচডিএফসি ব্যাংক হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। এটি ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয় মাসে ছাঁটাই করেছে ১৬ হাজার লোক। অভিযোগ ডিজিটাইজেশনের বিরুদ্ধে। দেখা গেছে, ভারতে ক্রমেই বাড়ছে ডিজিটাল লেনদেন। এর ফলে দেশটির ফিন্যান্সিয়াল খাতে সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে ডিজিটাল লেনদেন চ্যানেলে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারাচ্ছেন মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপকেরা। ব্যাংকগুলো এদের রি-স্কিলিং না করে এদের জায়গায় নিয়ে আসছে তরুণ ‘টেক-ফ্রেন্ডলি’ মেধাবীদের। তা ছাড়া ব্যাংকগুলো গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে ব্যবহার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি।
ম্যানুফেকচারিং খাত : অটোমেশন করেছে কিংবা করেনি, ভারতের এমন অনেক সেরা মানুফেকচারিং কোম্পানি তাদের লে-অফ ছাঁটাই করে চলেছে। ২০১৬ সালে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রকৌশল ও অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ‘লারসন অ্যান্ড টারবো’ বিদায় দিয়েছে ১৪ হাজার লোককে। এটি এই কোম্পানির ৭৯ বছরের ইতিহাসে বড় ধরনের লে-অফের একটি। ‘ডিজিটাইজেন ও প্রোডাক্টিভিটি অ্যানহ্যান্সমেন্ট’কে এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
শুধু লারসন অ্যান্ড টারবোই নয়। ভারতের সবচেয়ে বড় গাড়ি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ‘টাটা মোটর’ গত ২৩ মে বলেছে, কোম্পানিটি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেড় হাজার ম্যানেজারিয়াল পদের ছাঁটাই করেছে। তবে এর সঠিক কারণ কী, তা এই কোম্পানি জানায়নি। তবে এর কারণ হতে পারে অটোমেশন। সে যা-ই হোক, ভারতের গাড়ি তৈরির খাতে অটোমেশন ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। যেমন- মারুতি সুজুকি এরই মধ্যে এর হরিয়ানার একটি কারখানায় গাড়ি তৈরিতে রোবট ব্যবহার করছে। এতে মানবশ্রমিক রয়েছে ৭ হাজার, অপরদিকে রোবট রয়েছে ১১০০। তা সত্ত্বেও বিশেস্নষকেরা বলছেন- গাড়ি শিল্পে মানবশ্রমিকের দরকার হবে সব সময়, এ জন্য মানবশ্রমিকদের ভয়ের কোনো কারণ নেই।
‘এই পরিবর্তন হবে নাটকীয়। তবে অনেকে যে বলছেন, তা বিপর্যয় ডেকে আনবেন, তা ঠিক নয়। আইটি, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) ও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মতো খাতের চাকরি বিলোপ হয়ে যাবে না। সেখানে শুধু একটা পরিবর্তন আসবে মাত্র।’- এ অভিমত নিউজার্সিভিত্তিক অটোমেশন সার্ভিসদাতা প্রতিষ্ঠান ক্রিয়ন সিস্টেমসের প্রধান নির্বাহী হারেল তায়েবের।
তবু থাকছে হিউম্যান ডিজিটাল সার্ভিস
ওপরের রিপোর্টগুলো পড়লে সাধারণ মানুষের মনে এআই সম্পর্কে কাজ হারানোর একটি ভীতি কাজ করা স্বাভবিক। তবে আশান্বিত হওয়ার মতো এটিও ঠিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিপূরক হিসেবে রয়ে যাবে হিউম্যান ডিজিটাল সার্ভিস। যখন ১৪৩০-এর দশকে প্রথম ইলাস্ট্র্যাশন তথা ব্যাখ্যাকরচিত্রসহ ছাপা বই জার্মানির অগসবুর্গ নগরীতে প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন কাঠ খোদাই শিল্পীরা এর প্রতিবাদ জানায়। তাদের ভয় ছিল, এতে এরা কর্মহীন হয়ে পড়বে। এরা তখন ছাপাখানায় কাজ বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে কাজ হারানোর ভাবনায় প্রযুক্তির প্রতি ভীতি মাঝে মাঝেই মানুষের মধ্যে জেগেছে এবং এখনও তা বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, কাঠ খোদাইকারীদের দক্ষতার চাহিদা আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি বেড়ে গেল। কাউকে কাউকে আরও বেশিসংখ্যক বইয়ের ইলাস্ট্র্যাশন করতে হলো। সর্বশেষ ভীতিটা এখন কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) টেকনোলজি নিয়ে। কিন্তু আবারও প্রমাণিত হলো প্রযুক্তি আসলে কাজের চাহিদা বাড়িয়ে তুলছে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, অধিক থেকে অধিক সংখ্যক মানুষ এখন ডিজিটাল সার্ভিস সরবরাহ করছে অনলাইনের মাধ্যমে, যাকে এখন কখনও কখনও অভিহিত করা হচ্ছে ‘হিউম্যান ক্লাউড’ নামে।
বিশ্বব্যাংকের দেয়া তথ্যমতে, ৫০ লাখেরও বেশি লোককে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে দূর থেকে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে, যেমন- Freelancer.com এবং UpWork-এর মাধ্যমে কাজ করার জন্য। এসব কাজের মধ্যে আছে ওয়েবসাইট ডিজাইন শুরু করা থেকে লিগ্যাল ব্রিফ তথা আইনি সারসংক্ষেপ লেখা পর্যন্ত। সাধারণত এ কাজের মাধ্যমে ঘণ্টায় কয়েক ডলার আয় করা যায়। বাজার গবেষক প্রতিষ্ঠান স্টাফিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যানালিস্টস জানিয়েছে, ২০১৬ সালে এ ধরনের অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলো রাজস্ব আয় করেছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। যারা ছোট ছোট কাজে অধিকতর আগ্রহী, তারা ব্যবহার করতে পারেন ‘micro-work’ সাইটগুলো, যেমন- অ্যামাজন পরিচালিত সার্ভিস Mechanical Turk। প্রায় ৫০০,০০০ টার্কার এখানে কাজ করেন, যেমন অডিও ট্র্যান্সক্রাইব করা। এর মাধ্যমে প্রতি ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স টাস্ক’-এর জন্য আয় করা যায় কয়েক সেন্ট।
অনেক বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি হাজার হাজার মানুষকে কাজ দেয়, প্রধানত আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এসব কোম্পানি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি কায়েম রেখে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করে। গুগলের রয়েছে ১০ হাজার ‘রেটার’-এর এক বাহিনী, যারা অন্যান্য কিছুর মাঝে ইউটিউব ভিডিওগুলোর ওপর নজর রাখে অথবা নতুন সার্ভিস টেস্ট করে। মাইক্রোসফট পরিচালনা করে একটি ‘ইউনিভার্সেল হিউম্যান রেলিভ্যান্স সিস্টেম’। এটি প্রতি মাসে সম্পন্ন করে লাখ লাখ মাইক্রো-টাস্ক। যেমন- এর সার্চ অ্যালগরিদমের রেজাল্ট চেক করা। এসব সংখ্যা ক্রমে বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফেসবুক ঘোষণা দিয়েছে, এটি বৈশ্বিকভাবে এর মডারেটরদের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ হাজার করবে।
আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্স কিছু ধরনের ডিজিটাল শ্রমের বিলোপ সাধন করবে। যেমন- সফটওয়্যার অডিও ট্র্যান্সক্রাইবিং আরও ভালোভাবে করে। এরপরও এআই সৃষ্টি করেছে অন্যান্য ধরনের ডিজিটাল ওয়ার্ক। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে নানা ধরনের কমপিউটিং পাওয়ার ও ফ্যান্সি ম্যাথমেটিকস। তবে এই প্রযুক্তি নির্ভর করে মানুষের ডিস্টিল করা ডাটার ওপর। একটি উদীয়মান মাইক্রো-টাস্ক প্রতিষ্ঠান CrowdFlower-এর human in the loop হচ্ছে এর একটি উদাহরণ। যেমন- এর ডিজিটাল ওয়ারকার্স কনটেন্টের সেন্টিমেন্ট ও অন্যান্য ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী ই-মেইল কুয়েরিগুলো ক্লাসিফাই করে, অর্থাৎ বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করে। এসব ডাটা ফেড করা হয় একটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে, যা জবাব তৈরি করতে পারে বেশিরভাগ কুয়েরির। কিন্তু সরল উত্তরবিহীন প্রশ্নগুলো আবার রুটেড করা হয় মানুষের মাধ্যমে।
আমরা মনে করতে পারি, মানুষকে এই লুপের বাইরে নিয়ে আসা হতে পারে অ্যালগরিদম উন্নয়নের মাধ্যমে। মাইক্রোসফটের গবেষণা শাখায় কর্মরত ম্যারি গ্রে বলেন- যদি কখনও এমনটি ঘটেও, তবু খুব শিগগিরই ঘটবে এমন সম্ভাবনা নেই। কিছু কাজ নিজে নিজে করা ও শেখার ব্যাপারে ক্রমান্বয়ে অ্যালগরিদম আরও চালাক-চতুর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভোক্তাসাধারণ ও কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশা থাকবে আরও বেশি স্মার্ট এআই সার্ভিস- ডিজিটাল আসিস্ট্যান্টের, যেমন অ্যামাজনের ‘আলেক্সা’ ও মাইক্রোসফটের ‘কর্টানা’, যা উত্তর দেবে আরও জটিল প্রশ্নের। এরপরও মানুষের প্রয়োজন হবে অ্যালগরিদম শেখানোর জন্য ও ব্যতিক্রমী কাজ মোকাবেলার জন্য।
মাইক্রোসফট রিসার্চের মিস গ্রে ও তার কলাবরেটর সিদ্ধার্থ সুরি মনে করেন- আগামী দিনে কী ঘটতে যাচ্ছে তার আভাস হচ্ছে ‘আপওয়ার্ক’ এবং ‘টার্ক’। তাদের অভিমত, নতুন নতুন এমন সব কাজ আসছে যেখানে মানবশ্রমের প্রয়োজন হবে আরও বেশি পরিমাণে। তাদের এসব কাজ সরবরাহ হবে অনলাইনে ও এআইয়ের সাথে যৌথভাবে। উদাহরণ টেনে বলা যায়, একটি ট্র্যাভেল এজেন্সি প্রতিদিনের নিয়মিত কাজ তথা রুটিন টাস্কগুলোতে (যেমন- ফ্লাইট বুকিং) ব্যবহার করতে পারে এআই। কিন্তু অধিকতর জটিল কাজটি করবে মানুষকর্মীরা।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল বার্নস্টিন ও মেলিসা ভ্যালেন্টাইন মনে করেন, পরিবর্তন আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তাদের ধারণা, অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানের (টেম্পোরারি ফার্ম) উত্থান ঘটবে, যেগুলোর স্টাফ ভাড়া করা হবে অনলাইনে এবং কনফিগার করা হবে এআইয়ের সহায়তায়। এই ধারণা পরীক্ষা করতে এ ধরনের ভার্চু্যয়াল কোম্পানিগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রজেক্টের জন্য একসাথে করার জন্য গবেষকেরা ডেভেলপ করেছেন একটি প্রোগ্রাম। এ ধরনের ‘ফ্ল্যাশ অর্গানাইজেশনে’ কাজ করা খুব মজার ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু অনেকের ভয়, মানুষ সৃষ্টি করতে পারে ‘একটি ডিজিটাল প্রলেতারিয়েত’। লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সারা রোবার্টস মনে করেন, কনটেন্ট মডারেটরেরা কিছুটা কাজের সঙ্কটে পড়তে পারেন। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক গ্রাহাম মনে করেন, অনলাইন ওয়ার্কের পস্নাটফর্ম অবশ্যই খুঁজে পাবে নতুন নতুন আয়ের উৎস, বিশেষ করে গরিব দেশগুলোতে এসব সার্ভিস মজুরি কমিয়ে আনবে। অতএব বড় ধরনের ডিজিটাল লেবার প্রোগ্রাম প্রণয়নের সময় একটি দেশের সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন- কেনিয়া কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে ১০ লাখ লোককে অনলাইন জবের জন্য তৈরি করার কর্মসূচি।
প্রসঙ্গ যখন বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রয়েছে প্রায় ৫ কোটি তরুণের এক শক্তিশালী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এটি হতে পারে এআই খাতের এক দক্ষ কর্মীবাহিনীর দেশ। সাড়ে ৬ শতাংশেরও বেশি জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে চলা ১৬ কোটি মানুষের দেশটি হতে পারে অনেক বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগের ও জনসম্পদ আহরণের গন্তব্যস্থল। বাংলাদেশে যে বিপুল পরিমাণ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষেত তরুণ রয়েছে, অনেক পশ্চিমা দেশে তা নেই। এদের আইসিটি শিক্ষায়, বিশেষ করে এআই টেকনোলজিতে দক্ষ করে তুলতে পারলে বিদেশের চাকরির বাজারে তাদের কদর তথা চাহিদা অবশ্যই বেড়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে এসব তরুণকে দক্ষ করে তোলা যায় এবং তাদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের কাজটিকে সহজতর করে তোলা যায়? একই সাথে কী করে দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাতে কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়িয়ে তোলা যায়। আগে থেকে এসব এআই শিল্পে যাতে দেশী শিক্ষেত-প্রশিক্ষেত ও দক্ষ কর্মবাহিনী গড়ে তোলা যায়, সে পরিকল্পনাও মাথায় রাখতে হবে একদম শুরু থেকে। এটুকু নিশ্চিত হলে এবং উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেলে আমাদের দেশের ছেলেরা তাদের যথাযোগ্য সক্ষমতা ও যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারবে। এর বড় প্রমাণ আমাদের ছেলেদের বিদেশের কোম্পানিগুলোতে তৈরি অবদানের উদাহরণ। এসব বিষয় মাথায় নিয়ে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ দেশের ও দেশের বাইরে এআইসহ আইসিটি শিল্পের সব খাতের চাকরির বাজারে নিজেদের প্রাধান্য সৃষ্টি করতে পারবে। আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সময়ের আইসিটি খাতের সব উপখাতে কাজের ধরন পাল্টাবে অথবা কখনই আইসিটি কর্মীবাহিনীকে রি-স্কিলিংয়ের বাইরে রাখা যাবে না
নোট : For Image search ‘killer robot’/‘intelligebt machine’
১২০ বছরের মধ্যে
মেশিন লার্নিং তথা আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের পরিচালিত একটি বৈশ্বিক জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের যাবতীয় সব কাজ অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় হতে আর ১২০ বছর সময় লাগবে। এই জরিপের ফলাফলে আরও বলা হয়, মানুষের অর্ধেক কাজ অটোমেটেড হতে সময় লাগবে আরও ৪৫ বছর। এই অর্ধেক কাজ তখন সম্পন্ন করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট।
‘When will AI exceed human performance?’ শীর্ষক এই রিপোর্টে আর্টিফিসিয়্যাল ইন্টেলিজেন্স পাল্টে দেবে পরিবহন, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও অর্থায়নের ধরন-ধারণকে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিউচার হিউমিনিটি ইনস্টিটিউট’। এতে এআই সম্পর্কে তিনটি প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়- ০১. উঁচু পর্যায়ের মেশিন ইন্টেলিজেন্স কীভাবে প্রভাব ফেলবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর? ০২. চূড়ান্ত ফলাফলে এআই নেতৃত্ব দেবে এমন সম্ভাবনা কতটুকু? এবং ০৩. এআইয়ের অগ্রগতিকে মানুষের সহায়ক করে তোলা নিশ্চিত করতে আমাদেরকে কী কী করতে হবে?
সমীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগামী ৪০ বছর সময়ের মধ্যে নিমণলিখিত কাজের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে পেছনে ফেলে দেবে-
ভাষা অনুবাদের কাজে, ২০২৪ সালের মধ্যে।
স্কুলের রচনা লেখা, ২০২৬ সালের মধ্যে।
লরি ড্রাইভ করা, ২০২৭ সালের মধ্যে।
খুচরা বেচাবিক্রি করা, ২০৩১ সালের মধ্যে।
বেস্ট সেলিং বই লেখা, ২০৪৯ সালের মধ্যে।
শল্যচিকিৎসক হিসেবে কাজ করা, ২০৫৩ সালের মধ্যে।
অপরদিকে সমীক্ষাটির বড় প্রশ্ন ছিল- মানবজাতির জন্য এআই ‘ভালো’ না ‘মন্দ’ ফল বয়ে আনবে? বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ‘মন্দ’ ফল বয়ে আনার সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও নিচে। আর ‘ভালো’ ফল বয়ে আনার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। তা ছাড়া এআই মানবজাতির ‘চরম মন্দ’ তথা ‘এক্সট্রিম ব্যাড’ ফল বয়ে আনার (মানবজাতির বিলোপ সাধন) সম্ভাবনা ৫ শতাংশ।
জরিপে অংশ নেয়া লোকদের প্রায় অর্ধেকেরই অভিমত, এআইয়ের ঝুঁকি সর্বনিমণ পর্যায়ে রাখা সম্পর্কিত গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে সমাজকে।
‘ইন্টেলিজেন্স এক্সপ্লোশন’ নামে তথাকথিত ধারণায় বলা হয়- একবার উঁচু পর্যায়ের মেশিন ইন্টেলিজেন্স অর্জিত হয়ে গেলে এআই সিস্টেম দ্রুত ব্যাপকভাবে মানুষের তুলনায় সুপরিয়র হয়ে উঠবে। এ ধারণা প্রশ্নে জরিপে বলা হয়, এমন সম্ভাবনা কম, তবে অসম্ভব নয়।
শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিকস ও এআই সিস্টেম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নোয়েল শার্কি বলেছেন, ‘মেশিন অনেক কাজের ক্ষেত্রেই মানুষকে পেছনে ফেলে দেবে- এটি অবধারিত।’ তবে তিনি প্রশ্ন রাখেন, এ বিষয়টি কি টেকনোলজিকে মানুষের সাথে তুলনার যোগ্য করে তুলবে? তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানি না মেশিন কি কখনও সকালে উঠে আমার জীবনসাথীর মুড বুঝবে কি না, কিংবা নিতে পারবে কি না অর্থপূর্ণ কোনো মানবিক সিদ্ধান্ত।’

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৭ - সেপ্টেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস