Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > ব্লকচেইন: পাল্টে দেবে দুনিয়া
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:২০১
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৭ - নভেম্বর
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
প্রযুক্তি বিপ্লব
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
ব্লকচেইন: পাল্টে দেবে দুনিয়া
ব্লকচেইন: পাল্টে দেবে দুনিয়া
অতি সম্প্রতি প্রযুক্তি-দুনিয়ায় বেশ আলোচনা চলছে ব্লকচেইন প্রযুক্তির বিষয়টি নিয়ে। বিশেষ করে চারদিকে আলেচিত হচ্ছে এই প্রযুক্তির সুবিধা-অসুবিধা ও নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কথা নিয়ে। আমরা অনেকেই জানি না, এই প্রযুক্তি ব্যবহার কতটুকু নিরাপদ। আর্থিক সেবাখাত ও অন্যান্য সেবাখাত চাইছে ব্লকচেইন প্রযুক্তি থেকে সুবিধা পেতে। কিন্তু এখনও তাদের অনেকেই জানেনা, ব্লকচেইন প্রযুক্তিটা আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধাটা কোথায়, কীভাবে এ থেকে আমরা কাঙিক্ষতসুবিধা আদায় করতে পারি। এটি সত্য, একটি প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে এ থেকে উপকার পাওয়ার পথটাও থেকে যায় আমাদের কাছে অজানা। ব্লকচেইন প্রযুক্তি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার প্রয়াসই
আমাদের এই প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। তৈরি করেছেন গোলাপ মুনীর।
একটি ব্লকচেইন হচ্ছে অব্যাহতভাবে বেড়ে চলা রেকর্ডগুলোর একটি তালিকা। এক-একটি রেকর্ডকে বলা হয় একটি ব্লক। কমপিউটারবিজ্ঞানে একটি রেকর্ড হচ্ছে একটি মৌলিক ডাটা স্ট্রাকচার, যা শুধু স্ট্রাকচার, স্ট্রাক্ট বা কম্পাউন্ড ডাটা নামেও পরিচিত। উলিস্নখিত ব্লকগুলো সংযুক্ত ও নিরাপদ (লিঙ্কড ও সিকিউরড) রাখা হয় ক্রিপটোগ্রাফি ব্যবহার করে। একটি ব্লকচেইন হচ্ছে সব ক্রিপটোকারেন্সে ট্র্যানজেকশনের একটি ডিজিটাইজড, ডিসেন্ট্রালাইজড, পাবলিক লেজার(ledger)। এটি অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে, আর এর কমপ্লিটেড ব্লকগুলো (সর্বসাম্প্রতিক সম্পন্ন লেনদেন) রেকর্ড ও সংযোজন করা হয় সময়-ক্রমানুসারে। এর মাধ্যমে বাজারে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা কোনো কেন্দ্রীয় রেকর্ড সংরক্ষণ না করেই তাদের লেনদেনের ওপর নজর রাখতে পারেন। প্রতিটি নোড (নেটওয়ার্কে সংযুক্ত প্রতিটি কমপিউটার) ব্লকচেইনের একটি কপি পায়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাউনলোড হয়।
মূলত, ব্লকচেইন ডেভেলপ করা হয় ভার্চু্যয়াল কারেন্সি বিটকয়েনের জন্য একটি অ্যাকাউন্টিং মেথড হিসেবে। এই ব্লকচেইন ব্যবহার করে ডিএলটি তথা ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি। এই ডিএলটি আজকের দিনে বিভিন্ন ধরনের কমার্শিয়াল অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহার হয়। এখন এই প্রযুক্তি প্রথমত ব্যবহার হয় ডিজিটাল কারেন্সির লেনদেন বা ট্র্যানজেকশন পরীক্ষা করে দেখার কাজে, যদিও বাস্তবে যেকোনো ডকুমেন্ট ব্লকচেইনে ডিজিটাইজ, কোড ও ইনসার্ট করায়ও তা ব্যবহার করা সম্ভব। এর মাধ্যমে এমন একটি অমোচনীয় বা দুরপনেয় তথা ডিলিট-অযোগ্য রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়, যা আর পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। অধিকন্তু, রেকর্ড বা ব্লকগুলো কোনো একক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছাড়াই পুরো ব্লকচেইন কমিউনিটি সঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারবে।


একটি ব্লকচেইন সেবা দিতে পারবে একটি ওপেন ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার হিসেবে, যাতে কার্যকরভাবে রেকর্ড হবে দুইপক্ষের মধ্যে করা লেনদেনগুলো। আর এই লেনদেনগুলো স্থায়ীভাবে পরীক্ষাযোগ্য হবে। একটি ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি ব্লকচেইন সাধারণত পরিচালিত হয় একটি peer-to-peerনেটওয়ার্কের মাধমে। কোনো একটি ব্লকে রেকর্ড হওয়া ডাটা কখনই এমনভাবে পরিবর্তন করা যাবে না, যা অতীতের লেনদেনকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ পরবর্তী ব্লকগুলো পরিবর্তন তা করা যাবে না।
ডিজাইন অনুসারেই ব্লকচেইনগুলো সিকিউরড বা নিরাপদ। এটি ডিস্ট্রিবিউটেড কমপিউটার সিস্টেমের একটি উদাহরণ। এর রয়েছে উঁচু বাইজেন্টাইন ফল্ট টলারেন্স। অতএব ডিসেন্ট্রোলাইজড কনসেনসাস অর্জিত হয়েছে ব্লকচেইনের বেলায়। এর ফলে ব্লকচেইন উপযোগী হচ্ছে ইভেন্ট, মেডিক্যাল রেকর্ড ও অনান্য রেকর্ড সংরক্ষণ কর্মকা- (যেমন- আইডেন্টিটি ম্যানেজমেন্ট, ট্র্যানজেকশন প্রসেসিং, ডকুমেন্ট প্রোভেনেন্স অথবা ফুড ট্রান্সেবিলিটি) রেকর্ড করার জন্য।
২০০৮ সালে প্রথম ডিস্ট্রিবিউটেড ব্লকচেইনের ধারণা দেন Satoshi Nakamotoনামে এক অজানা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। পরের বছর ডিজিটাল কারেন্সি বিটকয়েনের একটি মুখ্য উপাদান হিসেবে তা বাস্তবায়ন করা হয়, যেখানে এটি সব লেনদেনের জন্য কাজ করে একটি পাবলিক লেজার হিসেবে। বিটকয়েনের জন্য ব্লকচেইনের উদ্ভাবন এটিকে করে তোলে ডাবল স্পেন্ডিং সমস্যা সমাধানে প্রথম ডিজিটাল করেন্সি, যেখানে প্রয়োজন হয় না তৃতীয় কোনো ট্রাস্টেড অথরিটির বা সেন্ট্রাল সার্ভারের। বিটকয়েন ডিজাইন ছিল অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশনের প্রেরণা।
একটি ব্লকচেইন সুযোগ করে দেয় নিরাপদ অনলাইন লেনদেনের। ব্লকচেইন একটি ডিসেন্ট্রেলাইজড ও ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার, যা ব্যবহার হয় অনেক কমপিউটারে লেনদেন রেকর্ড করার জন্য, যাতে পরবর্তী সব ব্লক পরিবর্তন ও নেটওয়ার্কের সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করে অতীত কোনো রেকর্ড পরিবর্তন করা না যায়। এটি অংশগ্রহণকারীদের নিখরচায় লেনদেন পরীক্ষা করে দেখারসুযোগ করে দেয়। এগুলোর যথাযথকরণ করা হয় মাস(mass) কলাবরেশনের মাধ্যমে, যা চলে কালেকটিভ সেলফ-ইন্টারেস্টে। এর ফল হচ্ছে একটি রোবাস্ট ওয়ার্কফ্লো বা বিপুল কর্মপ্রবাহ, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা একদম কম।
একটি ব্লকচেইন ডাটাবেসের রয়েছে দুই ধরনের রেকর্ড- ট্র্যানজেকশন ও ব্লক। ব্লকগুলো ধারণ করে বৈধ ট্র্যানজেকশনের ব্যাচগুলো, যা হ্যাশ ও এনকোড করা হয় একটি Merkle tree-তে। একটি অস্থায়ী ফর্ক সৃষ্টি করে কোনো কোনো সময় ব্লকচেইন তৈরি করা যাবে একই সময়ে সংঘটনশীলভাবে, অর্থাৎ কনকারেন্টলি। তা ছাড়া হ্যাশভিত্তিক ইতিহাস নিরাপদ করতে, ইতিহাসের বিভিন্ন সংস্করণ স্কোর করার জন্য যেকোনো ব্লকচেইনের রয়েছে স্বতন্ত্র অ্যালগরিদম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একটি Merkle Tree হচ্ছে একটি ডাটা স্ট্রাকচার, যা ব্যবহার হয় কমপিউটার সায়েন্স অ্যাপ্লিকেশনে। বিটকয়েন ও অন্যান্য ক্রিপটোকারেন্সিতে মার্কল ট্রি কাজ করে অধিকতর দক্ষতা ও নিরাপত্তার সাথে ব্লকচেইন ডাটা এনকোড করায়। মার্কল ট্রি binary hash treesনামেও অভিহিত হয়।
ইতিহাসের আলোকে ব্লকচেইন
ক্রিপটোগ্রাফিক্যালি নিরাপদ ব্লকচেইনের ওপর প্রথম কাজ বর্ণিত হয় ১৯৯১ সালে। এই বর্ণনা দেন স্টুয়ার্ট হ্যাবার ও ডবিস্নউ স্কট স্টমেটা। ১৯৯২ সালে বেয়ার, হ্যাবার ও স্টমেটা দক্ষতা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে ব্লকচেইনে ইনকরপোরেট করেন মার্কল ট্রি, যাতে বেশ কয়েকটি ডকুমেন্ট একটি একক ব্লকচেইনে সংগ্রহ করা যায়।
২০০৮ সালে প্রথম ডিস্ট্রিবিউটেড ব্লকচেইনের ধারণা দেন কোনো অজানা ব্যক্তি বাSatoshi Nakamotoনামের একটি গ্রম্নপ এবং পরের বছর তা বাস্তবায়ন করে ডিজিটাল কারেন্সির একটি মুখ্য উপাদান হিসেবে, যেখানে এটি কাজ করে সব লেনদেনের একটি পাবলিক লেজার হিসেবে।একটি peer-to-peer network এবং একটি distributed timestamping server ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ব্লকচেইন ডাটাবেসস্বায়ত্তশাসিতভাবে পরিচালনাকরা হয়। বিটকয়েনের জন্য ব্লকচেইনের ব্যবহার ডিজিটাল কারেন্সিকে সর্বপ্রথম সুযোগ করে দেয় কোনো বিশ্বস্ত অ্যাডমিনিস্ট্র্যাটর ছাড়াই ‘ডাবল স্পেন্ডিং প্রবলেম’ সমাধানের। বিটকয়েন ডিজাইন প্রেরণা জোগায় অন্যান্য আরও অ্যাপ্লিকেশনের।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ডিজিটাল কারেন্সির বেলায় একটি ঝুঁকি হচ্ছে, এটি দুইবার খরচ করা যায়। এরই নাম ডাবল স্পেন্ডিং। এই ডাবল স্পেন্ডিং সমস্যাটি একান্তভাবেই ডিজিটাল কারেন্সির একটি সমস্যা। কারণ, ডিজিটাল ইনফরমেশন পুনরায় সৃষ্টি করা যায় তুলনামূলকভাবে সহজে। ভৌত মুদ্রা বা ফিজিক্যাল কারেন্সির বেলায় এই সমস্যা নেই। কারণ, সহজে এগুলোর নকল কপি তৈরি করা যায় না। আর লেনদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট দুইপক্ষ সাথে সাথে ভৌত মুদ্রার আসল নকল যাচাই করে নিতে পারেন। কিন্তু ডিজিটাল কারেন্সির বেলায় এর ধারক ডিজিটাল টোকেনের কপি তৈরি করে নিতে পারেন এবং অরিজিনালটি নিজের কাছে রেখে দিয়ে নকলটি মার্চেন্টের বা অন্য কোনো পক্ষের কাছে পাঠাতে পারেন। প্রথম দিকে জনপ্রিয় ডিজিটাল কারেন্সি বা ক্রিপটোকারেন্সি বিটকয়েন নিয়ে এটি ছিল একটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ, এটি একটি বিকেন্দ্রায়িত কারেন্সি হিসেবে এর এমন কোনো কেন্দ্রীয় এজেন্সি ছিল না, যা পরীক্ষা করে দেখবে এটি একবার খরচ করা হয়েছে কি না, কিংবা ডাবল স্পেন্ডিং হয়েছে কি না। তা সত্ত্বেও ট্র্যানজেকশন লগের ওপর ভিত্তি করে বিটকয়েনের একটি মেকানিজম রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের যথার্থতা পরীক্ষা করে দেখা যায়, অন্য কথায় ডাবল স্পেন্ডিং প্রতিরোধ করা যায়।
blockএবংchainএই শব্দ দু’টি আলাদা আলাদা ব্যবহার হয়েছিল ২০০৮ সালের অক্টোবরে Satoshi Nakamoto-এর মূল প্রবন্ধে বা অরিজিনাল পেপারে। যখন এই পদবাচ্যটি আরও বৃহত্তর পরিসরে আসে,তখন প্রথম তা ছিল block chain। পরে ২০১৬ সালে তা রূপ নেয় একক শব্দ blockchain-এ। ২০১৪ সালের আগস্টে বিটকয়েন ব্লকচেইন ফাইলের সাইজ পৌঁছে ২০ গিগাবাইটে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এই সাইজ আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ গিগাবাইটে। ২০১৭ সালে বিটকয়েন ব্লকচেইন পৌঁছে ৫০ গিগাবইট থেকে ১০০ গিগাবাইট আকারে। ২০১৪ সালে পাই Blockchain 2.0 পদবাচ্যটি, যা দিয়ে বোঝানো হয় ডিস্ট্রিবিউটেড ব্লকচেইন ডাটাবেসের নতুন নতুন অ্যাপ্লিকেশন।
২০১৬ সালে রুশ ফেডারেশনের সেন্ট্রাল সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি ঘোষণা দেয়NxtBlockchain 2.0 platformভিত্তিক একটি পাইলট প্রকল্পের, যেটি উদঘাটন করবে ব্লকচেইনভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ভোটিং সিস্টেম। বিশ্বব্যাপী মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন মডেল টেস্টিং শুরু করেছে, যাতে রয়েলটি সংগ্রহ ও কপিরাইট ব্যবস্থাপনার জন্য ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে আইবিএম সিঙ্গাপুরে চালু করেছে একটি ব্লকচেইন রিসার্চ সেন্টার।ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি ওয়ার্কিং গ্রম্নপ ২০১৬ সালের নভেম্বরে ব্লকচেইন সংশ্লিষ্ট গভর্ন্যান্স মডেল উদ্ভাবনের বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করে। গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট কন্সাল্টিং ও প্রফেশনাল সার্ভিস কোম্পানি Accenture-এর মতে, ডিফিউশন অব ইনোভেশন থিওরি একটি অ্যাপ্লিকেশন বলে- ২০১৬ সালে ব্লকচেইন ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অর্জন করেন ১৩.৫ শতাংশ অ্যাডাপশন রেট। ২০১৬ সালে ইন্ডাস্ট্রি ট্রেড গ্রম্নপগুলো একসাথে মিলিত হয় একটি ‘গ্লোবাল ব্লকচেইন ফোরাম’ গঠন করার জন্য। এটি ছিল চেম্বার অব ডিজিটাল কমার্সের একটি উদ্যোগ।
২০১৭ সালের প্রথম Harvard Business Review-এর বলা হয়- ‘ব্লকচেইন হচ্ছে একটি ফাউন্ডেশনাল টেকনোলজি। অতএব এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটি আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার জন্য নতুন ভিত্তি তৈরি করবে।’ আরও পর্যবেক্ষণ করা গেছে- মৌলিক উদ্ভাবনের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোতে ব্লকচেইন প্রবেশ করতে আরও কয়েক দশক সময় লাগবে।
ডিসেন্ট্রালাইজেশন
পুরো নেটওয়ার্কজুড়ে ডাটা স্টোর করার মাধ্যমে ব্লকচেইন অপসারণ করে সেই ঝুঁকি, যে ঝুঁকি ছিল সেন্ট্রালাইজড নেটওয়ার্কের সাথে। ডিসেন্ট্রালাইজড ব্লকচেইন ব্যবহার হতে পারে ad-hocmessage passingএবং distributed networking-এ। এর নেটওয়ার্কের এমন কোনো সেন্ট্রালাইজড পয়েন্টস অব ভালনারেবিলিটি, যার অপব্যবহার করতে পারে কমপিউটার ক্র্যাকারেরা। একইভাবে এই নেটওয়ার্কের নেই সেন্টার পয়েন্টস অব ফেইলিউর। ব্লকচেইন সিকিউরিটি মেথডগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে public-key cryptography-এর ব্যবহার।
একটিpublic key (সুদীর্ঘ এলোপাতাড়ি সংখ্যার একটি শৃঙ্খল) হচ্ছে ব্লকচেইনে একটি অ্যাড্রেস। নেটওয়ার্কজুড়ে পাঠানো ভ্যালু টোকেন রেকর্ড করা হয় একটি অ্যাড্রেসের অধীনে। একটি private keyহচ্ছে একটি পাসওয়ার্ডের মতো, যা এর মালিককে ডিজিটাল অ্যাসেটে অ্যাক্সেসের সুযোগ দেয় অথবা অন্যভাবে ইন্টারেক্ট করার সুযোগ দেয় বিভিন্ন সক্ষমতায়, যা এখন ব্লকচেইন সমর্থন করে। ব্লকচেইনে স্টোর করা ডাটা সাধারণত ইনকরাপ্টিবল বলে বিবেচিত হয়।


একটি ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেমে প্রতিটি nodeঅথবা miner-এর রয়েছে ব্লকচেইনের একটি কপি। ডাটার মান বাজায় রাখা হয় ব্যাপক ডাটাবেস রিপ্লেকেশন ও কমপিউটেশনাল ট্রাস্টের মাধ্যমে। এখানে কোনো সেন্ট্রালাইজড ‘অফিসিয়াল’ কপি থাকে না এবং কোনো ইউজারকেই অন্য কোনো ইউজারের চেয়ে বেশি ‘ট্রাস্টেড’ বিবেচনা করা হয় না। সফটওয়্যার ব্যবহার করে ট্র্যানজেকশনগুলো নেটওয়ার্কে ব্রডকাস্ট করা হয়। মেসেজগুলো একটি সর্বোত্তম পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে সরবরাহ করা হয়। মাইনিং নোডগুলো ট্র্যানজেকশনগুলোর বৈধতা দেয়, এগুলোকে ব্লকে যোগ করে এবং এরপর কমপ্লিটেড ব্লককে অন্যান্য নোডে ব্রডকাস্ট করে। ব্লকচেইন ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের টাইম-স্টাম্পিং স্কিম, যেমন- চেঞ্জ সেরিয়েলাইজ করতেproof-of-work-এর মতো।
ব্লকচেইন ও বিটকয়েন
সম্ভবত ব্লকচেইন হচ্ছে বিটকয়েনের মূল প্রাযুক্তিক উদ্ভাবন। বিটকয়েন সেন্ট্রাল অথরিটির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় না। বরং এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে পণ্য বা সেবার জন্য অর্থ পরিশোধ করে, তখন এর ব্যবহারকারীরা ডিক্টেট ও ভ্যালিডেট করে ট্র্যানজেকশনগুলো। এখানে পেমেন্ট প্রসেস ও স্টোর করার জন্যকোনো তৃতীয় পক্ষের দরকার হয় না। সম্পন্ন করা ট্র্যানজেকশন প্রকাশ্যে রেকর্ড করা হয় ব্লকগুলোতে এবং শেষ পর্যন্ত ব্লকচেইনে। সেখানে তা অন্য ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে ভেরিফাই ও রিলে করা হয়। মাইনিংয়ের মাধ্যমে গড়ে তোলা একটি নয়া ব্লক প্রতি ১০ মিনিট পরপরব্লকচেইনে যুক্ত হয় ।
বিটকয়েন প্রটোকলের ওপর ভিত্তি করে ব্লকচেইন ডাটাবেস শেয়ার করা হয় এ ব্যবস্থায় অংশ নেয়া সব নোডের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে প্রতিটি কমপিউটার পায় ব্লকচেইনের একটি কপি, যাতে রয়েছে রেকর্ডগুলো এবং তা সম্পন্ন লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অতএব এটি দিতে পারে ভেতরের তথ্য- যেমন একটি পয়েন্টে অতীতের একটি অ্যাড্রেসবিশেষে এর ভ্যালু কত, তা জানাতে পারে। ব্লকচেইন ইনফো সুযোগ করে দেয় পুরো বিটকয়েন ব্লকচেইনে।

ব্লকচেইন আসলেই ব্যাংকের চেয়ে নিরাপদ
ব্লকচেইন ভাঙা
একটি ব্লক হচ্ছে একটি ব্লকচেইনের ‘কারেন্ট’ পার্ট, যা রেকর্ড করে কিছু বা সব সাম্প্রতিক লেনদেন বা ট্র্যানজেকশন। একবার লেনদেন সম্পন্ন হয়ে গেলে ব্লক স্থায়ী ডাটা হিসেবে চলে যায় ব্লকচেইনের ভেতরে। প্রতিবার একটি ব্লক সম্পন্ন হওয়ার পর আরেকটি নতুন ব্লক সৃষ্টি করা হয়। এই ব্লকচেইনে এ ধরনের অসংখ্য ব্লক রয়েছে।একটি চেইনের লিঙ্কের মতো প্রতিটি ব্লক একটির সাথে আরেকটি পরস্পর সংযুক্ত যথাযথ লিনিয়ার ক্রনোলজিক্যাল (সরল রৈখিক ও সময়ানুক্রম) ধারায়। প্রতিটি ব্লকে রয়েছে পূর্ববর্তী ব্লকের একটি হ্যাশ। ব্লকচেইনের রয়েছে বিভিন্ন ব্যবহারকারী সম্পন্ন করা লেনদেন ও তাদের ব্যালেন্স বা লেনদেনস্থিতি সম্পর্কিত সম্পূর্ণ তথ্য- জেনেসিস ব্লক তথা প্রারম্ভিক ব্লক থেকেশুরু করে সর্বসম্প্রতি সম্পন্ন করা ব্লকেরও।
ব্লকচেইন এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, এসব লেনদেন ইমিউটেবল, অর্থাৎ এগুলো ডিলিট করা যায় না। ব্লকগুলো যোগ করা হয় ক্রিপটোগ্রাফির মাধ্যমে, যাতে এগুলোর meddle-proofথাকা নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ এগুলো যেন থাকে কারও হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে। এর ডাটা ডিস্ট্রিবিউট করা যাবে, তবে কপি করা যাবে না। তা সত্ত্বেও ব্লকচেইনের বেড়ে চলা সাইজকে বিবেচনা করা হচ্ছে কোনো না কোনো ধরনের একটি সমস্যা হিসেবে, যা সৃষ্টি করছে শর্টেজ ও সিনক্রোনাইজেশন সমস্যা।
ব্লকচেইনের সম্প্রসারণ
প্রচলিত ব্যাংকিংকে একটি সাদৃশ্য হিসেবে ব্যবহার করে বলা যায়, ব্লকচেইন হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের লেনদেনগুলোর পূর্ণ ইতিহাসের মতো এবং প্রতিটি ব্লক হচ্ছে আলাদা আলাদা এক-একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের মতো। কিন্তু যেহেতু এটি একটি ডিস্ট্রিবিউটেড ডাটাবেস সিস্টেম এবং কাজ করে একটি ওপেন ইলেকট্রিক্যাল লেজারের মতো, তাই একটি ব্লকচেইন সব পক্ষের জন্য বিজনেস অপারেশনগুলোর সহজ-সরল করে আনতে পারে। এ কারণে এই প্রযুক্তি শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ার বাজারগুলোকেইআকৃষ্ট করছে না, সেই সাথে আকৃষ্ট করছে সঙ্গীত, হীরা, বীমা ও ইন্টারনেট অব থিংস ডিভাইস জগতের অন্যদেরকেও। এর সমর্থকদের অভিমত- এ ধরনের ইলেকট্রনিক লেজার সিস্টেম সার্থকভাবে প্রয়োগ করা যাবে ভোটিং সিস্টেম, সরকারের অস্ত্র ও গাড়ি রেজিস্ট্রেশন এবং মেডিক্যাল রেকর্ড রাখার কাজে। এমনকি প্রাচীন নিদর্শন বা শিল্পকর্মের মালিকেরাও মালিকানা নিশ্চিত করার কাজে লাগাতে পারবেন।
সম্ভাবনাময় এই ডিস্ট্রিবিউটেড লেজারটেকনোলজি সহজ-সরল করে তুলতে পারে কারেন্ট বিজনেস অপারেশন। ব্লকচেইনভিত্তিক নতুন নতুন মডেল এরই মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রির ব্যয়বহুল ও অদক্ষ অ্যাকাউন্টিং ও পেমেন্ট নেটওয়ার্ককে সরিয়ে এর জায়গা দখল করতে শুরু করেছে। ব্লকচেইন টেকনোলজি সাশ্রয় করতে পারে শত শত কোটি ডলার। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট মতে, এটি বছরে শেয়ারবাজার অপারেটরদের ৬০০ কোটি ডলার খরচ কমাতে পারে। তবে প্রথমদিকে ব্যাংকগুলো একটু দ্বিধাগ্রস্ত এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে। কারণ, তাদের উদ্বেগ হচ্ছে সম্ভাব্য প্রতারণা নিয়ে। তবে এরা ভেবে দেখছে ব্লকচেইন ব্যবহার করে ব্যাক-অফিস সিস্টেমে প্রসেস ট্রেড,ট্রান্সফার ও অন্যান্য অধিকতর গতিশীল লেনদেনে তাদের খরচ কতটুকু কমিয়ে আনতে পারে।
আসলে প্রথম আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন ট্র্যানজেকশন সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবরে। সেখানে ব্রোকার ছিল কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েলস ফার্গো অ্যান্ড কোম্পানি। এতে সংশ্লিষ্ট ছিল অস্ট্রেলীয় তুলা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ব্রাইটেন কটন মার্কেটিংয়ের ৩৫ হাজার ডলারের একটি ব্যবসায়িক চুক্তি। ওই প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজের ইউএস ডিভিশন থেকে ৮৮ বেল পাট কিনে তা চীনের কিংদাওয়ে পাঠায়।
ব্লকচেইন ও টেক কোম্পানি
মিডলম্যান অপসারণ এবং ডেমোক্র্যাটাইজেন ও ডিসেন্ট্রালাইজেশনের ধারণায় আকৃষ্ট হয়ে টেক স্টার্টআপগুলো (নতুন শুরু হওয়া কোম্পানি) ব্লকচেইন টেকনোলজিটি গ্রহণ করছে বিভিন্ন শিল্পে এর প্রয়োগের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। যেসব স্টার্টআপ ব্লকচেইন টেকনোলজিকে ইন্টারনেট অব থিংসের জন্য এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এর মধ্যে আছে 21 Inc.। সিলিকনভিত্তিক এই স্টার্টআপ ২০১৫ সালে আয় করে ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এই প্রতিষ্ঠানটির মতে, তাদের তহবিল ব্যবহার করা হবে কানেকটেড ইন্টারনেট অব থিংস ডিভাইস ও সেলফোনে বিটকয়েন মাইনিং চিপস এমবেড করার কাজে।BTCJamহচ্ছে একটিP2Pপস্ন্যাটফরম। এর সদর দফতর সানফ্রান্সিসকোতে। এর বিশেষ অভিজ্ঞতা রয়েছে বিটকয়েনভিত্তিক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে। গত বছর এই কোম্পানি ঋণ দিয়েছে দেড় কোটি ডলারেরও বেশি।
Storjহচ্ছে এমন একটি কোম্পানি, যেটি বর্তমানে বেটা-টেস্টিং করছে ব্লকচেইনচালিত নেটওয়ার্কে ক্লাউড স্টোরেজের। এর লক্ষ্য একটি একক স্টোরেজ প্রোভাইডারের সেন্ট্রালাইজড সিস্টেমের ওপর ব্যবহারকারীদের নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা। এমনকি এই কোম্পানি ব্যবহারকারীদের সুযোগ দেয় তাদের অপ্রয়োজনীয় স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ভাড়া দেয়ার। ঠিক যেমনটি বাড়ির মালিক তাদের অতিরিক্ত কক্ষটি ভাড়া দেন কমিউনিটি মার্কেটপ্লেস Airbnb-এ।
ProofofExistenceহচ্ছে প্রথম নন-ফিন্যান্সিয়্যাল কোম্পানিগুলোর একটি, যেটি ব্লকচেইন ব্যবহার করে। এটি কন্ট্রাক্ট বাস্তবায়ন করে। এনক্রিপটেড ইনফরমেশন স্টোর করার জন্য ডিএলটি ব্যবহার করা হয়।এভাবে এটি একটি ট্র্যানজেকশনকে এমনভাবে সক্ষম করে তোলে, যেটির নকল সৃষ্টি করা যাবে না একটি অনন্য ডকুমেন্টে সংযুক্ত করার জন্য।
এমনকি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্লকচেইনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। মাইক্রোসফট করপোরেশন আগ্রহ প্রকাশ করেছে ব্লকচেইন টেকনোলজির ব্যাপারে। সম্প্রতি এটি একটি পার্টনারশিপ গড়ে তুলেছে ব্লকচেইন ফার্ম ConsenSys-এর সাথে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মাইক্রোসফট ও কনসেনসিস ঘোষণা দেয়Ethereum Blockchain as a Service (EBaaS) on Azureনামের এর ক্লাউড কমপিউটিং পস্নাটফরমের।এর লক্ষ্য গ্রাহক ও ডেভেলপারদের জন্য একটি সিঙ্গল-ক্লিক ক্লাউডভিত্তিক এনভায়রন সৃষ্টি করা। ২০১৬ সালের জুনে এই দুই কোম্পানি সাধারণ মানুষ, অ্যাপ ও সার্ভিসের জন্য একটি ওপেন সোর্স ব্লকচেইনভিত্তিক আইডেন্টিটি সিন্টেম ডেভেলপ করতে শুরু করে।
ব্লকচেইনের সুবিধা
ডিএলটি সূত্রে পাওয়া দক্ষতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারে আমাদের খরচ। ডিএলটি সিস্টেম বিজনেস ফার্ম ও ব্যাংকগুলোকে সক্ষম করে তোলে ইন্টারনাল অপারেশনকে স্ট্রিমলাইন করতে, নাটকীয়ভাবে খরচ কমিয়ে আনতে, ভুলভ্রামিত্ম এড়াতে এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে রেকর্ডে সামঞ্জস্যবিধানে বিলম্ব দূর করতে।
ব্লকচেইনের সমর্থকেরা বলেন, ব্যাপকভাবে ডিএলটিঅ্যাডাপশন তিনটি ক্ষেত্রে বিপুলভাবে খরচ কমিয়ে আনবে- ০১. ইলেকট্রনিক লেজারপ্রচলিত অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের তুলনায় অনেক বেশি সস্তা। ব্যাক অফিসে চাকুরে লোকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা যায়। ০২. প্রায় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ডিএলটি সিস্টেমে ভুলের সংখ্যা অনেক কম। এখানে পুনরাবৃত্তিমূলক কনফারমেশন টেস্টের উপস্থিতি নেই। ০৩.প্রসেসের সময় কমিয়ে আনার কারণে পেন্ডিং ট্র্যানজেকশনের পেছনে কম মূলধন কাটালেই চলবে।
অধিকন্তু, পেছনের অমীমাংসিত বিষয় মীমাংসার জন্য ব্রোকার/ডিলারদের পেছনে খরচ কমে আসবে। অধিকতর স্বচ্ছতা বিধান হবে। নিরীক্ষা সহজতর হবে। ব্লকচেইন প্রসেসিংয়ে নিয়োজিত প্রায় সব ধরনের মানব-সংশ্লিষ্টতার অবসান বিশেষত উপকার বয়ে আনে ক্রস বর্ডার ট্রেডে, যাতে সাধারণত বেশি সময় নেয় টাইম-জোন সমস্যার কারণে এবং সব পক্ষকে নিশ্চিত করতে পেমেন্ট প্রসেসিংয়ের ব্যাপারে। ব্লকচেইন সিস্টেম স্মার্ট কন্ট্রাক্ট গড়ে তুলতে পারে। উদাহরণত, উপরে উলিস্নখিত ব্লকচেইন কটন ট্র্যাকজেকশনে ব্যবহার করা হয়েছে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আংশিক প্রাপ্য পরিশোধ করে। সেখানে কটন শিপমেন্ট পেয়েছে সুনির্দিষ্ট জিওগ্রাফিক মাইলস্টোনে। ব্লকচেইনের একটি বড় সম্পদ হচ্ছে এর স্বচ্ছতা। এর প্রতিটি ট্র্যানজেকশনের তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়ার যোগ্য। ব্লকচেইনে থাকা সবাই জানতে পারে প্রতিটি ধাপে কী ঘটছে।

আর্থিক খাতে ব্লকচেইন
R3 CEVহচ্ছে একটি ফিনটেক (ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস টেকনোলজি) ইনোভেশন কোম্পানি ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ৮০টি ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের একটি কনসোর্টিয়াম। এটি ব্লকচেইনের গতি, যথার্থতা ও দক্ষতা বাড়ানোর পদ্ধতির ওপর গবেষণা পরিচালনা করছে। ২০১৬ সালে একই সাথে সফল পরীক্ষা চালিয়েছে পাঁচটি ভিন্ন ব্লকচেইন টেকনোলজির ওপর। এতে ব্যবহার করা হয়েছে মাল্টিপল ক্লাউড টেকনোলজি প্রোভাইডার। এটি এ ধরনের প্রথম পরীক্ষা। বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য এই কনসোর্টিয়াম বিপণন করছে এর ‘ফিন্যান্সিয়াল গ্রেড’ ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার পস্ন্যাটফরম Corda।
তিন বছর কাজ করার পর ২০১৭ সালে গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রম্নপ প্যাটেন্ট লাভ করেছে এর SETLcoin-এর জন্য, যা সৃষ্টি করবে প্রায় তাৎক্ষণিক ‘ট্রেড সেটেলমেন্ট টাইম’। ২০১৬ সালে চারটি বড় ব্যাংক যৌথভাবে এগিয়ে আসে নতুন ডিজিটাল কারেন্সি ‘ইউটিলিটি সেটেলমেন্ট কয়েন’ (ইউএসসি) ডেভেলপ করতে। এটি নতুন এক ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার রেকর্ড হবে ব্লকচেইনের মাধ্যমে। ইউবিএস গ্রম্নপ এজির নেতৃত্বে এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মেলোন করপোরেশন, ডয়েসে ব্যাংক এজি এবং বাঙ্কো সানটেন্ডার এসএ। আর এদের সাথে ব্রোকার ছিল ICAP PLC (LON: IAP)। ২০১৭ সালে এদের সাথে যোগ দেয় আরো ৬টি ব্যাংক-বার্কলেইস ব্যাংক, ক্রেডিট সুইস গ্রম্নপ, কানাডিয়ান ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব কমার্স, এইচএসবিসি হোল্ডিং, এমইউএফজি এবং স্টেট স্ট্রেট করপোরেশন। করপোরেশনের লক্ষ্য ২০১৮ সালে একটি কমার্শিয়াল রিলিজের।
তা সত্ত্বেও ইউএসসিভিত্তিক সিস্টেম বা এর প্রতিযোগী কিছু ঘটানোর জন্য প্রয়োজন ও অনুমোদন নিতে হবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রেগুলেটরদের কাছ থেকে। এটি প্রায় স্পষ্ট, ব্লকচেইন টেকনোলজি এখনও প্রাইম টাইমের জন্য তৈরি হতে পারেনি।
ব্লকচেইনের পথে বাধা
আজকের দিনে ডিএলটির পথে বাধা শুধু টেকনিক্যাল নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনীতি, বিধিনিয়ন্ত্রণ ও কাস্টম সফটওয়্যার ডিজাইনের কয়েক হাজার ঘণ্টা এবং কারেন্ট বিজনেস লেজারে নতুন ব্লকচেইন লেজারে লিঙ্কআপ করার জন্য ফ্রন্ট এবং ব্যাক-এন্ড প্রোগ্রামিংয়েরপ্রয়োজনীয়তা। যেসব সমসা্যর সমাধান এখনও হয়নি, সেগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-
• অপারেশনাল প্রসেসের অন্যান্য অংশের সাথে ডিএলটির অবশ্যই ইন্টারফেস করতে হবে অব্যাহতভাবে। ব্লকসেটকে আরও বেশি দ্রুত সেটআপে সক্ষম হতে হবে, প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে, কমাতে হবে সমস্যা সমাধানের সময়। এফিসিয়েন্সি অর্জন আরও পর্যাপ্ত, সস্তা হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য, যাতে এই প্রযুক্তি সবাই হৃদয়ঙ্গম করে তাদের উপকারে আসার মতো কাজে লাগাতে পারে।
• নিরাপত্তা নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়েই গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ব্যাংক অব কানাডা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডসহ বেশ কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি তদন্তে নেমেছে। ২০১৫ সালের ফেব্রম্নয়ারিতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের রিপোর্টে বলা হয়- এই সিস্টেম গড়ে তোলার আগে আরও গবেষণা দরকার। সে ব্যবস্থা ডিএলটি ব্যবহার করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার সক্ষমতার সাথে সমঝোতায় না গিয়েই এবং সিস্টেমটিকে সিস্টেম অ্যাটাক থেকে নিরাপদ করতে পারে।
• আইডেন্টিটির জন্য ব্যাংকগুলো একটি ওপেন সোর্সের প্রতি আগ্রহী নয়। ব্যাংক ও রেগুলেটরেরা চায় ক্লোজ কন্ট্রোল বজায় রাখতে। সিঙ্গেল ডিজিট আইডেন্টিটি পাসপোর্ট অথরাইজার ডেভেলপ করা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী পদক্ষেপ।
• বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেনের জন্যএকটি ওপেন ডিজিটাল এনভায়রনমেন্ট সৃষ্টির ক্ষেত্রেও রেগুলেশন গুরুত্বপূর্ণ। পরিপূর্ণ ইলেকট্রনিক সিস্টেমের পুরো উপকার পাওয়ার জন্যবর্তমান ভৌত সার্টিফিকেট অবশ্যই ডিজিটাইজ করতে হবে। আরও যেসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া দরকার সেগুলোর মধ্যে আছে- ব্লকচেইন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? ব্লকচেইনে অংশ নেয়ার জন্য কাউকে কে অনুমতি দেবে? কে কোন ট্রানজেকশনের বৈধতা দেবে?
ব্লকচেইনে বিনিয়োগ
যেসব বিনিয়োগকারী এখন ব্লকচেইন টেকনোলজির অগ্রভাগে থাকার জন্য বিনিয়োগেআগ্রহী, তারা এখন এ কাজটি করতে পারবেন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর সহজে। ২০১৫ সালে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটাল কারেন্সি গ্রম্নপ’ চালু করা হয়। অন্যান্য লক্ষে্যর মধ্যে একটি লক্ষ্য ছিল, ‘the largest early-stage investment portfolio in the digital currency and blockchain ecosystem’ গড়ে তোলা। অধিকন্তু, আমেরিকান Software-as-a-Service (SaaS)কোম্পানিNASDAQ Private Market-এর রিপোর্ট মতে, ক্রিপটোকারেন্সি-ইউজিং ফার্মগুলোতে যে পরিমাণ তহবিল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল দিচ্ছে, তা ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তিতে এতটাই আগ্রহী হয়ে উঠছে যে, অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন তাদের নিজস্ব প্রাইভেট ব্লকচেইন সৃষ্টির জন্য।
তা সত্ত্বেও ব্লকচেইন স্টার্টআপগুলো চ্যালেঞ্জমুক্ত, এমনটি বলা যাবে না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বেশিরভাগ গ্রাহক বোঝেন না ব্লকচেইন টেকনোলজির চরম জটিল ধারণাটি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোম্পানিগুলোকে উপায় বের করতে হবে সুস্পষ্ট ভাষায় ধারণাটি তুলে ধরে। তাদের জানাতে হবে কীভাবে কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের প্রাইভেসি রক্ষা করে নিরাপদ অনলাইন ট্র্যানজেকশন নিশ্চিত করতে পারে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে ব্লকচেইন
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে ব্লকচেইন প্রয়োগের বেশকিছু সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্ভাবনার কিছু কিছু এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হতেও দেখা গেছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে সামুদ্রিক খাবারের উৎস চিহ্নিত করে তা জেলেদের কাছ থেকে নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে রেস্তোরাঁর টেবিলে। এর অর্থ হচ্ছে ভোক্তাদের কাছে স্পষ্ট চিত্রটা জানা থাকছে, কোথা থেকে তাদের খাবার আসছে।
শিল্পকলায় ব্লকচেইন টেকনোলজি ব্যবহার হচ্ছে এটুকু নিশ্চিত করতে যে, এর শিল্পীকে অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি ওএর জন্য সম্মানী দেয়া হচ্ছে। তবে সম্ভবত স্বীকার করতেই হবে, সবচেয়ে বেশি হারে ব্লকচেইন টেকনোলজি ব্যবহার হচ্ছে ব্যাংক খাতে। প্রধান প্রধান প্রায় সব ব্যাংকই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে এই প্রযুক্তি নিয়ে। নতুন আসা কোম্পাগুিলো কাছাকাছি এসে গেছে ব্লকচেইনভিত্তিক ঋণসেবা চালু করার ব্যাপারে। ধারণাটি হচ্ছে, এটি হবে আরও বেশি নিরাপদ ও ঋণগ্রহীতাদের জন্য অধিকতর সস্তা।
বটমলাইন
ডিসেন্ট্রালাইজেশনের অবিশ্বাস্য সুযোগের সুবাদে ব্লকচেইন টেকনোলজি সুযোগ করে দেয় নমনীয় ও নিরাপদ বিজনেস শুরু ও পরিচালনার। ব্লকচেইন টেকনোলজি ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো পণ্য ও সেবা সৃষ্টিতে সফল হবে কি হবে না, তা নির্ভর করবে ভোক্তার আস্থা ও এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে নেয়ার ওপর। তা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের এই ক্ষেত্রটির ওপর সতর্ক নজর রাখা দরকার। ব্লকচেইনভিত্তিক সার্ভিসের পরিমাণ বাড়ছে। আর এই টেকনোলজি আরও পরিপক্ব হয়ে উঠছে। এটি অগ্রসর হচ্ছে দ্রুতগতিতে। ব্লকচেইন টেকনোলজির প্রয়োগের সম্ভাবনা সীমাহীন। এই সময়ে বেশ কিছু অ্যাপ্লিকেশন হয় উন্নয়নের পথে অথবা বেটা পর্যায়ে রয়েছে।ব্লকচেইন স্টার্টআপে বেশি বেশি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হলে ভোক্তারা দেখতে পাবে আরও বেশি ডিএলটি সেবা ও পণ্য, যা অদূর ভবিষ্যতে মূলধারায় এসে ঠাঁই নেবে।

পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৭ - নভেম্বর সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস