Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তাআইনের বিতর্কিত ধারাগুলোরসংশোধন চায় বিভিন্ন মহল
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:২০৪
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৮ - মে
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
সিকিউরিটি
তথ্যসূত্র:
প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ২
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তাআইনের বিতর্কিত ধারাগুলোরসংশোধন চায় বিভিন্ন মহল
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায় মামলা দায়েরের আগে পুলিশ সদর দফতরের সাথে পরামর্শ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল গত বছর। বলা হয়েছিল, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কথাও। এই ৫৭ ধারা নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন মহলের প্রবল বিতর্কের মুখে পড়ায় এমন নির্দেশনাই দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বিতর্কিত এই ৫৭ ধারাসংশ্লিষ্ট মামলার অভিযোগের ক্ষেত্রে। তার জায়মান উদাহরণ হচ্ছে, এই ৫৭ ধারার মামলায় দেশের অন্যতম তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাসরুরকে গত ২৫ এপ্রিল আটক ও আটকের তিন ঘণ্টা পর ছেড়ে দেয়ার ঘটনা। তাকে আটকের তিন ঘণ্টা পর ছেড়ে দিয়ে পুলিশ জানিয়েছেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তথ্য-প্রমাণ যাচাই ছাড়া কী করে মামলাটি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে খবরে প্রকাশ, ফাহিম মাসরুরের ঘনিষ্ঠজনেরা এখানে অন্য আভাসের কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সম্প্রতি কোটা-সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ফাহিমের মন্তব্যের পর ছাত্রলীগের এক নেতার হুমকি এবং বেসিস নির্বাচন নিয়ে দ্ব›দ্বও রয়েছে। তারা ধারণা করেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলা দিয়েতাকে হয়রানির ফন্দি এঁটেছিল একটি পক্ষ। কিন্তু ফাহিম মাসরুরের শুভাকাক্সক্ষীদের তৎপরতায় তাকে ছেড়ে দিয়ে বোল পাল্টেছে পুলিশ।

২০০৬ সালে প্রণীত হওয়ার পর ২০০৯ ও ২০১৩ সালে দুইবার সংশেধিত হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা আইসিটি আইন। ২০১৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এ আইনে সংযোজন করা হয় ৫৭ ধারা। সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৭ ধারার অপরাধের শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় কমপক্ষে ৭ বছর ও সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদন্ড। পাশাপাশি অর্থের ব্যবস্থাও করা হয়। অর্থের মাত্রা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা। তা ছাড়া আইসিটি আইনের এই ধারাটি জামিনের অযোগ্য। শুরুতেই আশঙ্কা করা হয়েছিল, এই ধারাটির অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক মতাবলম্বী, এমনকি নাগরিকসাধারণ ও সাংবাদিক হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তা ছাড়া এটি স্বাধীন মতপ্রকাশে ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে শুরু থেকেই এই ৫৭ ধারা প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে।

গত বছর ডিসেম্বরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এই দুজনেই বলেছিলেন, নতুন আরেকটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আর সেখানে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ আইসিটি আইনের বিতর্কিত এই ৫৭ ধারা আর থাকছে না। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেÑ এই ৫৭ ধারার বিষয়বস্তু অন্তর্ভৃক্ত করা হয়েছে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। তবে এতে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে কেউ এমন সমালোচনা করতে না পারে যেÑ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাটি এই আইন থেকে সরিয়ে নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। তখন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এখন এটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানো হবে। এর সাথে থাকছে আইসিটি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৪৭ ও ৬৬ নম্বর ধারা বাতিলের প্রস্তাব। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর তা শীতকালীন অধিবেশনেইসংসদে তোলা হবে।

আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায় বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন, অথবা যার মাধ্যমে মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে একাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদন্ড ও সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকার অর্থ দেয়ার বিধান আছে।

আবার এই আইনের ধারা ২-এর ৫ উপধারায় ইলেকট্রনিক বিন্যাসের ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে ‘ইলেকট্রনিক বিন্যাস অর্থ কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো মিডিয়া, ম্যাগনেটিক, অপটিক্যাল, কম্পিউটারে স্মৃতি, মাইক্রোফিল্ম, কম্পিউটারে প্রস্তুতকৃত মাইক্রোচিপ বা অনুরূপ কোনো বস্তু বা কৌশলের মাধ্যমে কোনো তথ্য সংরক্ষণ বা প্রস্তুত, গ্রহণ বা প্রেরণ।

আসলে আইসিটি আইনের এই ৫৭ ধারাটির বিষয়বস্তু কৌশলে এদিক-ওদিক করে প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইনের বিভিন্ন ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনের খসড়ায় ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার ইচ্ছায় ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্র্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে ওই ব্যক্তির সেই কাজ হবে অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড ভোগ করতে হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থের বা উভয় দন্ড হবে। এই ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হবে।

আবার প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় ২৮ ধারায় বলা হয়েছেÑ যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মানহানিসংক্রান্ত দন্ড বিধির (১৮৬০) সেকশন ৪৯৯-এ বর্ণিত অপরাধ সংঘটন করেন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকার অর্থের বা উভয় দন্ড ভোগ করতে হবে। আর ওই অপরাধ দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করলে অনধিক পাঁচ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হবে। এই ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য, অ-জামিনযোগ্য ও আদালতের সম্মতিসাপেক্ষে আপসযোগ্য হবে।

প্রস্তাবিত এই আইনের ৩০ নম্বর ধারায় বলা আছে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বা ঘটানোর উপক্রম হয়, তাহলে ওই ব্যক্তির সেই কাজ হবে একটি অপরাধ। এ জন্য তিনি সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। আর একই অপরাধ যদি দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করেন, তাহলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। এ ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হবে।

প্রস্তাবিত এ আইনের আরেকটি ধারায় উল্লেখ আছেÑ কোনো ব্যক্তি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ সংস্থার গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদÐ বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হবে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের বাইরে এই আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধ করেন, যা দেশে করলে দন্ড যোগ্য হতো, তাহলে সেটি দেশের ভেতরে করা হয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে।

যদি কোনো ব্যক্তি ব্যাংক, বীমা বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অবৈধভাবে বা আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া ই-ট্র্যানজেকশন করেন, তাহলে এই ব্যক্তির এই কাজ অবৈধ হবে। এ ছাড়া সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়ে সময়ে জারি করা কোনো ই-ট্র্যানজেকশনকে অবৈধ ঘোষণা করা সত্তে¡ও যদি কোনো ব্যক্তি ই-ট্র্যাকজেকশন করেন, তাহলে তা অপরাধ হবে। এ জন্য এই ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এ অপরাধ দ্বিতীয়বার বা তার বেশি করলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

যেকেউ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা ও প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উল্লিখিত বিভিন্ন ধারা বিবেচনায় আনলে দেখতে পাবেন, আসলে এটি আরেকটির একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রকৃতপক্ষে, বিতর্কিত ৫৭ ধারাটিই ক্যামোপ্লেজ করার চেষ্টা করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায়। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় এবং প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপরাধের প্রকৃতি এমন যেন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে কর্মরত যেকোনো ব্যক্তি, আরো খুলে বললে যেকোনো সাংবাদিক যেকোনো অসতর্ক মুহূর্তে অনিচ্ছাকৃতভাবে এই অপরাধ সংঘটন করার অপরাধে অপরাধী বনে যেতে পারেন। এখানে তিনি এই কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে না অনিচ্ছাকৃতভাবে করেছেন, তার মাপকাঠিই বা কী হবে তা আমাদের জনা নেই। আর এ ধরনের যেসব গুরুদন্ড আইনটির বিভিন্ন ধারায় সংযোজিত হতে যাচ্ছে, তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো জীবনটাই অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে। এ আইনের মাধ্যমে অনেকেই লঘু পাপে গুরুদন্ডের শিকার হতে পারেন, এমন সম্ভাবনা প্রবল। তাই এই আইনটি চূড়ান্ত করার আগে আরো ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি যখন প্রণীত হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং এটি ৫৭ ধারার মতোই বিরোধী মত-পথের মানুষকে দমন-পীড়নের সরকারি হাতিয়ার হতে পারে বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জনগণের বাকস্বাধীনতা থাকবে। জনগণের বাকস্বাধীনতা রক্ষার জন্য যেসব চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স দরকার, সেগুলো প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইন ছাড়াও সম্প্রচার আইনে থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সম্প্রচার আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার এ পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, তা নিয়েও ইতোমধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নানা শঙ্কার জন্ম নিয়েছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় সম্প্রচার আইন এমনভাবে আসছে, যা বিরোধী মত-পথের লোকদের দমন-পীড়নের জন্য সরকারের জন্য হবে আরেকটি মোক্ষম হাতিয়ার। সে এক ভিন্ন ইস্যু, যেখানে প্রবেশের অবকাশ এ লেখায় একদম নেই।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৬টি ধারারসংশোধন চায় সম্পাদক পরিষদ
গত ১৯ এপ্রিল সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং তথ্যও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সাথে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সম্পাদকেরাএক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই ছয়টি ধারাকে তারা বাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এসব ধারা সংশোধনের দাবি জানান।

এই উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ঠিক করেÑ তাদের হাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপেক্ষায় থাকা এই আইনের খসড়া চূড়ান্তকরার আগে কমিটিরএকটি বৈঠকে সম্পাদক পরিষদকে ডাকা হবে।
প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ছয়টি ধারা নিয়ে সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগেরকথা জানিয়ে মাহফুজ আনাম বলেছেনÑ আমরা মনে করছি, এগুলো বাক-স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং এটি আমাদের স্বাধীন সাংবাদিকতাকে খুবই গভীরভাবে ব্যাহত করবে।
টিআইবি চায় ডিজিটালআইনের৯টি ধারার সংশোধন


ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করে, ইতোমধ্যেই মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত ডিজিটালনিরাপত্তা আইন সব নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের সাংবিধানিক অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। প্রস্তাবিত আইনটি প্রণীত হলে শুধু মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেই নয়,গণমাধ্যম কর্মীদের পাশাপাশি নাগরিক সাধারণের মৌলিক মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। তাই টিআইবি এ আইনের ঝুঁকিপূর্ণ ধারাগুলো বাতিলেরআহŸান জানিয়েছে। গত ২ মে এক বিবৃতির মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এইআহŸান জানান। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসেরআগে এর৯টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হয়।
টিআইবি বিবৃতিতে দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে মুক্ত পরিবেশে স্বাধীনভাবে বাক-স্বাধীনতা ও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারচর্চা অব্যাহত রাখতে পারে, সে জন্য প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইন-২০১৮-এর ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৮ ধারা পুনর্বিবেচনা ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়েছে। খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে অগ্রসরহওয়ার জন্য সংসদীয় কমিটির প্রতি আহŸান জানিয়েছে এই সংস্থ্।া
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যৌক্তিক বিধিনিষেধ সাপেক্ষে সংবিধান দেশের নাগরিকদের মতপ্রকাশের যে স্বাধীনতা দিয়েছে, তা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার কাছে অসহায়। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীসহ মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ইতোমধ্যেইএকদিকে অভূতপূর্ব ভীতি ও অন্যদিকে ভীতিপ্রসূত স্বআরোপিত সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিয়েছে, যা বাক-স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমেরস্বাধীন মতপ্রকাশ ও দায়িত্ব পালনের প্রধান অন্তরায় বলে বিবেচিত হচ্ছে। আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ৩২, ৪৩ ও ৫৮ ধারাগুলো প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া প্রণীত হলে সার্বিকভাবে দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়নের সম্ভাবনা ধূলিসাৎহওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।
খসড়াটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের পক্ষ থেকে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করা সত্তে¡ও ধারাগুলো সংশোধন না করেই সংসদে উত্থাপিত হওয়াকে হতাশাজনক উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, এআইনের ফলে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্যপ্রকাশ যেমন অসম্ভব হয়ে পড়বে; তেমনি এসব অপরাধের সুরক্ষার মাধ্যমে অধিকতর বিস্তৃতি ঘটবে।

সরকার-ঘোষিত ডিজিটালবাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিতের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনটি সে ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করবে বলেমনে করেন টিআইবি পরিচালক। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নেরঅভীষ্ট লক্ষ্যগুলো অর্জনে সরকারের পাশাপাশি জনগণ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমসহ সব নাগরিক যাতে সব ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে ম্বাধীনভাবে তাদের দায়িত¦ পালন ও বাধাহীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে, তার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ পর্যায়ে খসড়া আইনটির সংশোধনের দায়ভার সংসদীয় কমিটির ওপর ন্যস্ত হওয়ার কারণে কমিটিকে অবশ্যই ইতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
‘আর্টিকল ১৯’-এর প্রতিবেদন :বাক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের রেকর্ড

ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘আর্টিকল ১৯’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেÑ বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০১৭ সালে। এই বছরটিতে বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে৩৩৫ বার। ২০১৩ সালের পর গত পাঁচ বছরে এধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ২০১৭ সালেই। আরএসব ঘটনার ৭০ শতাংশ শিকারহয়েছেন তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকেরা। গত ৩ মে ছিল বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস।ওই দিবসকে সামনে রেখে ‘আটিকল ১৯’ গত ২ মে এসব তথ্য প্রকাশ করে।
সংস্থাটির বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক তাহমিনা রহমান এমবিই বলেন, ‘বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিবেশ নিয়ে আমাদের গবেষণায় উঠে আসা জরুরি তথ্য হচ্ছেÑ এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই পরিস্থিতিতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ গত বছরে বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃতি পাল্টেছে। সহিংসতা ও অপহরণের ঘটনা অনেকটাই কমে এসেছে। যদিও বিগত ৫ বছরে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাক-স্বাধীনতা হরণের প্রবণতা ক্রমেই বেড়েছে। শুধু গত বছরেই অপরাধমূলক হয়রানিরমামলা হয়েছে ৬৫টি। ২০০৬ সালের প্রণীত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগ করে আবেদন করা হয়েছে ৭৬টি। বিধিবহির্ভূতভাবে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে দুটি এবং হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে ২৪টি।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে ইমরান এইচ সরকার ও শনাতন উল্লাহকে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। শরীরিক নিগ্রহের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৭ সালে ২৮টি গুরুতর আঘাত নিয়ে নিহত হন একজন সাংবাদিক। ২০১৭ সালে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর এধরনের ঘটনা এর আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
সর্বশেষ

আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটির বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল কিংবা সংশোধনের কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। একাধিক মন্ত্রী বারকয়েক এসব আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো থাকবে না বলে উল্লেখ করেছেন। এরপরও এসব ধারা বাতিল কিংবা সংশোধন না করেইএই খসড়া ডিজিটল নিরাপত্তা আইনটি সংসদে তোলা হয়েছে। এর ফলে আইন সংশোধনের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটা জায়গা তৈরি হয়েছে বৈ কি। এরপর সংবাদপত্রের সম্পাদক পরিষদের দাবির মুখে তিন মন্ত্রী একযোগে বলেছেন, বাক-স্বাধীনতাকে ব্যাহত করে এমন ধারা এইআইনে থাকবে না। তাইএই আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সম্পাদক পরিষদকে ডাকা হবে। আমরা আশাবাদী, সরকার এই বৈঠকের মাধ্যমে চারদিক থেকে আসা দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেবে। আইনটি থেকে বিতর্কিত ধারাগুলোকে বাতিল কিংবা সংশোধনে উদ্যোগী হবে। সরকারের মাঝে এই উপলব্ধি আসবেন স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বাক-স্বাধীনতা বিনাশ করে কোনো জাতি সামনে এগিয়ে যেতে পারে না।
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৮ - মে সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস