Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > মোস্তাফা জব্বারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আইএসপিএবি’র ৬ দফা সংস্কার প্রস্তাব
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: এম. তৌসিফ
মোট লেখা:৪
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১৮ - মার্চ
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
ইনটারনেট
তথ্যসূত্র:
ইন্টারনেট
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
মোস্তাফা জব্বারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আইএসপিএবি’র ৬ দফা সংস্কার প্রস্তাব
মোস্তাফা জব্বারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে
আইএসপিএবি’র ৬ দফা সংস্কার প্রস্তাব

গত ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ঢাকায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ উপলক্ষে ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ তথা আইএসপিএবি এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে মোস্তাফা জব্বারকে সংবর্ধনা দেয়ার পাশাপাশি আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে ইন্টারনেট সেবায় সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে তার মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার জন্য আইসিটি খাতে বিদ্যমান সমস্যা তুলে ধরে এ খাতের উন্নয়নে ৬ দফা সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইএসপিএবি’র সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। শুরুতেই তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক। তিনি মন্ত্রীকে আইএসপিএবি পরিবারের আপনজন আখ্যা দিয়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে মোস্তাফা জব্বারের নেতৃস্থানীয় ও অনন্য অবদানের ওপর আলোকপাত করেন। পাশাপাশি এমদাদুল হক আশা প্রকাশ করেন, মোস্তাফা জব্বারের আইটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্প্রসারণের অগ্রগতি আরো ত্বরান্বিত হবে।

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আইএসপিএবি’র সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, নতুন মন্ত্রীর গৃহীত প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় এ খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী এবং গ্রাহকদের সত্যিকার চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। তার এই কর্মপরিকল্পনায় স্বল্প খরচে দেশব্যাপী ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেয়া; দেশীয় সফটওয়্যার বাজারকে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের রাহুমুক্ত করা এবং ডিজিটাল মিডিয়ায় বাংলা কনটেন্টের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ভূমিসহ সরকারি যাবতীয় সেবার ডিজিটালাইজেশনের যে তিনটি অগ্রাধিকার মন্ত্রী নির্ধারণ করেছেন, তা মূলত সবার সামগ্রিক আকাক্সক্ষারই যোগফল। আইএসপিএবি সভাপতি তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর ঘোষিত প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে পদ্ধতিগত ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু সমস্যা এবং এ বিষয়ে কতিপয় সংস্কারেরর প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

মোস্তাফা জব্বার তার বক্তব্যে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করায় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের ধন্যবাদ জানান। তিনি উপস্থাপিত সংস্কার-প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন। এই সময় তিনি জানান, এই প্রস্তাবগুলো তিনি গুরুত্বেও সাথে বিবেচনা করবেন।

তিনি জানান, ইন্টারনেটের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রী তাকে আশ্বাস দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ফ্রি ওয়াইফাই করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ইন্টারনেট মানেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, ইন্টারনেট ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে না। ইন্টারনেট এখন মানুষের মৌলিক অধিকার, এই পঞ্চম মৌলিক অধিকারটি সংবিধানে নিবন্ধিত করার জন্য কাজ করার কথা বলেন। গ্রামে ও শহরের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারে খরচের কোনো পার্থক্য থাকবে না। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নীতিমালা সংক্রান্ত সব বিষয়ে ট্রেড বডিসহ একটি কমিটি করে সচিব মহোদয়কে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
বিদেশের প্রত্যেকটি সংস্থায় এখন থেকে বাংলাদেশে সরকারের প্রতিনিধি থাকবে বলে জানান। ডটবাংলা এবং ডটবিডির রেজিস্ট্রেশন ফি সমানভাবে নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। শব্দগত পার্থক্যে কোনো ফির প্রার্থক্য হবে না। যেকোনো জায়গা থেকে যেন মোবাইলে সবাই রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন, সে কথাও তিনি বলেন। সবাই যেন নিরাপদে ইন্টারনেট ও ফেসবুক ব্যবহার করতে পারেন, এ জন্য ইন্টারনেট তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের সহায়তা দেয়া হবে বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, ট্রেড বডি থাকার কারণেই আজকের এই বাংলাদেশ। তিনি সব ট্রেড বডিকে নিয়ে নীতিমালা দেয়ার কথা বলেন এবং তা বাস্তবায়ন করায় দায়িত্ব তিনি নিজে নেবেন বলে জানান।

আইএসপিএবি’র এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যবর্গ, সাধারণ সদস্যবর্গ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যান্য সংগঠনের আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের বক্তব্যের পর আইএসপিএবি’র সাবেক সভাপতি আক্তারুজ্জামান মঞ্জু, বর্তমান কমিটির কোষাধ্যক্ষ সুব্রত সরকার শুভ্র, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মইনুদ্দীন আহমেদ, এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের পরিচালক মুহম্মদ আরিফ এবং কামাল হোসাইন। অনুষ্ঠানে বেসিস সভাপতি আলমাস কবীর, বাক্কো সভাপতি ওয়াহিদুর রহমান শরিফ এবং ই-ক্যাবের অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হক অনুসহ আরো ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন।

আইএসপিএবি’র সংস্কার প্রস্তাব

আইএসপিএবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম মূলত ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের পক্ষ থেকে পদ্ধতিগত ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু সমস্যা এবং এ বিষয়ে কতিপয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আইসিটি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিরাজমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি তাদের প্রস্তাব তুলে ধরে একটি সংক্ষিপ্ত ছকে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ও তুলনামূলক ফলাফল তুলে ধরার প্রয়াস চালান।

এনটিটিএন চার্জের সীমা নির্ধারণ
কাগজে-কলমে বর্তমানে দেশে এনটিটিএন অপারেটরের সংখ্যা ৫টি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সরকারি তিনটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ বাংলাদেশ রেলওয়ে; পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ এবং বিটিসিএলের নিষ্ক্রিয়তার সুবাদে মাত্র দুইটি প্রাইভেট এনটিটিএন অপারেটর বাজারে আধিপত্য কায়েম করার সুযোগ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির ট্রান্সমিশন-নেটওয়ার্কের স্বেচ্ছাচারী সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ এবং চাপিয়ে দেয়া নিয়মের কারণে কোনোভাবেই ইন্টারনেট সেবার দামে লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।

সমস্যাটি তুলে ধরে প্রস্তাবে বলা হয়Ñ সরকারি তিনটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিজিসিবি’র নেটওয়ার্ক দুটি প্রাইভেট এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান মিলিতভাবে ব্যবহার করছে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে মোবাইল অপারেটরেরা। তদুপরি, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘নিয়ন্ত্রণ কমিশন’ ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ভাড়ার কোনো সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করে দেননি। আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একাধিকবার কমিশনে আবেদন জানানোর পরও অজ্ঞাত কারণে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কমিশনের তরফ থেকে আইএসপিএবি-কে জানানো হয়েছে, আইটিইউ অথবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু আইএসপিএবি মনে করে, সময় ক্ষেপণের পরিবর্তে, দেশীয় বিশেষজ্ঞ, মন্ত্রণালয়/কমিশনের প্রতিনিধি, এনটিটিএন প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে, তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ভাড়ার উচ্চ ও নিম্নসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব। বর্তমানে ঢাকায় প্রতি মেগাবিট ব্যান্ডউইডথের ট্রান্সমিশন বাবদ চার্জ করা হয় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। ব্যান্ডউইডথের স্বল্পমূল্য সত্তে¡ও ট্রান্সমিশন খরচের কারণে ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। স্বভাবতই, ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের গড় ক্রয়ক্ষমতা ঢাকার গ্রাহকদের তুলনায় কম। কিন্তু ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের অতিরিক্ত চার্জের কারণে ঢাকার বাইরে ইন্টারনেট খরচ ঢাকার চেয়ে বেশি পড়ছে। ইন্টারনটের সার্বিক সম্প্রসারণে দুটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যই সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করে আইএসপিএবি। ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের উচ্চ ভাড়ার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে এনটিটিএনের স্বেচ্ছারোপিত নিয়মের কারণের ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ও গ্রাহকদেরকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।

ইন্টারনেট সেবাখাতের অচলাবস্থা, বৈষম্য ও স্বার্থের দ্ব›দ্ব তৈরি হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ, দুটি প্রাইভেট এনটিটিএনের অধিকারে একইসাথে আইটিসি, আইআইজি ও আইএসপি লাইসেন্স থাকা। উল্লিখিত বাস্তবতায় এই দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় এককভাবে ইন্টারনেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।

এ প্রেক্ষাপটে আইএসপিএবি’র বক্তব্য হচ্ছেÑ ইন্টারনেটের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া, সরকারি এনটিটিএন অপারেটরদের সক্রিয় করা এবং নতুন এনটিটিএন লাইসেন্সের দেয়ার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আইএসপিএবি’র সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে এনটিটিএন লইসেন্সের জন্য আবেদন করতে আগ্রহী। প্রযুক্তিখাতে সুস্থ প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনতে আইএসপিএবি এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সমর্থন চায়।

ট্রিপল-পে-ব্রডব্যান্ড সার্ভিসের অনুমতি দান

আইএসপি লাইসেন্সধারীরা একটি ক্যাবলের মাধ্যমে শুধু একটি সেবা, অর্থাৎ ডাটা সার্ভিস দিতে পারে। কিন্তু ওই একই ক্যাবলের মাধ্যমে কোনো ধরনের অতিরিক্ত জনবল ও বিনিয়োগ ছাড়াই গ্রাহকদের তিনটি সেবার প্যাকেজ অর্থাৎ ডাটা, ভয়েস ও ভিডিও সার্ভিস দেয়া সম্ভব। ট্রিপল-পে-ব্রডব্যান্ড সার্ভিসের অনুমতি দেয়া হলে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদর পক্ষে তুলনামূলক কম খরচে গ্রাহকদের ইনটারনেট সেবা জোগানো সম্ভব। একজন গ্রাহকের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি সুলভ ও আকর্ষণীয় একটি সেবা হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, সে ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা ইন্টারনেট, টেলিফোন ও ক্যাবল টিভির সম্মিলিত খরচের চেয়ে অনেক কম খরচে এই তিনটি সেবাই একজন সেবাদাতার কাছ থেকে পাবেন। আইএসপি লাইসেন্সের অধীনে ট্রিপল-পে-ব্রডব্যান্ড সেবা দেয়ার অনুমতি দিলে ইন্টারনেটের খরচ কমানোর লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হবে।

সম্প্রতি জারি করা আইপি-টিভি সংক্রান্ত একটি নির্দেশনার ব্যাপারে আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে বলা হয় এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে কোনো ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানি আইপি-টিভি অথবা ভিডিও-অন-ডিমান্ড সেবা দিতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে দেশে মোবাইল-ব্রডব্যান্ড এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ড খাতের মধ্যে বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে। এ অবস্থায় বিটিআরসি’র এই নির্দেশনা বিদ্যমান ব্যবসায় বৈষম্য আরও আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে আইএসপিএবি মনে করে। কারণ, টেলিটক ছাড়া দেশের অন্য তিনটি মোবাইল অপারেটর ইতোমধ্যেই তাদের নিজস্ব আইপি-টিভি সার্ভিস চালু করেছে। এরই মধ্যে গ্রামীণ ফোন ‘বায়স্কোপ লাইভ’, বাংলালিংক ‘বাংলালিংক লাইভ টিভি’ এবং রবি ও এয়ারটেল ‘আই-ফ্লিক্স’ নামে আইপি-টিভি সেবা চালু করেছে। এর বাইরেও নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, এইচবিও নাউ-এর মতো বেশকিছু আইপি-টিভি সার্ভিস রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যেকেউ চাইলে এগুলোর গ্রাহক হতে পারেন। পাশাপাশি র‌্যাডিয়েন্ট আইপি-টিভি এবং বি আইপি-টিভি সহ কিছু সার্ভিস বাংলাদেশের বাইরে থেকে অপারেট করা হয়, যারা মূলত বাংলাদেশী স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো লাইভ স্ট্রিমিং করে থাকে। এসব সার্ভিস থেকে বাংলাদেশ সরকারের কোন ধরনের রাজস্ব আয় হয় না। বিদ্যমান বাস্তবতায়, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের আইপি-টিভি ও ভিডিও-অন-ডিমান্ড সার্ভিস থেকে বিরত রাখার অর্থ হচ্ছে মোবাইল অপারেটরদের তুলনায় আগে থেকেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা ব্রডব্যান্ড শিল্পখাত বিকাশের গতিকে আরও স্থবির করে দেয়া। বরং ব্রডব্যান্ড অপারেটরদের ভিডিও ও ভয়েস সার্ভিস দেয়ার সুযোগ দিলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সাথে সাথে ব্যবসায়বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং ইন্টারনেট সেবার মূল্য অনুমিতভাবেই কমে যাবে। এই যুক্তি তুলে ধরে আইএসপিবি আশা করছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আইসিটি মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করবে।

আইপিটিএসপিদের সমন্বয়

আইএসপিএবি মনে করে, বর্তমানে ‘আইপি-টেলিফোন’ সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইপিটিএসপি) জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মোবাইল ব্রডব্যান্ডের মাধ্যমে আইপি-ফোন ব্যবহার করতে না পারা। বর্তমানে দেশে মোবাইল-ব্যান্ডউইডথ (ডাটা) ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত কোটি, বিপরীতে ফিক্সড-ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ৫০ লাখের কিছু বেশি। ‘আইপি-টেলিফোন’ সার্ভিস প্রোভাইডারেরা এই সাড়ে সাত কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। আইএসপিএবি’র অভিমতÑ মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রধান যুক্তি হচ্ছে, মোবাইল ডাটার মাধ্যমে আইপি-ফোন ব্যবহার করা সম্ভব হলে অবৈধ ভিওআইপি’র প্রসার ঘটবে। কিন্তু অবৈধ ভিওআইপি কলের বিরূপ প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক ভয়েস কলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। সুতরাং, এই যুক্তিতে লোকাল ভয়েস কল এনাবল না করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এর ফলে আইপি টেলিফোন শিল্পখাতের বিকাশ রুদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে সরকারও বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া, যেখানে মোবাইল ডাটার মাধ্যমে মেসেঞ্জার, হোয়াটস-অ্যাপ এবং ভাইবার এর মতো অ্যাপ্লিক্যাশন ব্যবহার করে সব ধরনের ভয়েস কল করা যাচ্ছে, সেখানে স্থানীয় আইপি-টেলিফোন সার্ভিসে বাঁধা সৃষ্টির মাধ্যমে কি অর্জিত হচ্ছে, সে প্রশ্ন তুলেছে আইএসপিএবি। এ প্রেক্ষাপটে আইএসপিএবি আশা করছে, এ বিষয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ আইপি-টেলিফোন শিল্পখাতের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি নিশ্চিত করবে।

পারস্পরিক অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের অনুমোদন

আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে অ্যাকটিভ শেয়ারিং সম্পর্কে বলা হয় বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারেরা অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরস্পরের অবকাঠামো ব্যবহার করার অনুমতিপ্রাপ্ত নয়। ফলে একই এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেক সার্ভিস প্রোভাইডারকে আলাদা আলাদা অবকাঠামো তৈরি করতে হয়। পরস্পরের অবকাঠামো শেয়ারের অনুমতি পেলে সীমিত জনবল ও স্বল্প ব্যয়ে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা জোগানো সম্ভব হতো, যার ইতিবাচক প্রভাবে তুলনামূলক কম খরচে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো যেত। কিন্তু, অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের সুযোগ না থাকায় এ খাতে অর্থ, বিদ্যুৎ ও জনবলের অপচয় হচ্ছে। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়Ñ ইন্টারনেট সেবা জোগান দেয়ায় ব্যবহৃত বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি, ফাইবার অপটিক ক্যাবল ইত্যাদি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে সরকারের আমদানি ব্যয়ে এর ক্ষুদ্র হলেও একটা প্রভাব থাকে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে যেখানে শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অবকাঠামোর সর্বোচ্চ উপযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেখানে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের অ্যাকটিভ শেয়ারিংযের অনুমতি না দেয়ায় গ্রাহককে অতিরিক্ত খরচের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং পিজিসিবি’র অবকাঠামো শেয়ারিংয়ের উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, নয়া আইসিটি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে সব পর্যায়ে স্বল্প খরচে ইন্টারনেট পৌঁছানোর যে লক্ষ্য তিনি নির্ধারণ করেছেন, অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের অনুমতি দেয়ার বিষযটি বিষয়টি বিবেচনায় নিলে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ অনেকটাই মসৃণ হবে বলে আইএসপিএবি মনে করে।

ইন্টারনেট সেবার অতিরিক্ত ধাপের বিলুপ্তি

আইএসপিএবি মনে করেÑ সাবমেরিন ক্যাবল থেকে শুরু করে গ্রহক পর্যায় পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছানোর পরিকাঠামোই ইন্টারনেটের চড়া দামের প্রধান কারণ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে গ্রাহক পর্যন্ত ব্যান্ডউইডথ পৌঁছাতে চার ধরনের প্রতিষ্ঠান হয়ে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে। প্রথম পর্যায়ে আইটিসি আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ আইআইজি’র কাছে পরিবহন করে। এ ক্ষেত্রে লং-ডিস্ট্যান্স ট্রান্সমিশন করা ছাড়া আইটিসি ব্যান্ডউইডথ কোনো ধরনের ভ্যালু অ্যাড করে না। দ্বিতীয় পর্যায়ে আইআইজি ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করে আইএসপি’র কাছে। আইআইজি শুধু রাউটিং ছাড় অন্য কোনো ধরনের ভ্যালু অ্যাড করে না। মূলত, শেষ পর্যায়ে আইএসপি’র মাধ্যমে ব্যান্ডউইডথ ‘ইন্টারনেট-সেবা’ হিসেবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে। প্রতিটি পর্যায়েই ব্যান্ডউইডথ পরিবহন করে এনটিটিএন।

চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার কারণে প্রতিটি পর্যায়ের চার্জ ও মুনাফার ভার বহন করতে হয় গ্রাহককে। আইআইজি’র মোট রাজস্বের ১০ শতাংশ (ভ্যাটসহ ১৫ শতাংশ) বিটিআরসিকে দিতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩৮.৫ শতাংশ ট্যাক্স, ভ্যাট ও রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ভার গ্রাহককে বহন করতে হয়। এই চারটি ধাপের বদলে দু’টি ধাপে (আইএসপি এবং এনটিটিএন) আন্তর্জাতিক ব্রডব্যান্ডকে ইন্টারনেট সেবায় পরিণত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আইএসপি সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্রডব্যান্ড কিনবে এবং এনটিটিএন ব্যান্ডউইডথ পরিবহনে নিয়োজিত থাকবে।

লাইসেন্সহীন আইএসপি নির্মূল করা

স্থানীয় পর্যায়ে অসংখ্য লাইসেন্সহীন আইএসপি রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয়ায় এদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এরা সরকারকে কোনো ফি না দিয়েই ইন্টারনেট সেবা সরবরাহ করছে। মান কম থাকলেও এদের ইন্টারনেট সেবা কম দামে পাওয়া যায়। ফলে এদের সেবা পেতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেশি। এদের নির্মূল করতে পারলে এ খাতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, ইন্টারনেট সেবার মানও বাড়বে। তা ছাড়া এরা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এদের ইন্টারনেট সংযোগ সন্ত্রাসবাদীরা ব্যবহার করতে পারে। তাই এসব অবৈধ লাইসন্সহীন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের নির্মূল করতে হবে। আর এ কাজটি সরকারকেই করতে হবে। সরকার চাইলেই তা পারে।

এ ছাড়া আরো কিছু বিষয়

ওপরে উল্লিখিত বড় ধরনের সমস্যাগুলো ছাড়াও আরো কয়েকটি বিষয়ে প্রস্তাবনায় আইসিটি মন্ত্যণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রথমেই উল্লেখ করা হয় ইন্টারনেট সেবাদানের বিষয়টি এখনো বাংলাদেশে আইটি-এনাবলড সার্ভিস হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইটি-এনাবলড সার্ভিস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। আরেকটি প্রায়োগিক সমস্যার কথা উল্লেখ বলা হয়, আইএসপিদের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় আবাসিক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে। এ কথা জানা, ইন্টারনেট সেবা দিতে প্রয়োজন হয় পয়েন্ট অব প্রেজেন্স (পপ) স্থাপন করা, যা মূলত একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা। কিন্তু আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা নিষিদ্ধ হওয়ায় আইএসপিদের জটিলতার মধ্যে পড়তে হয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে আবাসিক এলাকায় বৈধভাবে পপ স্থাপনের অনুমতি দেয়া জরুরি বলে আইএসপিএবি মনে করে।

আইএসপিএবি’র আশাবাদ

ইন্টারনেট সেবাখাতে বিরাজিত সমস্যার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে উল্লিখিত ছয় দফা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে আইএসপিএবি আশা করছে এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে ইন্টার সেবাখাতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যেমন, আইএসপিএবি বলেছেন
০১. এনটিটিএন চার্জের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন চার্জ নির্ধারণ করলে এক সপ্তাহের মধ্যে ইন্টারনেট সেবার দাম কমবে,

০২. ট্রিপল-পে-ব্রডব্যান্ড সার্ভিসের অনুমোদন দেয়া হলে তিন-চার মাসের মধ্যে ইন্টারনেট সেবার দাম কমবে ও এ সেবার সম্প্রসারণ ঘটবে,

০৩. আইপি টেলিফোন ও মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করলে সাত দিনের মধ্যে আইপি টেলিফোন শিল্পে বিকাশ ঘটবে,

০৪. পারস্পরিক অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের অনুমোদন দিলে ১৫ দিনের মধ্যে ইন্টারনেট সেবার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটবে,

০৫. ইন্টারনেট সেবায় বিদ্যমান অতিরিক্ত ধাপগুলোর বিলুপি ঘটালে ইন্টারনেট সেবার দাম কমবে ও সম্প্রসারণ ঘটবে এবং

০৬. লাইসেন্সহীন আইএসপি প্রতিষ্ঠান নির্মূল করা হলে ইন্টারনেটের মান বাড়বে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
২০১৮ - মার্চ সংখ্যার হাইলাইটস
চলতি সংখ্যার হাইলাইটস